ছবি: শুভাশিস ভট্টাচার্য
এটা থিয়েটার পাড়া। হাতিবাগান অঞ্চলে বিধান সরণি থেকে শুরু করে আমাদের পাড়া অভয় গুহ রোড গিয়ে মিশেছে হরি ঘোষ স্ট্রিটে। এক দিকে বৃন্দাবন বোস লেন। অন্য দিকে, হেমেন্দ্র সেন স্ট্রিট। এই নিয়েই আমার পাড়ার চৌহদ্দি। পাড়ায় ঢোকার মুখে বিধান সরণির উপরেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্টার থিয়েটার। গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও নটী বিনোদিনীর স্মৃতি বিজড়িত স্টার থিয়েটার— যার সঙ্গে মর্মে জড়িয়ে আছে বাঙালির নাটক ও থিয়েটার সংস্কৃতি। রাস্তার উল্টো দিকে রাজাবাগান স্ট্রিটে থাকতেন প্রবাদপ্রতিম অভিনেত্রী বিনোদিনী। এখন সেই রাস্তার নাম বদলে হয়েছে নটি বিনোদিনী সরণি। উল্টো দিকে ছিল রূপবাণী সিনেমা হলও। তার সঙ্গেও জড়িয়ে বাঙালির বহু স্মৃতি।
পাড়ার কথা লিখতে বসে আজ স্মৃতিমেদুর বোধ করছি। অতীতের পাতা থেকে ভেসে উঠছে ছোট-বড় কত ঘটনা। আপাতদৃষ্টিতে হয়তো মূল্যহীন, তবু জীবনস্মৃতির প্রেক্ষাপটে সে সব অমূল্য। পাড়াকেন্দ্রিক ছোট ছোট ঘটনা, মানুষে মানুষে আন্তরিক সম্পর্ক আর নিজের পরিবারের বাইরে এক বৃহত্তর পরিবার আমার জীবনটাকে সমৃদ্ধ করেছে। এ পাড়ায় জন্ম নয়, অতীতটা কেটেছে ডব্লিউ সি ব্যানার্জি স্ট্রিটে। ১৯৮১ সাল থেকে এখানেই। তাও কম নয়, দেখতে দেখতে পঁয়ত্রিশটা বছর এখানেই সুখে-দুঃখে কাটালাম।
সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন অনিবার্য। এ পাড়াও তার ব্যতিক্রম নয়। আগে পাড়াটা ছিল অনেক ফাঁকা। বাড়িগুলি ছিল একতলা, বড়জোর দোতলা। এখন বেশির ভাগ বাড়িই বেশ উঁচু। তবে এখনও এখানে থাবা বসায়নি ফ্ল্যাট সংস্কৃতি। তাই বেশির ভাগই বাড়ি। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জনসংখ্যাও। আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে নাগরিক পরিষেবা। বসেছে জোরালো আলো, রয়েছে পর্যাপ্ত জলের জোগানও। বসেছে ঠাণ্ডা পানীয় জলের কলও। নিয়ম করে দু’বেলা রাস্তা পরিষ্কার ও জঞ্জাল সাফাই হয়। পাড়ার ভিতরে সৌন্দর্যায়ন বাড়াতে দেওয়ালে কিছু ফ্রেসকো বসেছে। এলাকার নাগরিক সচেতনতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাস্তাঘাট অনেক পরিচ্ছন্ন থাকে। এ সব দেখে পাড়া নিয়ে গর্ব হয়। কোনও সমস্যায় কাউন্সিলর মোহনকুমার গুপ্তকে পাশে পাওয়া যায়। এসেছেন অবাঙালিরা, তবুও মনে প্রাণে এ পাড়ায় বেঁচে আছে বাঙালিয়ানা।
আশপাশের অনেক পাড়াতেই যখন শুনতে পাই মূল্যবোধ আর সম্পর্কের অবক্ষয়ের কথা, তখন বলতে ভাল লাগছে এ পাড়ায় মানুষে মানুষে যোগাযোগ আর সুসম্পর্ক আজও টিকে আছে। আগের মতো পাড়া-পড়শির বাড়িতে আসা যাওয়া কমলেও যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। উৎসবে অনুষ্ঠানে তাঁদের নিমন্ত্রণ করা বা কোনও ব্যাপারে আজও এক ডাকেই তাঁদের পাশে পাওয়া যায়।
কমেছে এ পাড়ার আড্ডার পরিবেশ। এখনও কিছু মানুষ আড্ডা দেন তেলেভাজা বা মিষ্টির দোকানের সামনে। তবে তাঁদের সংখ্যাটা আগের তুলনায় কমেছে। আগে আড্ডা বসত মূলত সন্ধ্যাবেলা। এখন সন্ধ্যা হতে না হতেই মাঝবয়সি থেকে বৃদ্ধ সকলেই টিভির সামনে মশগুল। সেই মাদকতাকে উপেক্ষা করে আড্ডায় মাতেন এমন মানুষের সংখ্যা এখন বিরল। এ পাড়ায় এসে দেখেছি রাস্তায় ফুটবল খেলা হত। তখন অবশ্য রাস্তায় এত গাড়ির যাতায়াত ছিল না। ২৬ জানুয়ারি আর ১৫ অগস্ট সারা দিন ধরে ক্রিকেট আর ফুটবল খেলা হত। সে সব আজ স্মৃতি।
পাশেই বৃন্দাবন বোস লেনে রয়েছে গুহদের কালীমন্দির। বছরভর ভক্তদের আনাগোনায় জায়গাটা জমজমাট থাকে। পাড়ার মুখেই আছে লক্ষ্মীনারায়ণ সাউ-এর তেলেভাজার দোকান। প্রতি বছর সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনে সকালে বিনামূল্যে তেলেভাজা বিতরণ করা হয়। এই পাড়ায় মধুরেণ সমাপয়েৎ-এর ঠিকানা ননীলাল ঘোষের মিষ্টির দোকান।
এ পাড়ার বড় সমস্যা পার্কিং। অনেকেই হাতিবাগানে বাজার করতে এসে এ পাড়া ও তার আশপাশে গাড়ি পার্ক করেন। রাত যত বাড়ে পার্কিং-এর সমস্যাও তত বাড়তে থাকে। এ জন্য পাড়া-পড়শির গাড়ি রাখতে অসুবিধা হয়, গাড়ি নিয়ে ঢুকতে বেরোতেও সমস্যায় পড়তে হয়।
এ পাড়ার পুজো-পার্বণও কম আকর্ষণীয় নয়। এর মধ্যে ১৭-র পল্লির দুর্গাপুজো, কালীপুজো আর হরি ঘোষ স্ট্রিটের দুর্গাপুজো উল্লেখযোগ্য। তবে চাঁদার উপদ্রব নেই। উৎসবের সময় মাইকের দাপটে অনেক সময় ভোগান্তি হয়। কাছাকাছির মধ্যে মাঠ বলতে দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটে সাধক রামপ্রসাদ উদ্যান। সংস্কারের পরে সেখানে সকাল সন্ধ্যা এলাকার মানুষ হাঁটতে যান।
এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই ভাল। যে কোনও সময় পর্যাপ্ত যানবাহন পাওয়া যায়। কাছেই রয়েছে হাতিবাগান বাজার। আজও বহু দূর দূরান্ত থেকে ক্রেতারা সেখানে আসেন। সময়ের সঙ্গে একটু একটু করে বদলেছে বাজারটিও। তবে টিকে আছে ক্রেতা বিক্রেতার আন্তরিক সম্পর্ক। বাজারে গেলে এখনও বহু দিনের পরিচিত ব্যাপারি একগাল হেসে খবর নেন। তখন মনে হয়, এ অঞ্চলের মানুষের মূল্যবোধ আর আন্তরিকতা আজও অটুট।
কাছাকাছির মধ্যে এক কালে থাকতেন আইনজীবী নরেন মিত্র, চিকিৎসক নারায়ণ মিত্র প্রমুখ বিশিষ্ট কয়েক জন ব্যক্তি।
আজও রাস্তায় বেরোলে যখন পরিচিত কিছু মুখ এগিয়ে এসে কুশল বিনিময় করেন তখন মনটা খুশিতে ভরে যায়। তখন মনে হয় ব্যস্ততার অজুহাতে এখনও কেউ কাউকে উপেক্ষা করেন না। বরং আন্তরিকতা আর টান আছে বলেই সকলের খবর নেওয়ার অভ্যাসটা এ পাড়ায় এখনও হারিয়ে যায়নি।
লেখক চিকিৎসক