লেডিস পার্ক।
হেদুয়া পার্ক: বিকেলবেলা ধুলো আর জঞ্জালে ভরা পার্কটায় কয়েকজন ছেলে ফুটবল খেলছে। একটু দূরেই পার্কের ভিতরে শুকনো পাতায় ভরা চৌকো বাঁধানো জায়গাটা কয়েকজন বয়স্ক নিজেরাই পরিষ্কার করে তাস খেলতে বসে পরলো। যেখানে-সেখানে ফেলা হয়েছে চিপসের প্যাকেট, খাবারের প্যাকেট। আর তার মধ্যেই বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে চলছে কয়েকজন। এই ছবি হল উত্তর কলকাতার অন্যতম পুরনো পার্ক হল হেদুয়া পার্কের।
লেডিস পার্ক: পার্কের একপাশে কয়েকজন ক্রিকেট খেলছে। আবার কয়েকজন ফুটবল খেলছে। আর একদিকে গাধা চরাচ্ছেন এক যুবক। পার্কের একপাশে ভাঙা ইটের টুকরোয় ভর্তি। আর তার পাশেই একটি শিশু উদ্যান। যেখানে মাঝমাঝেই আছে কয়েকটা ভাঙা ডাস্টবিন। উদ্যানে দোলনা থেকে স্লিপার সবই আছে। কিন্তু মরচে পরেছে সবগুলিতেই। যেকোনো সময়ই ভেঙে পরতে পারে দোলনা। বিকেলবেলা কচিকাচাদের ভিড় যথেষ্ট। দোলনা দোলার অসীম আনন্দে এসব ঝুঁকিকে তারা পাত্তা দিতে নারাজ।
রবীন্দ্র সরোবর: পার্কে ঢোকার বিশাল বড় গেটের মুখে বড় বড় করে লেখা পার্ক পরিষ্কার রাখার বিষয়ে। কিন্তু গেটের থেকে একটু দূরেই পরে আছে এঁটো প্যাকেট, খবরের কাগজ, ছেঁড়া প্লাস্টিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পুকুরটায় পচা ফুল, পাতা, পোড়া সিগারেটের টুকরো, এমনকি প্ল্যাস্টিকের ব্যাগও ভাসছে। রাস্তা পরে রয়েছে শুকনো পাতার জঞ্জাল। পার্কের এক অংশে ভাঙা ইঁটের স্তুপ।
সাফারি পার্ক: পার্কের সামনে ফলাও করে লেখা ‘প্ল্যাস্টিক মুক্ত অঞ্চল’। কিন্তু ঢুকেও দেখা গেল যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিক। আর সন্ধ্যে হলেই তাড়াহুড়ো পরে গেল পার্ক থেকে বেরোনোর জন্য। কারণ পার্কের ভিতরে পর্যাপ্ত আলো নেই ফলে অন্ধকারে কচি-কাচাদের বেরানো বেশ সমস্যার।
কলকাতার পার্কগুলির চেহারা এখন এইরকম। কোথাও শুকনো পাতায় নোংরা হয়ে আছে রাস্তা, আবার কোথাও খাবারের প্যাকেট, কাগজ পরে আছে। আবার কোন কোন পার্কের প্রাচীর ভেঙে পরছে। মুখ্যমন্ত্রী ক্লাবগুলিকে ঢালাও অর্থ বরাদ্দ করলেও পার্কগুলির উন্নতির জন্য তাঁর দফতরের পক্ষ থেকে কোনরকম উদ্যোগ নেই কেন? এই প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। অনেকেরই প্রশ্ন কলকাতার ‘সৌন্দর্যায়নের’ জন্য পৌরসভা ঢালাও বিজ্ঞাপন আর নীল-সাদা রং এ শহরকে সাজালেও, কেন এই পার্কগুলির রক্ষনাবেক্ষন ও সৌন্দর্যের দিকে নজর দিচ্ছে না পুরসভা?
কলকাতা পৌরসভার তরফ থেকে দেবাশিস কুমার জানান, ‘‘ভালোর কোন শেষ নেই তবুও পার্কগুলিকে পরিষ্কার রাখতে পৌরসভা যথেষ্ট সক্রিয়।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রতিটি পার্কে কর্মচারী আছেন পার্ক পরিষ্কার রাখার জন্য। এছাড়াও পরিবেশকে ভাল রাখার জন্য ২০টা পার্কে সোলার লাইটেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে পৌরসভার তরফ থেকে।’’
প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হচ্ছে, পার্কগুলির রক্ষনাবেক্ষনের জন্য আলাদাভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ পৌরসভার তরফ থেকে বরাদ্দ থাকে। ডিজি(পার্ক) দেবাশিস চক্রবর্তী জানান, ‘‘পুরসভা বার্ষিক প্রায় চার কোটি টাকা বরাদ্দ করে, যার অধিকাংশই ব্যয় হয় মালিদের মাইনে দেওয়ায়।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘কলকাতায় মোট ৪৫২ পার্ক আছে। আর তার অনেকগুলিতেই মালি নেই। পর্যাপ্ত মালি রাখা সম্ভব নয় এই পরিকাঠামোতে।’’
দেখভাল যে ঠিক মতো হচ্ছে না কার্যত মেনে নিলেন কর্তপক্ষ। কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট(কেআইটি) এক অধিকর্তা জানান, রাজ্য সরকারের তরফ থেকে খুব বেশি সহযোগিতা পাওয়া যায় না। যে ধরনের পরিকাঠামো দরকার পর্যাপ্ত রক্ষনাবেক্ষনের জন্য তা সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি জানান, রবীন্দ্র সরোবরের মতো বড় উদ্যান রক্ষনাবেক্ষনের জন্য মাসিক প্রায় দশ লক্ষ টাকা খরচ হয়। রবীন্দ্র সরোবর ১৯২ একর জমি আছে সেখানে মাত্র ৭৫ জন কর্মী আছেন দেখভালের জন্য। যা যথেষ্ট নয়।
প্রশাসনের অনেকেরই মতে, যদি সৌন্দার্যায়নের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে হয়, তাহলে পরিকল্পনার পাশাপাশি অর্থ বরাদ্দ ও করতে হবে। অর্থ বরাদ্দ ও পরিকল্পনায় ভারসাম্য না থাকলে পরিকল্পনা সফল হওয়া সম্ভব নয় বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।