—প্রতীকী চিত্র।
আগুন লাগার পরে কেটে গিয়েছে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময়। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা নাগাদ আনন্দপুর থানা এলাকার মাতঙ্গিনী কলোনিতে গিয়ে দেখা গেল, সেখানকার কয়েক জন বাসিন্দা নিজেদের পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া ঘরে হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছেন মূল্যবান সামগ্রী ও নথি।
বছর ষোলোর এক কিশোরকে দেখা গেল, সে তাদের পোড়া বাড়িতে ঢুকে গাছের ডাল দিয়ে ছাইয়ের গাদা ঘেঁটে কিছু একটা খুঁজছে। শুভজিৎ গিরি নামে ওই কিশোর বলল, ‘‘আমি এ বার মাধ্যমিক দেব। আমার বইপত্র সব পুড়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে পুড়েছে মাধ্যমিকের রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটও। আমি কী ভাবে পরীক্ষায় বসব, বুঝতে পারছি না। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক শুরু। এখন পড়তে না পারলে পাশ করব কী করে? সব বইখাতা নতুন করে কেনার সামর্থ্য নেই।’’ শুভজিৎ জানাল, সে তার বাড়ির কাছেই ভিআইপি নগর হাইস্কুলে পড়ে। দেখা গেল, বন্ধুর ঘর পুড়ে যাওয়ার খবর পেয়ে কয়েক জন কিশোর তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। ওই বন্ধুরা তাকে আশ্বাস দিয়ে জানায়, বই ভাগ করে পড়াশোনা করবে তারা। তাতে কিছুটা আশ্বস্ত হয় শুভজিৎ।
শুভজিতের বাড়ির পাশেই থাকে এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী অর্পিতা হালদার। অর্পিতা বলল, ‘‘আমার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড পুড়ে গিয়েছে। আগুন থেকে কিছুই বাঁচাতে পারিনি। সব বই পুড়ে গিয়েছে। আমি যে বন্ধুদের সঙ্গে বই ভাগ করে পড়ব, তারও উপায় নেই। কারণ, আমার যে সমস্ত বিষয় রয়েছে, সেগুলি ওদের নেই। এ বারই প্রথম সিমেস্টার পদ্ধতিতে উচ্চ মাধ্যমিক হচ্ছে। আমার প্রস্তুতি খুব ভাল হচ্ছিল। শেষ মুহূর্তে বই না পেলে কী ভাবে পড়ব, জানি না। এ বার হয়তো পরীক্ষাই দেওয়া হবে না।’’ অর্পিতার পাশেই ছিলেন তাঁর মা তপতী হালদার। তপতী বলেন, ‘‘মেয়েটা পড়াশোনায় খুব ভাল। কিন্তু একটা আগুন ওর পড়াশোনার বড় ক্ষতি করে দিল।’’
ওই বস্তিতে থাকে অনেক স্কুলপড়ুয়াও। তাদেরই মধ্যে এক জন দশম শ্রেণির পড়ুয়া সুরঞ্জন পাত্র। এ দিন দেখা গেল, ঘরের ধ্বংসস্তূপে বই-খাতা খুঁজছে সে। সুরঞ্জনের কথায়, ‘‘সবে ক্লাস টেনে উঠে বাংলা ও ইংরেজি বই স্কুল থেকে পেয়েছিলাম। সেই নতুন বইগুলোও পুড়ে গেল।’’
বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ আনন্দপুরের এই বস্তিতে আগুন লাগে। দমকলের ন’টি ইঞ্জিন কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণ করে। অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি না হলেও বস্তির ৫০টির মতো ঘর পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছে। বাসিন্দারা জানালেন, আগুন লাগার পরে কোনও মতে কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার বার করে আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু ঘরের কিছুই আগুন থেকে উদ্ধার করতে পারেননি।
ক্ষতিগ্রস্ত অনেক বাসিন্দাই জানালেন, সোনার গয়না, টাকাপয়সার সঙ্গে আধার কার্ড, ভোটার কার্ডও পুড়ে গিয়েছে। জয়ন্ত মণ্ডল নামে এক বাসিন্দা নিজের পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘আমার এসআইআর-পর্ব হয়ে গিয়েছে। হিয়ারিং-এ ডাক পড়েনি। তবে, কোনও কারণে যদি ডাক পড়ে, তখন তো আমি কোনও নথিই নিয়ে যেতে পারব না। নথিপত্র সবই পুড়ে গিয়েছে। কী ভাবে আবার নথিপত্র হাতে পাব, জানি না।’’ আর এক বাসিন্দা নীলিমা গায়েনের কথায়, ‘‘আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তবে মা-বাবার বাড়িতেই আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ছিল। সব পুড়ে গিয়েছে। মা-বাবা বিয়েতে গয়না দিয়েছিলেন। সেই গয়নারও কিছুই অবশিষ্ট নেই। সব শেষ।’’ বলতে বলতে চোখের কোণ ভিজে যায় নীলিমার।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে