— প্রতীকী চিত্র।
গরমকালে মৃত্যু হয় হিট স্ট্রোকে। বর্ষায় একই জায়গায় মরতে হয় জলে ডুবে। নির্বীজকরণের নামে তুলে আনা কুকুর আবার রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যায় অন্য অসুস্থ কুকুরদের সঙ্গে থেকে। বছরের পর বছর এমন চলতে থাকলেও এ রাজ্যে পথকুকুরদের নির্বীজকরণ ও প্রতিষেধক দানের পর্যাপ্ত পরিকাঠামো তৈরিই হয় না বলে অভিযোগ। উল্টে ধার্য হওয়া সরকারি টাকা নয়ছয় হয়, সরকারের নির্ধারিত বেসরকারি সংস্থা টাকা খরচের হিসাব দিতে পারে না। কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সাহায্যও কাজে লাগে না। অভিযোগ, টাকা ফিরে যায় খরচ না হয়েই! ওষুধ কেনা বা নির্বীজকরণের অস্ত্রোপচার বাবদ এমন টাকা ধার্য হয়, যার চেয়ে যে কোনও কাটা জায়গায় সেলাই করার খরচ বেশি।
পথকুকুরদের নির্বীজকরণ ও প্রতিষেধক দানের কাজ কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা জানতে চেয়ে সম্প্রতি একাধিক নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ আদৌ তৈরি কিনা, খোঁজ করতে গিয়ে সামনে আসছে প্রশাসনিক গাফিলতির দিকটাই। এই কাজে যুক্তদের বড় অংশের দাবি, ‘‘ক্ষমতাসীন দলের লোকের মর্জির উপরেই এত দিন কাজ হয়েছে।’’ অভিযোগ, কখনও শাসকদলের মাথার গাড়ির সামনে বেড়ালছানারা চলে আসায় কালীঘাটের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বেড়াল টেনে বার করানো হয়েছে। বন দফতরের গাড়িতে সেই সব বেড়াল তুলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এমন রাস্তায়, যেখানে গাড়ি চলে দ্রুত গতিতে। এমন কাজ আইনবিরুদ্ধ, এই বলে প্রতিবাদ করতে গেলে পুরকর্মীদেরই কালীঘাট থানার তৎকালীন অফিসার বলেছেন, ‘‘আমি যেটা বলছি, সেটাই আইন।’’ কখনও রাজ্যের মন্ত্রী ঘুমোতে পারছেন না বলে, মাঝরাতে কুকুর তুলিয়ে ‘ঠিকানা লাগিয়ে দেওয়ার’ নির্দেশ এসেছে। প্রভাবশালী নেতার বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য আবার লোম ওঠা কুকুরকে তুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘বিশ্রী’ দর্শন বলে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, নতুন সরকারের আমলে এই পরিস্থিতি বদলাবে কি?
কলকাতা পুরসভার ডগ পাউন্ডে দীর্ঘদিন কোঅর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করা রাজীব ঘোষ বললেন, ‘‘গোটা রাজ্যের মধ্যে সরকারি ডগ পাউন্ড শুধু রয়েছে কলকাতায়। ধাপা এবং এন্টালির ডগ পাউন্ডে ৩০০টি কুকুর রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আসল কাজের থেকে নেতার নির্দেশে তুলে আনা কুকুরই সেখানে বেশি।’’ রাজীবের দাবি, ‘‘পুরসভার ছ’টি পশু চিকিৎসক পোস্টের চারটিই ফাঁকা। যে দু’জন আছেন, তাঁরাও পুরসভার স্লটার হাউসের কাজে ব্যস্ত। ডগ পাউন্ডের কাজে কখনওই কাউকে পাওয়া যায় না। সুপ্রিম কোর্ট হিংস্র কুকুরের ক্ষেত্রে ‘ইউথ্যানাসিয়া’ বা যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু কোনও কুকুর উস্কানির জন্য হিংস্র হয়েছে কিনা, দেখবেন কে? সর্বোপরি, যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর জন্য তিন বা তার বেশি চিকিৎসকদের রিপোর্ট বাধ্যতামূলক। সেই সংখ্যক সরকারি পশু চিকিৎসক পুরসভায় কোথায়?’’
জানা যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের পুর বোর্ড তৈরির পরে পুরোটা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হয়। ১০ জন গাড়িচালক, ২০ জন ডগ-ক্যাচার, পাঁচ জন প্যারাভেট এবং তিন জন পশু সহায়তাকারী নিয়ে কাজ শুরু হয়। ‘সোসাইটি ফর স্ট্রে ক্যানাইন বার্থ কন্ট্রোল-কলকাতা’ (এসএসসিবিসি-কে) নামে একটি সংগঠনও তৈরি করা হয়। সরকারি তহবিল থেকে ১০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় পথকুকুরদের নির্বীজকরণের জন্য।
২০১৭ সালে রাজ্য সরকারের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন দফতর থেকে ৭৬ লক্ষ টাকা ধার্য হয়। এক বছরে ৭২০০টি কুকুরের নির্বীজকরণের শর্ত দেওয়া হয়। ২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনায় আরও ১৪ লক্ষ টাকা পাওয়া গেলেও কলকাতা পুরসভা মাত্র ৪০ হাজার কুকুরের প্রতিষেধক কিনতে পেরেছিল। পুরকর্মীদের দাবি, ১৪ লক্ষের মধ্যে চার লক্ষ টাকা খরচ করতে পেরেছিল পুরসভা। বাকি টাকা ব্যবহারই করা যায়নি। অথচ, ‘নেতার অনুপ্রেরণা’ লেখা বিজ্ঞাপনে ১৯ লক্ষ টাকারও বেশি খরচ হয়ে যায় বলে অভিযোগ করলেন এক পুরকর্মী।
কুকুরের নির্বীজকরণ ও প্রতিষেধক দানের বিষয়টি দেখাশোনার কথা পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের। ওই দফতরের নতুন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাননি। তবে দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘অতীতের খরচের হিসাবে নজররাখা হচ্ছে। মন্ত্রীকে সবই জানানো হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার পাশাপাশি, পরিকাঠামো ঢেলে সাজানো হবে।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে