বিডন স্ট্রিট-প্যারী রো

কোথাও স্বার্থপরতার আলো, কোথাও আঁধার

ষাটের দশকের গোড়ায় মধ্যমগ্রামে বসবাস করে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি ব্যবসার কথা ভাবা যায়নি। বাবা তাই সপরিবার চলে এলেন বিডন স্ট্রিটের প্যারী রো-তে। এলেন শরৎকাকুর বাসায়। সাহিত্যিক শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় বাবার মধ্যমগ্রামের বন্ধু।

Advertisement

অলক রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:১৬
Share:

ষাটের দশকের গোড়ায় মধ্যমগ্রামে বসবাস করে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি ব্যবসার কথা ভাবা যায়নি। বাবা তাই সপরিবার চলে এলেন বিডন স্ট্রিটের প্যারী রো-তে। এলেন শরৎকাকুর বাসায়। সাহিত্যিক শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় বাবার মধ্যমগ্রামের বন্ধু। ওঁরা বাসা পাল্টে কলকাতার দক্ষিণে যাবেন, তাই চার কামরার একতলার ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া বদল। আর বদলাবদলির সময়ে জানা গেল, ছেলেবেলায় মাতৃহীন বাবার আদত মামাবাড়িটি ওই বাড়িরই দোতলা এবং তিনতলা। তো, বাবার জুটল অভাবনীয় মামাবাড়ির আদর আর আমাদের বরাতে পাড়ার স্নেহ-ভালবাসা— যা আজও অব্যাহত।

Advertisement

সে বাড়ির অবশ্য অন্য গৌরবও ছিল। বাড়ির এক অংশের মালিক ‘ফার্স্ট বুক’-এর প্রণেতা প্যারীচরণ সরকার। তাঁর নামেই ‘প্যারী রো’। অন্য অংশের মালিক মহেন্দ্র সরকার। সে-কালের ডাকসাইটে অধ্যাপক তথা অধ্যক্ষ। তাঁর পুত্র তো কিংবদন্তি নাট্যকার-অভিনেতা বাদল সরকার। বাদলকাকার ‘শতাব্দী’র প্রায় সব নাটকেরই ডায়লগ বেশ অনেকটা করে মুখস্থ ছিল আমার আর দিদির। কারণ, রিহার্সালের ঘরটি যে আমাদের পড়ার ঘরের পাশের দেওয়াল। সেখান থেকে ভেসে আসছে ‘সুখপাঠ্য ভারতীয় ইতিহাস’-এর অমলিন রবীন্দ্র-প্যারডি, পঙ্কজ মুন্সীদের গলায়— ‘বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভে কত উপকার হয়/ শিক্ষা বিনা আমাদের কোনও সদগতি নাই আর আহা/ ফাঁকি কভু নয়/ কোরো না খেলা রোজ দু’বেলা পড়াটি যেন হয়’। হ্যাঁ, সত্তরের সন্ত্রাসের দিনগুলিতেও এক দিনের জন্যও সে মহড়া বন্ধ হয়নি এবং ‘পড়া’টি যার হওয়ার, তার হয়েছিল। সে আমার দিদি। সেন্ট মার্গারেটের বরাবরের ফার্স্ট। আমি একবারই টেনেটুনে ফার্স্ট হয়েছিলাম বোধহয়। সেও স্বপনকুমারের ‘ড্রাগন’ সিরিজের দশটি বই একসঙ্গে পাওয়ার লোভেই!

আমার পাড়ার মোড়েই ডান আর বাম দিকে আমার দুই স্কুল। স্কটিশ চার্চের প্রাইমারির প্রধান বিজয়কৃষ্ণ চন্দ্র আর শিশু নিকেতনের ইন্দুদি দু’জনেই পেয়েছিলেন জাতীয় শিক্ষকের সম্মান। শিশু নিকেতনে দুপুরে ঘুমোনোর ক্লাসও ছিল। শীতে ছেলেমেয়েদের জন্য চড়ুইভাতির আয়োজন হত। অভিভাবকদের ধরানো হত হাতে-লেখা ফর্দ: একমুঠো চাল, একমুঠো ডাল, কিছু আনাজ, অল্প সরিষার তেল। সে খিচুড়ির ঘ্রাণ আজও পাই। ছিল পার্শ্বনাথের মিছিলে সোনার গাছে রুপোর ফল, একশো ফুট লম্বা ধ্বজা দর্শন। সেখানে সব শিক্ষার্থীদের পিছনে হাসিমুখে ইন্দুদি। তাঁর দু’টি দৃঢ় হাতে প্রায়শই সুশীল দুই শিক্ষার্থীর হাত, মুখে লিউকোপ্লাস্ট, হাতে দড়ি বাঁধা। দুষ্টুমির শাস্তি, কিন্তু প্রসেশন দেখায় বাধা নেই। সেই শিশুনিকেতন আজও আছে। মামলা–মোকদ্দমায় ঘর গিয়েছে, জায়গা কমেছে, মর্যাদা যায়নি। বর্তমান শিক্ষয়িত্রীদের উদ্যমেও ভাটা নেই। স্কটিশও আছে স্কটিশেই। মনে পড়ে স্কুলের টিফিনের দুষ্টুমি। খেলাধুলোয় পড়ে গিয়ে কেটেকুটে গেলে বিজয়বাবু কানটি মুলে, ক্ষতস্থানে নিজের হাতেই টিংচার আয়োডিন, ডেটল লাগিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতেন ছেলেদের। সে রাস্তায় এখন পিঠে ভারী ব্যাগ, চোখে মোটা কাচ ‘বৃদ্ধ শিশুদের’ স্কুল-পরবর্তী কোচিং ক্লাস অভিমুখে ত্রস্ত গমন! কোথায় গেলেন স্কুল-শেষে কালো বিটনুন সহযোগে শিহরনদায়ী হজমি কিংবা ‘খেলেই মুখ লাল হয়ে যাওয়া’ অপার্থিব আইসক্রিম ফেরিওয়ালারা!

Advertisement

অল্প বৃষ্টিতেই আমার পাড়া আর অন্য পাড়া গিয়ে মিশেছে যে টি-জংশনে, সেই কারবালা ট্যাঙ্ক লেনে থইথই জল জমত। বেশি বৃষ্টিতে যাতায়াত প্রায় অগম্য হলেই কারবালা আর গোয়াবাগান অঞ্চলে যাঁরা গরুর দুধের ব্যবসা করতেন, জলের দরেই তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতেন গরম মোটা দুধ। এক পোয়া, দু’পোয়া, আধা সের। পরিষ্কার সেই দুধের পাত্রগুলি স্মৃতির ছায়ালীন আজও। স্মৃতিতে তাড়া করে আমাদের মতো অনেক অল্পবয়সিরই নেতা এবং দাদা তরুণ বড়ালের পথ-দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দিনটি। গোটা পাড়ায় রান্না হয়নি সে দিন বছর বিশেকের সেই তরুণটির সন্তাপে। আদরের নাম ছিল যার ‘ডাক্তার’। মন হাল্কা অন্য স্মৃতিতে। মোহনবাগান ক্লাবের বেশ ভারী গোছের আপনজন ছিলেন কারবালার সুকুদা —সুকু ঘোষ। খেলোয়াড়দের সইসাবুদ করিয়ে, সুকুদার নেতৃত্বে তাঁদের নজরবন্দি রাখা হত কারবালার নানা বাড়িতে। রোজ বিকেলে উঁকি মারতাম। এ রকে মোহন সিংহ তো অপর একটিতে বিদেশ বসু, উলগানাথনেরা। কবে ছাড়া পাবেন, নিজেরাও জানেন না। কারবালার সে সব রকে দিব্যি আড্ডা বসে আজও। প্যারী রো-র বাদল সরকারদের মহার্ঘ দীর্ঘ রকটি গ্রিল দিয়ে তালাবন্ধ করা হয়েছে সম্প্রতি। আমার বাড়ি, আমার গাড়ি, আমার গ্যারাজ, আমার রক— এ ভাবনাই তো এখন কাজ করে।

এরই মধ্যে পাড়ার গর্ব হয়ে গেলেন আমাদের সুকুমারদা, সুজিত দাস। আপাদমস্তক শিক্ষক ও শিল্পী মানুষটি কিনা ‘দেবী চৌধুরানী’ ছবিতে সুচিত্রা সেনকে সাজিয়েছেন! কারবালার মোড়ে আর এক বিস্ময় ছিল সুজলদা, সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়। সেও আমাদের স্কটিশের দাদা। বরুণ বর্মনের পাশে সুবীরদারও যে ময়দানি ক্রিকেটে তখন কত রেকর্ড!

Advertisement

এ প্রসঙ্গে কারবালায় আমার পড়ানোর দিদিমণি শুভ্রা শীলের কথাও বলতে হবে। দিদিমণি কয়েক বছর হল কলকাতা পুলিশের ডেপুটি বা অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার হিসাবে অবসর নিয়েছেন। পাড়ায় ক’জন জানেন, এই শুভ্রা শীল একদা শ্রীরূপা বসুর নেতৃত্বাধীন বাংলার মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্যা ছিলেন? বরাবর পড়েছি দিদিমণিদের কাছেই। আপুলদি মানে ডাকসাইটে সিনেমা প্রযোজক বিমল ঘোষের কন্যা। আমার অপর দিদিমণি অশোকাদি তো আমাদের কারবালারই। সেখানেই প্রথম দেখি তরুণ এবং সুদর্শন রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়কে। পরবর্তী কালে শ্রীকুমারদা জয়াদিকে বিয়ে করে ওই বাড়ির এবং সেই সূত্রেই আমাদের পাড়ারও জামাই হন। এ বার আদত প্রসঙ্গে ফেরা যাক।

ক্রিকেটে জোর বলে ভয়ঙ্কর সুবীরদারা ফি বছরই রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার সুপার্ব আয়োজনও করত। সে ঘরোয়া-র মেজাজই আলাদা! সেখানে ফ্রি-তে তবলা সঙ্গতকারী পার্থদা, দীর্ঘ দিন নিউইয়র্কের ব্রুকলিন-নিবাসী। রবীন্দ্র-নজরুলের পাড়াতুতো সন্ধ্যা-সকালের বদলে ইদানীংয়ের ‘হাঙ্গামা নাইট’ এ পাড়ায় এখনও ঢোকেনি। সে দিনও দেখে এলাম কারবালায় জগদ্ধাত্রী পুজোর পরের দিন ফাংশনের মঞ্চ হচ্ছে।

ফাংশনের মঞ্চ থেকেই ঢিল ছোড়া দূরত্বে অতুল্য ঘোষের বাড়ি। সকলেরই দাদু তিনি। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন স্বয়ং ইন্দিরা গাঁধী। এ গর্বে পাড়ার বয়স্কদের পা মাটিতে পড়ত না।

অতীতময় এই লেখায় কিছু বর্তমানও থাকুক। কারবালার সংঘমিত্রা লাইব্রেরিটি স্থানাভাবে উঠেই যাচ্ছিল। প্যারী রো-র কর্পোরেশন স্কুলের একাংশে মহা সমারোহেই তার পুনর্বাসন ঘটেছে। খানাখন্দে ভরা রাস্তাঘাটে পুরসভার নজরদারিও নিশ্চিত বেড়েছে। কিন্তু সে রাস্তা দিয়ে আর হেঁটে যান না অ্যামিয়েল রঞ্জিৎ রায়, সংক্ষেপে এ আর রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব। স্কটিশ চার্চ স্কুলের দীর্ঘ দিনের কিংবদন্তি হেডমাস্টার মশাই মানুষটি হাঁটবেন কী? আবালবৃদ্ধবনিতার প্রণাম পেতে পেতে অতটুকু পথই যে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর! সে পথের এক পাশে স্কটিশ কলেজের অধ্যক্ষ শান্তি মিত্রর বাগান ঘেরা বাড়ি, যে-বাগানে ক্রিকেটের ক্যাম্বিস বল পড়লে শান্তিবাবুর অনুজ প্রহরী সমীরদার পদযুগলে ঘণ্টাখানেক তেল সাধনান্তেও বলটির উদ্ধার প্রায় দুঃসাধ্যই ছিল। এখন পাড়ার ক্রিকেট আর ফুটবলের নিয়মিত চল আছে কি? বরঞ্চ মন্দ লাগে না দুপুরবেলা সাফাইকর্মীরা ইউনিফর্ম পরে এসে ময়লা তুলে নিয়ে পাড়াটাকে যখন ঝকঝকে তকতকে করে দিয়ে যান। অমন ছোট গলির মধ্যেই তখন গাঙ্গুরামের অধুনালুপ্ত মিষ্টির কারখানা। বারোয়ারি পুজোয় ফ্রি মিষ্টি আসত সেখান থেকেই। অতর্কিতে বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে পাড়া, আজও হয়তো দাঁড়াবে। কিন্তু ব্যাপক ফারাক এসে গেছে মূল্যবোধে, প্রতিদিনের যাপনে। আগে লোডশেডিংয়ে গোটা পাড়া আঁধারে ডুবত, অনন্ত প্রতীক্ষা শেষে কারেন্ট এলে স্বস্তির তুফান উঠত পাড়াময়। এখন শত অন্ধকারেও স্বার্থপরতার ইনভার্টারে পাখা, টিভি সব চলে, সব জ্বলে—আইসোলেটেড দ্বীপের মতন। সে দ্বীপে আমরা একাকী।

লেখক বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement