জমিয়ে শীত পড়ার সঙ্গেই শুরু হয়ে গেছে মেলার মরসুম। ক’দিন আগেই নিউ টাউনের এক মেলায় ঢেঁকিতে ‘লাইভ’ চাল গুঁড়ো করছিলেন মেয়েরা, অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখছিলেন তা— ছোটরা তো চোখ গোল-গোল করে। সেই দৃশ্যই মনে করিয়ে দিল, বাঙালির পৌষ-পার্বণ তো সামনেই! পিঠেপুলি তৈরির গোড়ার কথা হল চালের গুঁড়ো। সেই কাজে ঢেঁকির ব্যবহার এখন প্রায় উঠেই গেছে। অথচ সিকি শতাব্দী আগেও শীত পড়লেই বাংলার গ্রাম মুখরিত হতো ঢেঁকিতে পা দেওয়ার ছন্দোবদ্ধ শব্দে। ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর ‘পৌষ-পার্বণ’ কবিতায় সেই ছবি এঁকেছেন— “ঘোর জাঁক বাজে শাঁক যত সব রামা।/ কুটিছে তণ্ডুল সুখে করি ধামা ধামা।”
সময়ের পরিবর্তনে আজকাল চাল যেমন মেশিনে গুঁড়ো করা হয়, তেমনই পিঠেপুলি তৈরির চেনা ছবিটাও ক্রমেই যেন মা-ঠাকুমার হেঁশেল থেকে সরে যাচ্ছে মেলার ফুড স্টল আর মিষ্টির দোকানে, কিংবা আধুনিক শহরজীবনে ঠাঁই করে নেওয়া ক্লাউড কিচেন আর হোম শেফদের হাতে। তবে যতই ঠাঁইবদল হোক, অখণ্ড বঙ্গরসনার অকৃত্রিম সংস্কৃতিচিহ্ন হিসেবে পিঠেপুলি-পায়েসের গুরুত্ব আজও অমলিন।
বাঙালিয়ানার স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণে পিঠেপুলির ভূমিকা এক শতক আগে তো রীতিমতো দৃঢ়। বিশ শতকের একেবারে প্রথম দিকে সরলা দেবী চৌধুরাণীরা তাঁদের বালিগঞ্জের বাড়িতে উঠে আসার পর দেখলেন, প্রতিবেশীরা পূর্ববঙ্গের বাঙালি হলেও তাঁদের দৈনন্দিন জীবনধারায় প্রবল বিদেশি প্রভাব। আরও খেয়াল করলেন, এই সব বাড়ির মেয়েদের অনেকেই সুন্দর মিষ্টান্ন তৈরি করতে পারেন। সেই গুণ কাজে লাগিয়েই তাঁদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগানোর চেষ্টা করেন সরলা, সবাইকে পাঠান পৌষ-পার্বণের নিমন্ত্রণ। তার পর স্বগৃহে কয়েকজন মেয়েকে আমন্ত্রণ করে সবাই মিলে নানা রকম পিঠে— পুলি, পাটিসাপটা, সরুচাকলি তৈরি করলেন। বিকেলে বাকি আমন্ত্রিতদের মধ্যে সেই সব পিঠের সঙ্গে পরিবেশন করা হল স্বাদেশিকতার সন্দেশও। প্রসঙ্গত, ১৮৯৭ সালে নাটোরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের নিজের হাতে তৈরি পিঠে-পায়েস খাইয়েছিলেন স্বয়ং নাটোরের রানিমা— অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় সেই কথা।
আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনের চাপে আজ অধিকাংশ বাড়িতেই পিঠে তৈরির সময়াভাব। যাঁদের হাতে সময় ছিল, সেই প্রজন্মের মানুষেরা চলে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। আগে পিঠে তৈরির কাজ, আর তার পর সেই পিঠের স্বাদ উপভোগ করা ছিল বাঙালি একান্নবর্তী পরিবারের যৌথ যাপনের অঙ্গ। বিপ্রদাস পিপলাইয়ের মনসামঙ্গল কাব্যে দেখা যায়, চাঁদ সদাগরের স্ত্রী সনকা তাঁর ছয় পুত্রবধূকে নিয়ে প্রচুর পিঠে তৈরি করছেন, পায়েস রাঁধছেন— যা আসলে বাঙালির পারিবারিক ও সামাজিক যৌথজীবনের চিত্রই তুলে ধরে। যুগপরিবর্তনের হাত ধরে আজ হয়তো বা কোনও খাদ্যমেলার স্টলেই অবাক চোখে ভাপা পিঠে তৈরি হতে দেখার সুযোগ পায় এ কালের খুদেরা। তবু তো বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে তাদের! ছোটরা চিনছে বাংলার খাদ্য-সংস্কৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে— সেটুকুই আশা। ছবিতে নকশি ও ভাপা পিঠে।
জন্মশতবর্ষে
ষাটের দশকে সত্যজিৎ রায় নবরূপে শুরু করলেন সন্দেশ। সেখানেই ১৯৬২-তে বেরোল ‘ঋণশোধ’, নতুন আঙ্গিকে বাংলা কমিক্স। শিল্পী প্রসাদ রায়ের আড়ালে যিনি ছিলেন, তাঁকে পরে বাঙালি চিনেছে ময়ূখ চৌধুরী নামেই। সন্দেশ-এর পাতায় কমিক্স ছাড়াও, লিখেছেন ‘মরণ খেলার খেলোয়াড়’ নামে গল্পও। ষাটের দশকে কমিক্স-শিল্পীদের মধ্যে ময়ূখ চৌধুরীর বিশিষ্টতা তাঁর বাস্তবধর্মী চিত্রকাহিনিতে, ইতিহাসের পাতা থেকে প্রত্যন্ত অরণ্য প্রান্তরের প্রেক্ষাপটে তাঁর মৌলিক গল্পের রোমাঞ্চে, বন্যপ্রাণীর দ্রুতিময় চিত্রকৃতিতে (ছবি)। এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ (জন্ম ১৯২৬), সেই উপলক্ষে ‘বুক ফার্ম’ প্রকাশনা বার করল কমিক্স ও গ্রাফিক্স পত্রিকার ‘ময়ূখ চৌধুরী ১০০’ সংখ্যা (সম্পা: বিশ্বদেব গঙ্গোপাধ্যায়, স্বাগত দত্ত বর্মণ)। প্রায় একশো পৃষ্ঠা কমিক্স, পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস, বিশেষ রচনা, ব্যক্তি শিল্পী লেখক ময়ূখ চৌধুরীর মূল্যায়ন; রঙিন ও সাদা-কালো প্রচুর অলঙ্করণ, বিশদ তথ্যপঞ্জি রয়েছে সেখানে।
ভাবার বিষয়
রাষ্ট্র কি সত্যিই পরিসংখ্যান চায়? বছরকে বছর কেটে যায়, জনগণনা হয় না কেন? জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হার নিয়ে যে সরকারের এত গর্ব, দেশের শিশুদের অপুষ্টি নিয়ে তার বক্তব্য কী? সমাজমাধ্যমে ঘোরে নানা বক্তব্য। সেই গোলকধাঁধা পেরিয়ে, পেশাদার অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন অচিন চক্রবর্তী ও সীমন্তিনী মুখোপাধ্যায়, ‘কে চায় পরিসংখ্যান?’ ও ‘দেখো আমি বাড়ছি না মাম্মি!’ প্রবন্ধ দু’টিতে। ‘হাতেখড়ি’ প্রকাশনার নতুন গ্রন্থমালা ‘ভাবার বিষয়’, প্রকাশ অনুষ্ঠান ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা আগামী কাল ১১ জানুয়ারি সকাল ১১টায়, শরৎ বোস রোডের ওয়েপয়েন্ট ক্যাফেতে। লেখকেরা ছাড়াও, বলবেন স্বাতী মৈত্র সোহম ভট্টাচার্য কৌস্তুভমণি সেনগুপ্ত।
সারস্বত
১৯৩২-এ, বছর তেইশের তরুণ সুধীরকুমার মিত্র লিখেছিলেন হুগলির জেজুর গ্রামের আঞ্চলিক ইতিবৃত্ত, পড়ে আশীর্বাণী পাঠান স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ১৯৪৮-এ বেরোয় প্রায় এগারোশো পৃষ্ঠার বই হুগলী জেলার ইতিহাস, যার প্রস্তুতিতে সুধীরকুমার পাঁচ বছর আঠারোশো গ্রাম ঘুরে সংগ্রহ করেন স্থানীয় ইতিহাসের উপাত্ত। অঞ্চল-চর্চার দিগন্ত খুলে দেওয়া মানুষটি পরাধীন ভারতেই শুরু করেন বঙ্গভাষা সংস্কৃতি সম্মেলন; লিখেছেন বাঙালি বিপ্লবীদের জীবনী, সম্পাদনা করেছেন নানা পত্রিকা। ১১৭তম জন্মদিন উপলক্ষে গত ৯ জানুয়ারি, ২ কালী লেনের গৃহে হয়ে গেল তাঁর সংগৃহীত ও লিখিত বইয়ের প্রথম সংস্করণের প্রদর্শনী। আশি বছর আগে তাঁর লেখা যুগাচার্য বিবেকানন্দ ও ভক্তভৈরব গিরিশচন্দ্র বইদু’টি প্রকাশ পেল নবরূপে (প্রকা: তুহিনা)।
গীত-নৃত্যে
জমাটি শীতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মাধুর্য উপভোগ্য আরও। যে দরবার থেকে এই সঙ্গীতের উৎপত্তি ও বিকাশ, তারই আদলে এক অনুপম পরিবেশে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতরস পরিবেশন করে চলেছে সুতানুটি পরিষদ চোরবাগান অঞ্চল। আজ ও আগামী কাল, ১০-১১ জানুয়ারি বিকেল ৫টা থেকে কৈলাস বোস স্ট্রিটে লাহাবাড়িতে ৩৪তম ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর, থাকবেন বিদুষী গৌরী পাঠারে উস্তাদ শাহিদ পারভেজ় এন রাজম পণ্ডিত তন্ময় বসু সমর সাহা সৌমেন নন্দী বিভাস সাঙ্ঘাই প্রমুখ। অন্য দিকে, গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের জন্মশতবর্ষে শিবাঙ্গ ও উপাসনা-র উদ্যোগে ওড়িশি নৃত্যানুষ্ঠান ‘সমাবৃত্ত’ আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় আইসিসিআর-এ, গুরু নন্দিনী ঘোষাল শিবনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় মৌলী মেধা পাল প্রমুখের নৃত্য-নিবেদন।
নাট্যযাত্রায়
জীবন ও সমসময়ের সত্য মানুষকে জানানোর লক্ষ্যে তৈরি হয়েছিল অশোকনগর নাট্য আনন, গত সাড়ে তিন দশক ধরে সেই আদর্শ অবলম্বন করে পথ চলছে তারা। এই সময়কালে প্রযোজিত হয়েছে অনেকগুলো পূর্ণাঙ্গ ও ছোট নাটক: হীরক রাজার দেশে সূর্য শিকার সিজ়ার বাসনা বৃক্ষমূলে ছায়াবাজি দিল্লি চলো অপবিত্র যুগনায়ক ও সাম্প্রতিকতম প্রযোজনা মেঘনাদ পেয়েছে দর্শকপ্রিয়তা। বহু গুণী শিল্পী নানা সময়ে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে তুলেছেন নাটকগুলিকে। গত ২ জানুয়ারি ছিল ৩৫তম প্রতিষ্ঠাদিবস, সেই উপলক্ষে আজ ও আগামী কাল, ১০ ও ১১ জানুয়ারি দুপুর ২.৩০ ও সন্ধ্যায় অ্যাকাডেমি মঞ্চে ছোট্ট নাট্যমেলা; অভিনীত হবে চন্দন সেন অভিনীত-নির্দেশিত চারটি নাটক— দিল্লি চলো, গেটউইং গোষ্ঠীর গল্পে যা নেই, যুগনায়ক এবং মেঘনাদ।
ওঁরাও আছেন
কলকাতার অলিগলিতে একদা দেখা যেত ওঁদের— ভিস্তিওয়ালা। আশির দশক থেকে তাঁদের দর্শন-স্মৃতি স্পষ্ট আলোকচিত্রী বিজয় চৌধুরীর মনে: ছাগচর্মে তৈরি ভিস্তি বা মশকে জল ভরে, কাঁধে-পিঠে চাপিয়ে তাঁরা পথে চলেছেন— রিপন স্ট্রিট, নিউ মার্কেট, বৌবাজার, কলুটোলা লেন, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড, বো ব্যারাকস, সদর স্ট্রিটে ফুটপাতের ধারে হোটেল ও বাড়িগুলোয় জলের জোগান দিতে। দেখা হয় সোহেলের সঙ্গে: অল্পবয়সে বাবার হাত ধরে বিহার থেকে তাঁর আসা এ শহরে, বাবার পেশাসূত্রেই নিজেও পরে হয়ে ওঠেন ভিস্তিওয়ালা। জীবন আধুনিক হয়েছে, জল জোগান ব্যবস্থাও; সমাজ-মানবিক কারণেও ভিস্তিওয়ালারা এখন বিলুপ্তপ্রায়। তাঁদের মনে রেখে নতুন বছরে একটি টেবিল ক্যালেন্ডার করেছেন বিজয়, নব্বই দশক থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শহরের ভিস্তিওয়ালাদের জীবনচিত্র ঠাঁই পেয়েছে সেখানে। সঙ্গের ছবিটি ২০২৩-এর, ছাতাওয়ালা গলির চা-দোকানে ভিস্তিওয়ালা জল ভরছেন ড্রামে।
কাছের মানুষ
বিংশ শতাব্দীর দুই বিস্ময়প্রতিভা পাবলো পিকাসো ও চার্লি চ্যাপলিন। চিত্রশিল্প সে তো শিক্ষিত সমঝদারের ব্যাপার; চ্যাপলিনের অভিনয় ও পরিচালনা তাঁকে করে তুলেছে সর্বজনপ্রিয়। সমসময়ের বাস্তবতা, যুদ্ধ, দারিদ্র, শোষণ, স্বৈরতন্ত্র-বিরোধিতা থেকে মানবিক সুকোমল বৃত্তিগুলি যে ভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন এই জীবনশিল্পী, তার জুড়ি মেলা ভার। চ্যাপলিন-অভিনীত, টুপি ও ছড়িওয়ালা দরিদ্র ভবঘুরে চরিত্রটির মুখভঙ্গি, হাঁটাচলা, শরীরী ভাষা প্রভাবিত করেছে বিশ্বের নানা শিল্পীকেই; অ্যাক্রিলিক তরল রঙে এ বার সেই চরিত্রটিকেই নানা ভাবে ধরেছেন চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন। কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি (কেসিসি)-তে চলছে চিত্রপ্রদর্শনী ‘আ জিনিয়াস অ্যান্ড দ্য কমন ম্যান’। ২ থেকে ২২ জানুয়ারি, সকাল ১১টা-সন্ধে ৭টা। ছবিতে তারই একটি।
১২৫ বছরে
পরাধীন দেশে তখন রাজনৈতিক চেতনা জাগছে, গড়ে উঠছে শক্তি সমিতি। এই আবহে ১৮৯৭ সালে জনাকয় তরুণের আগ্রহে পল্লির এক প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে কুস্তির আখড়া। ১৯০০ সালে ব্যায়ামাচার্য রাসবিহারী মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে তা-ই রূপ পায় বেনিয়াটোলা মডেল অ্যামেচার অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশন তথা আজকের বেনিয়াটোলা আদর্শ ব্যায়াম সমিতি (বিএবিএস)-এ। রাসবিহারীর পর তাঁর ভাগ্নে ব্যায়ামবীর বসন্তকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যপদ দে প্রমুখ ছিলেন দিশারি। বসন্তকুমার দৈহিক-মানসিক শক্তির সমন্বয়ে নানা খেলার প্রদর্শন চালু করেন, সেই ধারায় জিমন্যাস্টিক্স ট্রাপিজ় লাঠিখেলা যোগাসনের নিয়মিত অনুশীলন ও প্রদর্শন জারি আজও। ১২৫ বছর পূর্তিতে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হয়ে গেল গত ২৭-২৯ ডিসেম্বর বি কে পাল পার্কে: ছিল জিমন্যাস্টিক্স, লাঠিখেলা, হিউম্যান পিরামিড শো, যোগাসন, ক্যারাটে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আতশবাজি প্রদর্শনী।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে