প্রতারণার অভিযোগ আগেও উঠেছিল। গ্রাহকের টাকা ফিরিয়ে দিয়ে কোনও ভাবে আপস মীমাংসা করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল ভ্রমণ সংস্থাটি। কিন্তু ঠেকে শেখেনি তারা। তা-ই আবারও অভিযোগ। এ বার মামলা গড়াল ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে। টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণেরও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
তপসিয়ার ভ্রমণ সংস্থা কান্ট্রি ভ্যাকেশনস-এর বিরুদ্ধে বার বার প্রতারণার অভিযোগ আসছে দেখে শেষ পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা দফতর। সংস্থার লাইসেন্স বাতিল করতে চেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা রুজু করছে তারা। ওই সংস্থার হাতে প্রতারিত মানুষেরা যাতে দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তার আর্জি জানিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের মন্ত্রী সাধন পাণ্ডে।
২০১২-র ডিসেম্বরে এক দিন সাউথ সিটি মলে সস্ত্রীক গিয়েছিলেন যাদবপুরের বাসিন্দা ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়। কান্ট্রি ভ্যাকেশনস-এর কিছু প্রতিনিধি তখন সেখানে ছিলেন। অভিযোগ, ভাস্করবাবুদের তাঁরা ওই ভ্রমণ সংস্থার সদস্য হতে বলেন এবং বেড়ানোর ক্ষেত্রে নানা সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেন। ভাস্করবাবু জানান, ওই প্রতিনিধিদের কথায় উৎসাহী হয়ে তিনি সে দিনই কান্ট্রি ভ্যাকেশনস-এর সদস্য হন। নগদে দেন ২৩ হাজার টাকা এবং সাড়ে ২৩ হাজার টাকার চেক দেন। ভাস্করবাবুর অভিযোগ, ‘‘চুক্তির সময় আমাদের বলা হয়, বাঁকুড়ার বিষ্ণপুরে সংস্থার রিসর্ট রয়েছে। কিন্তু মাস দেড়েক পরে আমরা বিষ্ণপুরে যেতে চাইলে ভ্রমণ সংস্থার তরফে বলা হয়, সেখানে তাদের কোনও রিসর্ট নেই।’’
এর পরে সদস্যপদ বাতিল করে টাকা ফেরত চাইলে ভ্রমণ সংস্থাটি তাতে কর্ণপাত করেনি বলে অভিযোগ। ক্রেতা সুরক্ষা দফতরে অভিযোগ জানান ভাস্করবাবু। দফতরের তরফে তিন বার ডাকা হলেও ওই ভ্রমণ সংস্থার কোনও প্রতিনিধি হাজির হননি বলে অভিযোগ। এর পরে ভাস্করবাবু কান্ট্রি ভ্যাকেশনস-এর বিরুদ্ধে জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা দায়ের করেন।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জেলা ক্রেতা আদালত নির্দেশ দেয়, ভাস্করবাবুর কাছ থেকে নেওয়া টাকার পুরোটাই এক মাসের মধ্যে ফেরত দেবে কান্ট্রি ভ্যাকেশনস। সেই সঙ্গে মামলা চালানোর খরচ হিসাবে দেবে দু’হাজার টাকা। আর ভাস্করবাবুদের হয়রান করায় এবং মানসিক যন্ত্রণায় ফেলার জন্য পাঁচ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কান্ট্রি ভ্যাকেশনস। জেলা আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ভ্রমণ সংস্থাটি রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা দায়ের করে। ২০১৫-র ৩০ ডিসেম্বর রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের বিচারক বলেন, ‘‘অভিযোগকারী ব্যক্তি ভ্রমণ সংস্থার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।’’ তিনি নিম্ন আদালতের রায়ই বহাল রাখেন।
প্রতারণার অভিযোগ কার্যত স্বীকার করে নিয়ে কান্ট্রি ভ্যাকেশনস-এর পূর্বাঞ্চল শাখার জেনারেল ম্যানেজার আজহার আলি বেগ জানান, রাজ্য ক্রেতা আদালতের নির্দেশ মানবেন তাঁরা।
ওই ভ্রমণ সংস্থার বিরুদ্ধে বার বার অভিযোগ উঠছে কেন? এর আগেও ২০১১ সালে ওই সংস্থার বিরুদ্ধে ৭০ হাজার টাকা প্রতারণার অভিযোগ আনেন নাকতলার এক গৃহবধূ। ক্রেতা সুরক্ষা দফতরে অভিযোগও দায়ের করেন তিনি। সেই খবর আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশের পরে টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আপস মীমাংসা করে নেয় সংস্থাটি। আজহারের দাবি, আগের তুলনায় অভিযোগ কমেছে। কিন্তু প্রতারণার অভিযোগ আদৌ উঠবে কেন, সেই প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি তাঁর কাছে।
প্রশ্ন উঠেছে, একই সংস্থার বিরুদ্ধে বার বার প্রতারণার অভিযোগ হলেও সরকার আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন। রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেন, ‘‘ওই সংস্থার প্রতারণা নিয়ে আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে পুলিশ ও ক্রেতা সুরক্ষা দফতরে জানাতে পারি। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই।’’
ক্রেতা সুরক্ষা দফতরেরও কি কিছু করণীয় নেই? দফতরের মন্ত্রী সাধন পাণ্ডে জানিয়েছেন, যাঁরা কান্ট্রি ভ্যাকেশনস-এর কাছে প্রতারিত হয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা বিশদে জানতে চেয়ে শীঘ্রই সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘‘কান্ট্রি ভ্যাকেশনস-এর লাইসেন্স বাতিল করতে ক্রেতা সুরক্ষা আইন মেনে ১২(১) ডি ধারায় মামলা করা হবে।’’