কলকাতায় শীতের সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে দূষণও। ছবি: পিটিআই।
কলকাতা-সহ গোটা রাজ্য জুড়ে জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। দিনভর রোদের দেখা নেই বললেই চলে। সূর্যদেব মাঝেমধ্যে উঁকিঝুঁকি দিলেও তা যথেষ্ট নয় শীতের দাপট কমাতে। ভরদুপুরেও শহরের বিভিন্ন প্রান্তে রাস্তার ধারে আগুন পোহাতে দেখা যাচ্ছে মানুষকে। কোথাও কাঠ, কোথাও শুকনো পাতা জ্বালিয়ে হাত-পা সেঁকে নিচ্ছেন পথচারীরা। চায়ের দোকানের সামনে আঁচের পাশে ভিড় জমাচ্ছেন অনেকেই। বেলা গড়াতেই ফের শুরু হচ্ছে কাঁপুনি। এরই পাশাপাশি নতুন বছরের ছুটির আমেজে শহরের পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে লাফিয়ে বেড়েছে ভিড়। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতিতে কলকাতার দূষণের মাত্রা বেড়েছে ব্যাপক হারে। আর সেই দূষণের পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে কলকাতা পুরসভা। ইতিমধ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনতে নানাবিধ পদক্ষেপ করেছে তারা। তবে সেই উদ্যোগে পরিস্থিতি কতটা আয়ত্তে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে বলেই মনে করছেন পরিবেশবিদেরা।
পরিবেশবিদদের মতে, শীতকালীন আবহাওয়া ও স্থির বায়ুপ্রবাহের জেরে শহরের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। নতুন বছরের আগের দিন ও পরবর্তী সময়ে কলকাতার একাধিক এলাকায় বায়ুর মান ‘খারাপ’ থেকে ‘অত্যন্ত খারাপ’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উদাহরণ হিসাবে যাদবপুর এলাকায় একিউআই ২৭৫ থেকে ৩০৫-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একাধিক দিনে একিউআই ৩১৬ পর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত কয়েক দিনের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বালিগঞ্জে একিউআই প্রায় ২৭৫ থেকে ৩০০-এর বেশি ছিল। সল্টলেক এলাকাতেও ১৮০ থেকে ২৭৮-এর মধ্যে একিউআই ওঠানামা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ‘খারাপ’ ও ‘অত্যন্ত খারাপ’ বায়ুমানের অন্যতম কারণ শীতকালের ধোঁয়া, কুয়াশা এবং বাতাসের স্থবিরতা।
আবহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শীতকালে বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরগুলো স্থিতিশীল হয়ে যায়। ফলে পিএম ২.৫ এবং পিএম-১০-এর মতো সূক্ষ্ম দূষণকণা উপরের দিকে উঠতে পারে না এবং শহরের মধ্যেই আটকে থাকে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলেই ঘন কুয়াশা তৈরি হয়, যা দূষণকে আরও বেশি সময় ধরে আটকে রাখে।
একাধিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, অক্টোবর থেকে জানুয়ারি—এই শীতকালীন সময়ে পিএম-২.৫ এর মাত্রা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ২৯ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বালিগঞ্জ এলাকায় কোনও কোনও দিনে পিএম ২.৫ বা ১৯৫ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার পর্যন্ত উঠেছিল, যেখানে শীতের গড় মান প্রায় ৮০। বিশেষ দিনে সর্বোচ্চ মান ১৩৫ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) ২৪ ঘণ্টার নিরাপদ মান মাত্র ১৫ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার।
দূষণের কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞেরা কম তাপমাত্রা, কুয়াশা, যানবাহনের অতিরিক্ত ধোঁয়া এবং শীতকালে জ্বালানি পোড়ানোর প্রবণতাকে দায়ী করছেন। শীতের সময় গাড়ির ইঞ্জিন থেকেও তুলনামূলক বেশি ধোঁয়া নির্গত হয়, যা স্থির বাতাসে সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। বয়স্ক, শিশু এবং শ্বাসকষ্টের রোগীদের মধ্যে হাঁপানি, ব্রংকাইটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে কলকাতা পুরসভার মেয়র পরিষদ (পরিবেশ) স্বপন সমাদ্দার বলেন, ‘‘আমরা দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে একঝাঁক পদক্ষেপ করেছি। অতিরিক্ত দূষণপ্রবণ এলাকায় জল ছিটিয়ে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক গাছপালায় নিয়মিত জল দেওয়া এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ করছি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা পরিবেশবিদদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, রাস্তাঘাটে যত্রতত্র আগুন পোহানো থেকে বিস্তর দূষণ হচ্ছে শহরে। তাই আমরা পুলিশ-প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে এই সব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক ও সচেতন করার চেষ্টা করছি। কলকাতা পুরসভার পরিবেশ বিভাগের কর্মীরাও এই বিষয়ে উদ্যোগী হয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে রাস্তাঘাটে আগুন পোহানো থেকে বিরত থাকতে বলছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমি নিজে গিয়ে রাস্তাঘাটে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোহানোর ঘটনা বন্ধ করেছি। তবে এ ক্ষেত্রে অসুবিধা হচ্ছে, পরিবেশ রক্ষার জন্য কোনও শক্ত আইন না থাকায় আমাদের আবেদন, অনুরোধের উপর নির্ভর করে থাকতে হচ্ছে।’’
সোমবার শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছিল ১২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ১.৭ ডিগ্রি কম। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবারও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১ থেকে ১২ ডিগ্রির আশপাশে থাকবে এবং আগামী রবিবার পর্যন্ত তা ১১ থেকে ১৩ ডিগ্রির মধ্যেই ঘোরাফেরা করবে। ফলে আপাতত ঠান্ডা ও দূষণ— দুই-ই কলকাতাবাসীর পিছু ছাড়ছে না।