মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পর তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক-নেতাদের আঙুল মূলত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। তাঁর নেতৃত্ব, দল পরিচালনার ক্ষমতার পাশাপাশি, নিচুতলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় অনীহা, দলের নেতাদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থা রইল অভিষেকেই। ‘বিদ্রোহ’ এবং ‘বিরোধিতা’ সত্ত্বেও অভিষেকই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে থেকে গেলেন। তবে তাঁর সঙ্গে সর্বভারতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হল রাজ্যসভার দুই সাংসদ দোলা সেন এবং ডেরেক ও’ব্রায়েনকে। পাশাপাশি, ভোট-বিপর্যয়ের পর সুব্রত বক্সীকে সরিয়ে তৃণমূলের নতুন রাজ্য সভাপতি করা হল চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে।
বুধবার তৃণমূলের সমস্ত সংগঠন এবং শাখা সংগঠনের কমিটি ভেঙে দেয় তৃণমূল। শুক্রবার কালীঘাটে বৈঠকে বসেন নেতৃত্ব। তাতে নতুন করে দল সাজানোর কথা ঘোষণা করেন মমতা। তারই অংশ, দোলা এবং ডেরেককে অভিষেকের সহকারী করা। যদিও তৃণমূলের একাংশের ব্যাখ্যা, এত দিন দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসাবে কাজ করে এসেছেন অভিষেক। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে তাঁর সঙ্গে আরও দু’জনকে যুক্ত করা হল। যাঁরা ‘সাহায্য’ করবেন অভিষেককে। তবে কার্যক্ষেত্রে তার খুব একটা প্রতিফলন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে।
তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে রাজ্য সভাপতি থাকা ৭৫ বছর বয়সি সুব্রতকে সরিয়ে প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রিমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রদেশ তৃণমূলের সহ-সভাপতি করা হয়েছে উলুবেড়িয়ার সাংসদ সাজদা আহমেদকে। ওই পদ দেওয়া হয়েছে চৌরঙ্গীর বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যসভার সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর এবং চণ্ডীতলার বিধায়ক স্বাতী খন্দকারকে। রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে বাবর আলি, পুলক রায়, অসীমা পাত্র, অরূপ বিশ্বাস এবং রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কার্যনিবাহী কমিটির সদস্য করা হয়েছে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, রানা চট্টোপাধ্যায়, বিদেশ বসু, তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য, জয়া দত্ত, তাপস চট্টোপাধ্যায়, বসুন্ধরা গোস্বামী এবং গৌতম দেবকে।
তৃণমূল যুব সভাপতি পদে বহাল রইলেন যাদবপুরের সাংসদ সায়নী ঘোষ। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে মধুরিমা ঠাকুরকে। মালা রায়কে এ বার তৃণমূলের মহিলা সভাপতি করা হয়েছে। তৃণমূলের ছাত্র সংগঠন থেকে অভিষেক-ঘনিষ্ঠ তৃণাঙ্কুরকে সরিয়ে সভাপতি করা হল প্রিয়াঙ্কা অধিকারীকে।
তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের রাজ্য সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বহিষ্কার করা হয়েছে আগেই। ফলে ওই পদে বদল অনিবার্য ছিল। সেই দায়িত্বে আনা হয়েছে প্রাক্তন মন্ত্রী মলয় ঘটককে। হকার সংগঠনের দায়িত্বে মদন মিত্র এবং লিগ্যাল সেলের দায়িত্বে বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ই রইলেন। জেলা কমিটির দায়িত্বে কারা থাকবেন, তা পরে ঠিক করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের মুখপাত্র হিসাবে চন্দ্রিমা, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন এবং কুণাল ঘোষই থাকছেন। কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে শুভাশিস চক্রবর্তীকে।
দলীয় কাঠামো পরিবর্তনের পরেও সংগঠনে বেশ কিছু নামের সংযোজন এবং অনুপস্থিতি— দুই-ই নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে তৃণমূলের অন্দরে। প্রথম নাম সায়নী। তিনি যাদবপুরের সাংসদ হওয়ার আগে থেকেই যুব সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলপ্রকাশের সমাজমাধ্যম ছেড়ে মাঠে দেখা যায়নি সাংসদকে। এমনকি, মমতার ধর্নাতেও অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। অরূপকে নিয়ে টালিগঞ্জবাসীর মধ্যে ক্ষোভের দাবানল জ্বলছে। তার পরেও সংগঠনে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার বিজেপি থেকে আবার তৃণমূলে ফেরা ত্রিপুরার সংগঠন দেখে আসা এবং ডেবরায় পরাজিত হওয়া রাজীবের অন্তর্ভুক্তিও অনেকে অবাক করেছে। একই ভাবে প্রশ্ন উঠেছে বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় কেন নেই। কেন ‘দুর্দিনের সঙ্গী’ যুবনেতা সুদীপ রাহা কোথায় জায়গা পেলেন না। একই ভাবে বিদেশ, রানা, বসুন্ধরার সাংগঠনিক ক্ষমতা কতটা, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকছে।
তৃণমূলের পরিষদীয় দল ভাঙার পরে সংসদীয় দলের ভাঙন নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে। শুক্রবার সরাসরি মমতাকে তোপ দেগেছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তাঁর সঙ্গে একাধিক মহিলা সাংসদ রয়েছেন বলে খবর। তবে সেই জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন মমতা-ঘনিষ্ঠেরা। শুক্রবার বৈঠকের পর কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘আজকের বৈঠকে সব সাংসদকে ডাকা হয়নি। দলের তরফে যাঁদের ডাকা হয়েছিল তাঁরা সকলে সশরীরের এবং ভার্চুয়ালি হাজির ছিলেন।’’ যদিও মমতা জানিয়েছিলেন, অরূপ যোগ দেবেন বৈঠকে। কিন্তু তিনি শেষপর্যন্ত যাননি। অন্য দিকে, যে দিন মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ববি, সে দিন তাঁর দলীয় পদ (তৃণমূলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক)-ও গিয়েছে। তাঁকে কর্মসমিতিতেও রাখা হয়নি। জানা গিয়েছে, সাংসদ কল্যাণ এবং মালা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। ভার্চুয়ালি ছিলেন মহুয়া মৈত্র, দীপক অধিকারী (দেব) এবং সুস্মিতা দেব।
শুক্রবার তৃণমূলের নতুন কমিটি ঘোষণার পর বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত খোঁচা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘যাঁর হাত ধরে ‘তৃণ’ স্তরের ‘মূল’ পার্টি লাটে উঠে গেল, তাঁর উপর আস্থা মানে জনগণের প্রতি অনাস্থা।’’ অন্য দিকে, তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করার বিরোধিতা করে সোমবার কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ।