ভোটের যুদ্ধে মিষ্টি-যোগ

বাংলার ইতিহাসে রাজনীতির সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। উনিশ শতক থেকেই চলে আসছে। মিষ্টি গবেষকদের অনেকের মতে, ‘সন্দেশ’ নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সংবাদ আদানপ্রদানের বিষয়টি।

Advertisement

কৌশিক ঘোষ

কলকাতা শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০১৯ ০১:৫৮
Share:

নতুনত্ব: রিষড়ার একটি দোকানে ভোটের মিষ্টি। নিজস্ব চিত্র

শাড়ি, টুপি, ছাতার মতো ভোটের বাজার গরম করতে হাজির মিষ্টিও।

Advertisement

বাংলার ইতিহাসে রাজনীতির সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। উনিশ শতক থেকেই চলে আসছে। মিষ্টি গবেষকদের অনেকের মতে, ‘সন্দেশ’ নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সংবাদ আদানপ্রদানের বিষয়টি। বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের সংবাদ দেওয়ার সময়ে ‘সন্দেশ’ খাওয়ানোর রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। পরে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও ‘সন্দেশ’ বিতরণের রেওয়াজ চালু হয়।

গবেষক হরিপদ ভৌমিকের মতে, ‘‘ঊনবিংশ শতাব্দীতে লর্ড ক্যানিংয়ের স্ত্রীকে সম্মান জানাতে ‘লেডিকেনি’র উদ্ভব। এই মিষ্টির আদি নাম ছিল লেডি ক্যানিং। পরবর্তীকালে লর্ড রিপনকে সম্মান জানাতে তৈরি হয় লর্ড রিপন সন্দেশ। একই ভাবে রানি ভিক্টোরিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে ‘জুবিলি’ সন্দেশের চল হয়।’’

Advertisement

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলায় রাজনৈতিক দলের অধিবেশন উপলক্ষেও বিশেষ ধরনের মিষ্টি তৈরির রেওয়াজ ছিল। যেমন, কংগ্রেসের এক অধিবেশনে মতিলাল নেহরুর নামে ‘নেহরু’ সন্দেশ তৈরি করা হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নামেও তৈরি হয় দুই ধরনের মিষ্টি। আর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নামে তৈরি ‘আশুভোগ’ প্রথম মিষ্টি হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পায় বলে জানান হরিপদবাবু।

সেই ট্র্যাডিশন এখনও রয়েছে। তবে তার আঙ্গিক বদলেছে। আজকাল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতীকের ছাঁচে তৈরি হচ্ছে মিষ্টি। সবই মূলত সন্দেশ। কোথাও আবার রং বদলে রসগোল্লা হয়ে যাচ্ছে সবুজ, গেরুয়া বা লাল। রিষড়ার ফেলু মোদকের কর্ণধার অমিতাভ দে বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর সময় থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতীকের আদলে মিষ্টি তৈরি করি। তৃণমূলের প্রতীকের ছাঁচে ঘাসফুল ছাড়াও সিপিএমের কাস্তে হাতুড়ি তারা, আরএসপি-র ধানের শিসের সন্দেশ বা বিজেপি-র পদ্ম সন্দেশ তো আছেই। তা ছাড়া, আমাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রঙে রসগোল্লা তৈরি করা।’’ তিনি জানান, এ সমস্ত ক্ষেত্রে দলীয় নামের সূত্রেই সন্দেশের নামকরণ করা হয়। রসগোল্লাও তা-ই। ভোটের ফল বেরোনোর পরে ওই রঙিন রসগোল্লার চাহিদা সব চেয়ে বেশি হয়। দলীয় কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও ওই রসগোল্লা কেনার হিড়িক পড়ে যায়। ভবানীপুরের এক মিষ্টিপ্রাণ বাঙালি অমল চৌধুরী বলেন, ‘‘কোন রাজনৈতিক দলের মিষ্টি পছন্দ করি, তা বলব না। কিন্তু এই ধরনের মিষ্টি একটা উন্মাদনা তৈরি করে। দেখতেও ভাল লাগে।’’

গত লোকসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদীকে সংবর্ধনা জানাতে বঙ্গ বিজেপি থেকে নকুড়ের সন্দেশ পাঠানো হয় বলে জানালেন ওই সংস্থার মুখপাত্র পার্থ নন্দী। তিনি বলেন, ‘‘আমরা আলাদা করে ভোটের মিষ্টি তৈরি করি না। তবে কেউ অর্ডার দিলে করে দিই।’’

খাস কলকাতায় ‘ভোট মিষ্টি’র অন্যতম প্রবক্তা ‘বলরাম মল্লিক অ্যান্ড রাধারমণ মল্লিক’-এর কর্ণধার পপি মল্লিক বলেন, ‘‘ভোটের মিষ্টিতে মূলত দলীয় প্রতীককেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিভিন্ন দলের প্রতীকের ছাঁচেই আমাদের মিষ্টি তৈরি হয়।’’ ‘নলিন চন্দ্র দাস অ্যান্ড সন্স’-এর তরফে তপনকুমার দাস বলেন, ‘‘গত লোকসভা নির্বাচন থেকেই আমরা ভোটের নানা রকম মিষ্টি তৈরি করছি। মূলত দলীয় প্রতীকগুলির অনুকরণেই মিষ্টি তৈরি হয়। তবে কলকাতায় যে হেতু ভোট মে মাসের শেষে, তাই এখনও ভোটের মিষ্টি তৈরি শুরু করিনি। বিভিন্ন দলের রঙে রসগোল্লা তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে।’’

তবে বিভিন্ন মহলে এমন মিষ্টির চাহিদা থাকলেও প্রশ্ন উঠছে, এই ধরনের মিষ্টিতে ব্যবহৃত রং কতখানি স্বাস্থ্যসম্মত? এ প্রসঙ্গে কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ খাবার ও মিষ্টিতে যে রং ব্যবহারের নিয়ম বেঁধে দিয়েছে, সেই রংই দোকানে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। দফতরের মুখ্য উপদেষ্টা তপন মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘কোন রং স্বীকৃত, শুধু সেটা থাকলেই হবে না। কত পরিমাণে ওই রং ব্যবহার করা যাবে, তারও নির্দিষ্ট নির্দেশিকা আছে। এই দু’টি বিষয় মানা হলে তবেই সেই রং ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।’’

অধিকাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাঁরা নিয়ম মেনেই রঙের ব্যবহার করেন। ‘নকুড়চন্দ্র নন্দী’র মুখপাত্র পার্থবাবু বলেন, ‘‘আমাদের মিষ্টিতে কোনও রং ব্যবহার করা হয় না। পরিবর্তে মূলত স্ট্রবেরির নির্যাস ব্যবহার করি।’’ একই কথা বলছেন ‘বলরাম মল্লিক অ্যান্ড রাধারমণ মল্লিক’-এর কর্ণধার পপি। ‘‘সরকার স্বীকৃত রঙের বাইরে কোনও রং ব্যবহার করা হয় না’’— বলছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গ মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক জগন্নাথ ঘোষ বলেন, ‘‘সরকারি নির্দেশিকায় যে ভাবে রং ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, তা মেনেই মিষ্টি বিক্রেতাদের রং ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া রয়েছে। সেই নির্দেশ ছাড়া রং ব্যবহার করলে অবশ্যই বেআইনি।’’

এখন এই ধরনের মিষ্টির বাজার কেমন? জগন্নাথবাবু বলেন, ‘‘জিএসটি নিয়ে সমস্যা আছেই। কিন্তু এই মিষ্টির চাহিদা না থাকলে কেউ তৈরি করত না। আমাদের মূল লক্ষ্যই বিক্রি। তাই বাজার রয়েছে।’’ তবে মিষ্টির চাহিদায় কোন দল এগিয়ে, তা নিয়ে মুখ খুলছেন না কেউ।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন