সায়ন্ত ও সঞ্জু। — নিজস্ব চিত্র
প্রতি বছর নিয়ম করে বেড়াতে গেলেও এ বছর পরিবারের অনেকেই বারণ করেছিলেন তাঁদের। কিন্তু নিষেধ শোনেনি তাঁরা। গত ২৫ এপ্রিল হাসিমুখে কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন বেলেঘাটার রামমোহন মল্লিক গার্ডেন লেনের ওই ৯ যুবক। শুক্রবার তাঁরা ফিরে এলেন বটে, কিন্তু তাঁদের মধ্যে দু’জনকে ফিরতে হল কাচ ঢাকা শববাহী গাড়িতে। আর বাকিরা ফিরলেন আহত অবস্থায়। পুলিশ জানায়, মৃতদের নাম সঞ্জু পাল (২৮) ও সায়ন্ত বিশ্বাস (২৮)। এ দিন কাশ্মীর থেকে তাঁদের দেহ নিয়ে আসা হয়। বিকেলে বেলেঘাটার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয় বাকি সাত জনকে।
আহতদের মধ্যে এক জন চন্দন গঙ্গোপাধ্যায় শুক্রবার নার্সিংহোমের শয্যায় শুয়ে জানালেন, বুধবার দুপুরে তাঁরা ৯ বন্ধু একটি গাড়ি করে জম্মু থেকে শ্রীনগরের দিকে আসছিলেন। বানিহালের কাছে এক দিকে পাহাড়, অন্য দিকে গভীর খাদ। চন্দন জানান, রাস্তার অনেকটা জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটি লরি। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের গাড়ির চালক ওই লরিটিকে ডান দিক দিয়ে ওভারটেক করতেই হঠাৎ করে উল্টো দিক দিয়ে একটি গাড়ি এসে পড়ে। চালক নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে ডানপাশে ঘুরতেই গাড়িটি তিন-চার বার উল্টে পাল্টে সোজা গিয়ে পড়ে খাদে।’’ চন্দন জানান, এর পরে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন তিনি। জ্ঞান ফিরতে দেখেন, ঠান্ডা জলের মধ্যে পড়ে রয়েছে গাড়িটি। ভেঙে গিয়েছে দরজা। সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে বন্ধুদের কয়েকজন। গাড়িটি দুমড়ে যাওয়ায় সামনের আসনে থাকা সঞ্জু সেখানেই পিষে গিয়েছে।
চন্দন বলেন, ‘‘আমি কোনও মতে জানালার কাচ ভেঙে বার হই। বন্ধুদের কয়েকজনকে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছিল না। জলে ভেসে গিয়েছিল। স্থানীয় লোকজন এবং সেখানকার সেনা তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সায়ন্তর দেহও ভেসে গিয়েছিল অনেক দূরে।’’
ওই ন’জনেরই এক জন বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক বিপুল দে। তিনিই বেলঘাটায় তাঁর বাড়িতে ফোন করে দুর্ঘটনার কথা জানান। তার পরেই বিপুলের দাদা পাড়ার কয়েকজনকে নিয়ে শ্রীনগরে রওনা দেন। শুক্রবার সায়ন্ত ও সঞ্জুর মৃতদেহ এবং বাকিদের ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়। এ দিন মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের ছাত্র নেতা তমোঘ্ন ঘোষ বলেন, ‘‘ঘুরতে গিয়ে যে ভাবে এমন অঘটন ঘটল তা অত্যন্ত দুঃখজনক।’’
শুক্রবার বেলেঘাটার ওই পাড়ায় গিয়ে জানা গেল, মাস কয়েক আগেই মৃত্যু হয়েছে সায়ন্তর বাবার। মাকে নিয়ে থাকতেন তিনি। কাজ করতেন তিলজলার একটি সফ্টওয়্যার কোম্পানিতে। শুক্রবার সকালে ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে ঘরবন্দিই ছিলেন মা। কাউকে দেখলেই তাঁর শুধু একটিই প্রশ্ন, ‘‘কী ভাবে বাঁচব?’’
সঞ্জুর বাবা পেশায় ব্যবসায়ী প্রবীর পাল বলেন, ‘‘আমি ওঁদের কত জায়গায় ঘুরিয়েছি। এ বছর যেতে বারণ করলাম। কেউ কথা শুনল না।’’ সঞ্জুর ভাই জয়ও ছিলেন ওই গাড়িতে। আহত হয়েছেন তিনি। প্রবীরবাবু বলেন, ‘‘মঙ্গলবার ফোনে বলেছিল ভাল ভাবেই ঘুরছি। শনিবার ফিরছি। আর ফেরা হল না।’’