সরকারি বাসের টিকিট কাউন্টারে মা-ছেলে। — নিজস্ব চিত্র।
‘‘আমি চাকরি করি। বাসভাড়া দেওয়ার স্বাধীনতা কেন আমার থাকবে না? যাঁরা পারবেন না, তাঁদের জন্য স্বাগত সরকারের এই প্রকল্প। কিন্তু সব নারীর জন্য কেন?’’— সমাজমাধ্যমে এমন প্রশ্ন তুলেছেন এক মহিলা। শুধু তিনিই নন, সমাজমাধ্যমে বা যাত্রাপথে এমন মনোভাব প্রকাশ করছেন অনেকেই। সরকারের এই প্রকল্পকে স্বাগত জানাচ্ছেন অনেকেই। পাশাপাশি অন্য মত, যাঁরা টিকিট কাটতে পারবেন, তাঁদের কেন সেই অধিকার থাকবে না? এই প্রকল্প থাকুক শুধু তাঁদের জন্যই, যাঁরা আর্থিক ভাবে পিছিয়ে।
এই প্রকল্পের সূচনায় যাতায়াতের খরচ কমায় স্বস্তি বেড়েছে কারও কারও মধ্যে। বিশেষত নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রতিদিনের যাতায়াত খরচের সাশ্রয়ে তাই খুশি হচ্ছেন অনেকেই। যেমন, ধর্মতলা বাস ডিপোয় বাসের অপেক্ষায় থাকা সাকিরুল শেখ এবং তাঁর বোন সাগরি খাতুন। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন তাঁরা। এ বার মুর্শিদাবাদে ফিরবেন। সাকিরুলের কথায়, “চিকিৎসা করাতে কলকাতায় এসেছিলাম। এক দিকে ভাল যে বোনের ভাড়াটা লাগল না। অর্থকষ্ট তো রয়েছেই। ফলে ওই টাকায় রাস্তায় খাবারের খরচ উঠে আসবে।”
এই সুবিধা যে বহু পরিবারের উপকারে আসবে, তা নিয়ে বিশেষ দ্বিমত নেই। পাশাপাশি অন্য মত, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পুরুষদের জন্যও এই উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বেসরকারি কর্মী ইলোরা মজুমদার যেমন বললেন, “আমার মনে হয়, মহিলারা যাঁরা কাজ করি, তাঁদের দায়বদ্ধতা তৈরি হওয়া উচিত যে ভাড়া দিয়েই যাব। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা ভাড়া মকুবের সিদ্ধান্তে উপকৃত হবেন। কিন্তু তাঁরা সার্বিক ভাবে উপকৃত হতে পারছেন না, কারণ তাঁদের বড় অংশ পুরুষ, যাঁদের ক্ষেত্রে বাসভাড়া মকুবের সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলছে না।”
আবার অধ্যাপিকা শিল্পী মুখোপাধ্যায়ও মনে করেন, “বহু গরিব মানুষ বাড়ি থেকে বেরোনোর কথা ভাবতেও পারেন না। সে ক্ষেত্রে যদি এক জনের ভাড়াটাও বাঁচানো যায়, তা হলে তাঁরা অন্তত দূরপাল্লার বাসে চেপে ঘুরতে যেতে পারবেন। তবে আমরা যাঁরা কাজ করি, সরকারকে আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচাতে ভাড়া দিয়েই যাতায়াত করা উচিত।”
লিঙ্গ সমতা নিয়ে বর্তমান সময়ে যত আলোচনা বাড়ছে, ততই জনকল্যাণের প্রকল্প নিয়েও নতুন নতুন ভাবনা আসছে। মহিলাদের জন্য বিশেষ সুবিধার প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও অনেকের মত, আর্থিক ভাবে অনগ্রসর পুরুষদের জন্য এমন কোনও সহায়তা প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সারানোর কাজ করেন অভি কর। তিনি বলেন, “আজকের দিনে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে খেটে খাওয়া মানুষকে এই সুবিধা দেওয়া উচিত। তা হলে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্য সাধন হয়।”
শিক্ষার্থীদের একাংশও নিজেদের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৌমিত্র সর বলেন, “মেদিনীপুরে আমার বাড়ি। এখানে পড়াশোনা করছি। আমাদের ও দিকে সরকারি বা বেসরকারি বাসে শিক্ষার্থীদের থেকে অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হয়। কলকাতায় সে রকম দেখিনি। আমরা যাঁরা কাজ না করে শুধু পড়াশোনা করছি, তাঁদের জন্য এ রকম ব্যবস্থা থাকলে ভাল হয়।”
তা হলে যে মহিলারা ভাড়া দিতে চান, তাঁদের জন্য কী ব্যবস্থা? উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের কর্মী কোয়েল সাহা বলেন, “এ রকম নির্দেশিকা নেই। কেউ ভাড়া দিতে চাইলে, সেটা তাঁর ব্যাপার। তবে ভাড়া নেওয়া নিয়ে এখনও সরকারি নির্দেশিকা আসেনি।”
মোটের উপরে, সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য ভাড়া মকুবের সিদ্ধান্তকে মানুষ স্বাগত জানাচ্ছেন। পাশাপাশি উঠে আসছে একটি সামাজিক ভাবনা, ভবিষ্যতে আর্থিক ভাবে অনগ্রসর পুরুষ বা শিক্ষার্থীদেরও কি এমন সহায়তা মিলবে? জনগণের একাংশের মত, কল্যাণমূলক উদ্যোগ বিস্তৃত হলে তবেই তার সুফল সমাজের বৃহৎ অংশে পৌঁছতে পারে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে