ধর্মতলায় তৃণমূলের ধর্নামঞ্চে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।
বিজেপির সভায় মানুষের ভিড় নেই। দাবি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর কটাক্ষ, বিজেপির সভায় যা লোক হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি লোক ভিড় করেন জেসিপি দিয়ে মাটি কাটা দেখতে।
অভিষেক বলেন, তিনি কখনও ফাল্গুনমাসে রথযাত্রার কথা শোনেননি। এ বার প্রথম দেখছেন। বিজেপির রথযাত্রা কর্মসূচিকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘রথ তো নয় ম্যাটাডোর।’’ সঙ্গে মমতা বলেন, ‘‘না, না। ওটা ফাইভ স্টার হোটেল। ওখানে সব আছে।’’ প্রথমে অভিষেক বলেন, ‘‘এঁরা এখন রথযাত্রা করছে। জগন্নাধদেবের রথ দেখেছি। মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ-অর্জুনের রথের কথা শুনেছি। দেবদেবীর রথ, সারথির কথা শুনেছি। ফাল্গুন, চৈত্র মাসে যে রথ হয়, জন্মের পর প্রথম দেখলাম। আসলে বিজেপির মাটিতে পা পড়ছে না। বিজেপির জমিদাররা চড়বে রথে। তৃণমূল থাকবে পথে। তোমরা রথেই থাকো।’’
কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ করে বিজেপিকে তোপ দাগছিলেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘মোদী সরকার নাকি ৫২ লক্ষ বাড়ি দিয়েছে! আজ বিজ্ঞাপন দিয়েছে। আপনারা শ্বেতপত্র প্রকাশ করুন। যে ক’টা বাড়ি দিয়েছে, আমাদের সরকার দিয়েছে। ৬০ শতাংশ টাকা কেন্দ্রের দেওয়ার কথা। কিন্তু দিয়েছে আমাদের সরকার।’’ ঠিক ওই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী অভিষেকের উদ্দেশে বলেন, ‘বাবু, আমরা দিয়েছি ১ কোটি ২০ লক্ষ বাড়ি।’ অভিষেক বলেন, ‘আমি একবছরের কথা বললাম। ৩২ লক্ষ।’’ মমতা তখন বলেন, ‘‘আবার বলছে, ৫২ লক্ষ দিয়েছে। একপয়সাও দেয়নি।’’ সঙ্গে সঙ্গে অভিষেক বলেন, ‘‘পুরোটাই মিথ্যে। বাড়ি তো উড়ে যাবে না। যদি টাকা দিয়ে থাকো, ব্যাঙ্কের মাধ্যমে যাবে। উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে ঢুকবে। মোদী সরকার শ্বেতপত্র প্রকাশ করুক যে পাঁচ বছরে বাংলায় ক’টা বাড়ি দিয়েছে।’’
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।
‘‘তোমার কাছে ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স, বিচার বিভাগের একাংশ, তোমার কাছে রাজ্যপাল, তার পরেও বাংলা দখল করতে পারছ না। বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ক্যাটেরার থালা, ঠাকুরমশায় থালা নিয়ে দাঁড়়িয়ে আছে... খালি পাত্র আর পাত্রী নেই, কী করে বিয়ে হবে? এদের কাছে সব, কিন্তু তা-ও কিচ্ছু নেই। তৃণমূলের কিচ্ছু নেই। শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন আর বাংলার ১০ কোটি মানুষ রয়েছেন। বাকিটা তৃণমূলকর্মীরা মাঠে বুঝে নেবেন।’’ ‘বয়কট বিজেপি’ স্লোগান তোলেন।
অভিষেক জানান, তৃণমূলের অন্দরে কোনও নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিজেপিতে অভিযুক্তদের পুরষ্কৃত করা হয়।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের অভিযোগ, ‘‘চুরি করে ভোটে জেতার জন্য লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে ১ কোটি মানুষেরক নাম বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। ধরে ফেলেছেন বিএলএ-২-রা।’’ এসআইআর নিয়ে যা হচ্ছে, তার জন্য ‘ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মানসিকতার মতো’ লড়তে হবে বলে মন্তব্য করেন অভিষেক। বিবেচনাধীন নাম নিয়ে অভিষেক পরামর্শ দেন, কেউ যেন এ নিয়ে চিন্তা না-করেন। তৃণমূল প্রকৃত ভোটারদের অধিকার রক্ষা করবেই।
বিজেপি নেতা সজল ঘোষের সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে মন্তব্য ঘিরে বিতর্কে মুখ খুললেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কটাক্ষ, ‘‘সৌরভ যদি দালাল হন, ২০২১ সালে শুভেন্দু অধিকারী, দিলীগ ঘোষদের বগলদাবা করে বেহালায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে লুচি-আলুর দম খেয়ে এসেছিলেন কেন অমিত শাহ? বাঙালি তো, তাই উনি মাথানত করেননি।’’
‘‘২০২১ সালে কিছু সামাজিক সংগঠন বলেছিল ‘নো ভোট টু বিজেপি।’ আমরা এই মঞ্চে ১০ কোটি বঙ্গবাসীকে সাক্ষী রেখে বলছি, এ বার বিজেপিকে বয়কট করতে হবে। বিজেপিকে সামাজিক ভাবে বয়কট করুন। যারা বিজেপির হয়ে গলা ফাটাত, তারা যুবশ্রীর ফর্ম পূরণ করছেন। দিলে মমতাদি-ই দেবে।’’ বিজেপিকে নিশানা করে অভিষেক বলেন, ‘‘আমায় নিয়ে খুব জ্বালা। আজ অমিত শাহ এলে তাঁর ভাষণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি থাকি।’’ তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচে থাকলে তাঁকেও বিবেচনাধীন করে রাখত।’’ অভিষেক আরও বলেন, ‘‘রাজ্যপালকে পদত্যাগ করিয়েছে নির্বাচনের একমাস আগে। আর বাংলায় যে আসে তাঁকেই পদত্যাগ করতে হয়। পরেরটাও করবে। অপেক্ষা। ২০২৬ সালের মে মাসের পর। আসলে যেনতেন প্রকারেণ বাংলা দখলের চেষ্টা করছে।’’
‘‘বিবেচনাধীন নিয়ে আপত্তি নেই। ৬০ লক্ষ মানুষের নাম যদি বিবেচনাধীন হয়ে থাকে তা হলে দেশের প্রধানমন্ত্রীও বিবেচনাধীন। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীই একমাত্র নেত্রী যিনি সাধারণ নাগরিক হিসাবে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে লড়তে গিয়েছেন। আর কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে দেশের মানুষ সওয়াল করতে দেখেননি।’’
ধর্নামঞ্চে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।
‘‘ইতিমধ্যে বাংলা থেকে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম কাটা হয়েছিল। খসড়া তালিকা সেটা। তার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি দেখা গেল সংখ্যাটা ৬৩-৫৪ লক্ষ। বিবেচনাধীন সংখ্যা ৬০ লক্ষের বেশি। সবমিলিয়ে ১ কোটি ২০ লক্ষ। বিজেপি নেতারা যে কথাটা আগে থেকে বলছিলেন। এটা তো কাকতালীয় হতে পারে না।’’
‘আমি বাংলায় গান গাই’ গাইতে গিয়ে লাইন ভুল বাবুল সুপ্রিয়ের। সামলে নিয়ে বললেন, ‘‘ভুলে যাইনি, গুলিয়ে গিয়েছে।’’ মোবাইল বার করে আবার সৈকত মিত্রের সঙ্গে গান ধরেন তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রার্থী। তাতে যোগ দেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
গানে গানে কল্যাণ, সৈকত, বাবুল। ছবি: ফেসবুক।
রাজ্যের মন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘‘একজন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ হিসাবে যাঁরা আজ বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের স্যালুট জানাচ্ছি। মুসলিমদের ভোট বাদ দিয়ে দিলে মমতাকে হারানো যাবে বলেন বিজেপি। ভুল কথা। আমরা আরও লড়াইয়ের শক্তি পাই। এখন সকলে ঘোলা জলে মাছ ধরতে চাইছে।’’
বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায় জানান, এসআইআর নিয়ে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নেতা অভিষেক যে লড়াই করছেন, তা সারা ভারতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। তিনি মমতা এবং অভিষেকের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘‘ওঁদের জন্য এই দলে আছি। উনি যখন এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গেলেন, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মানুষের জন্য সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করেন, তিনি শেখাতে পারেন লড়াই কাকে বলে।’’
মুখ্যমন্ত্রী আবার শনিবার ধর্নামঞ্চ থেকে বলবেন। তিনি বলেন, ‘‘এ বার শতাব্দী বলবে। তার পর অভিষেক। আজ আমি আর বলছি না। আমি আবার কাল বলব।’’
তৃণমূলের ধর্নামঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সায়নী ঘোষ তখন বক্তা। তৃণমূলনেত্রী মমতার পাশের আসনে গিয়ে বসেন অভিষেক।
‘ভোট নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার কেড়ে নিতে দেব না’ লেখা পোস্টার গলায় ঝুলিয়ে ধর্নামঞ্চে বলতে ওঠেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তিনি বলেন, ‘‘এটা নীতি বা আদর্শের লড়াই নয়। এটা বেঁচে থাকার লড়াই। আজ কলকাতার কোনও মানুষ, যাঁরা বাসে-ট্রামে যাচ্ছেন, আর ভাবছেন, মমতা তো আবার বসেছেন (ধর্নায়), তাঁর মতো অপরাধী আর নেই। এসআইআর এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সাধারণ শিক্ষিত মানুষও বুঝতে পারছেন না। বুদ্ধিজীবী সমাজ, শিক্ষিত ছেলেমেয়েরাও এসআইআরের পরিকল্পি গেম, চক্রান্তটা ধরতে পারছে না।’’ তথ্যগত অসঙ্গতি থেকে ভোটার তালিকায় নাম বাদ নিয়ে কমিশন এবং বিজেপিকে তোপ কৃষ্ণনগরের সাংসদের। তাঁর অভিযোগ, বড় ষড়যন্ত্রের চেষ্টা হয়েছে।
এর মধ্যে প্যারাটিচারদের সংগঠনের বিক্ষোভ হয়। তাঁদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পর সাংসদ সায়নী ঘোষ বক্তব্য করেন।
ধর্নামঞ্চে মহুয়া মৈত্র। ছবি: ফেসবুক।
এসআইআরের নাম করে কবি জয় গোস্বামীকে হেনস্থা করা হয়েছে। অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর। তিনি জয়ের বক্তব্যের পর বলেন, ‘‘এই এসআইআরে উনিও ভিক্টিম। ওঁকেও হেয়ারিংয়ে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। এটা ‘ইনসাল্ট’ ছাড়া আর কিছু নয়। ‘হিউমিলিয়েশন’ ছাড়া আর কিছু নয়।’’ এর পর মতুয়া সম্প্রদায়ের তরফে মমতাবালা ঠাকুরকে বলতে বলেন মমতা।
আরও একটি ঘটনা বলেন কবি জয় গোস্বামী। তিনি জানান, মহাশ্বেতা দেবীর বাড়িতে একদিন ছিলেন তাঁরা। রাত্রি ১১টা ১৫ মিনিট তখন। মমতা মুড়ি-চানাচুর খাচ্ছিলেন। জয়ের কথায়, ‘‘আমি বললাম, ‘বাড়ি যাবেন তো মমতা?’ উনি বললেন, ‘নন্দীগ্রাম যাব।’ আমি বললাম, ‘এখন?’ উনি মুড়ি খেতে খেতে শান্ত গলায় বললেন, ‘কাজ করা ছাড়া আর আমাদের কী করার আছে জয়দা?’’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘মৃত্যু পর্যন্ত মমতা যেখানে থাকবেন, আমি থাকব। তাঁর পাশেই আমি থাকব।’’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জয় গোস্বামী। —নিজস্ব ছবি।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন নিয়ে মন্তব্য করেন কবি জয় গোস্বামী। তাঁর দাবি, হাঁসখালি ধর্ষণকাণ্ডে ন্যায়বিচারের নেপথ্যেও মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘নন্দীগ্রামে ১৪ মার্চ যখন গুলি চলে, সেই রাতে একজন গাড়ি নিয়ে চললেন নন্দীগ্রাম পৌঁছোবেন বলে। তাঁর সঙ্গী ছিলেন কবীর সুমন। তাঁদের তিন বার রাস্তায় বাধা দিয়েছে তৎকালীন সরকারের পুলিশ। তিনি প্রণব মুখোপাধ্যায় এমনকি, মনমোহন সিংহকে (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী) ফোন করেছেন। তিন বার রাস্তা ‘ক্লিয়ার’ করে পৌনে ৪টের সময় হাসপাতালে পৌঁছোন। তখন একটার পর একটা লোক মারা যাচ্ছেন। ভোর ৫টা তিনি নন্দীগ্রামে পৌঁছোন। সে দিন ওঁর সঙ্গে ছিলেন এই মানুষটি (কবীর সুমনকে দেখিয়ে)।’’
জয় গোস্বামী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘‘আমি কয়েকটা পুরনো কথা বলব। ওঁদের কথা বলার পরে আমার কথা নির্জীব। আমি এখানে কেন এসেছি? সেটা ব্যক্তিগত। আমার তখন তিনটে সার্জারি একসঙ্গে হয়েছে। সেই সময়ে আমার বাড়ি ফোন এল যে আমার ভোটাধিকারের অধিকার প্রমাণ দিতে হবে। সে সব কথা আমার স্ত্রী-কন্যা আমায় জানাননি। তাঁরা ব্যবস্থা করেছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি মমতার ডাকে গিয়েছিলাম। আমি সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে একজন আবেদনকারী। সেই আবেদন যে আমি করতে পারি, এই শরীর নিয়ে যদি করতে পারি, সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন মমতা। এই এসআইআরের জন্য কত মানুষ মারা যাচ্ছেন। এর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ লড়াই করতে পারেন মমতা।’’
মুখ্যমন্ত্রীর ধর্নামঞ্চে কবীর সুমনের নির্ঘোষ, ‘‘বিজেপি হারছেই।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমি মনেপ্রাণে তৃণমূল মোটেও নই। আমার একাধিক অভিযোগ আছে। কিন্তু এত দিন এতটা সাফল্যের সঙ্গে এত দায়িত্ব পালন করে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানচন্দ্র রায়ের পরেই... একবার কলকাতারা রাস্তাঘাট দেখুন। আগে কী ছিল?’’ যাদবপুরের প্রাক্তন সাংসদ জানান, ভোটদান অধিকার। সেই অধিকার কেউ কাড়তে পারে না। তিনি ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ রবীন্দ্রসঙ্গীত গান। পরে মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে ‘পথে আবার নামো সাথী’ গানটি গান।
কবীর সুমন এবং জয় গোস্বামী। —নিজস্ব ছবি।