ইদের বিকিকিনি

‘জলে’ গেল শেষ রবিবার

মাসখানেক আগে ক্লাসের ফাঁকে দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেছিল, ওড়নাটা দু’জনেই হালকা গোলাপি রঙের কিনবে। পরভিন শনিবারই কিনে ফেলেছে। কিন্তু বন্ধুর কপাল মন্দ।

Advertisement

তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০১৬ ০১:১৩
Share:

ভিড়হীন দোকানে আশ মিটিয়ে বাছাই। রবিবার, নিউ মার্কেটে। — সুদীপ্ত ভৌমিক

মাসখানেক আগে ক্লাসের ফাঁকে দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেছিল, ওড়নাটা দু’জনেই হালকা গোলাপি রঙের কিনবে। পরভিন শনিবারই কিনে ফেলেছে। কিন্তু বন্ধুর কপাল মন্দ। ইদের আগে শেষ রবিবারে কেনাকাটা করতে বেরিয়েও সে ওড়না অধরাই থেকে গেল পার্ক সার্কাসের ক্লাস নাইনের নার্গিস খাতুনের। সৌজন্যে দিনভরের ঝিরঝির, ঝমঝম।

Advertisement

বিকেলের দিকে বৃষ্টি সামান্য ধরেছিল। বাবার সঙ্গে বেরোনো হল ঠিকই। কিন্তু অমন ভয়ে সিঁটিয়ে, ঘোড়ায় জিন দিয়ে কি আর ইদের ‘শপিং’ হয়? মল্লিকবাজারের একটি দোকানে ঢুকে ভুরু কুঁচকে বাবা বললেন, ‘‘যা কেনার, তাড়াতাড়ি পছন্দ কর। দেখছিস না আকাশের অবস্থা? এখনই বাড়ি ফিরতে হবে।’’ এ দোকান-ও দোকান খুঁজে হালকা গোলাপি রঙের ওড়না কেনা মাথায় উঠল। চটজলদি মেরুন রঙের ওড়না বেছে নিয়ে ব্যাজার মুখে বাড়ির পথ ধরল নার্গিস। এ বছর ইদের দাওয়াতে দুই বন্ধুর ‘ম্যাচিং’ সাজগোজের ইচ্ছেটা পূরণ হওয়ার জো নেই।

রবিবাসরীয় চিত্রনাট্যে বৃষ্টিই যেন ভিলেনের ভূমিকায়। কত রাজকন্যে-রাজপুত্তুরদের খুশির উৎসবের রূপসজ্জার প্ল্যান সে বেমালুম ভেস্তে দিয়ে ছাড়ল! নাগেরবাজার থেকে নিউ মার্কেট, রাজাবাজার থেকে গড়িয়া— সর্বত্র ছবিটা একই। দোকান সেজেছে কনে বৌটির মতো। কিন্তু ‘বিয়েবাড়ি’তে লোক কই! আর বৃষ্টির ছিরিও বলিহারি। ঢেলেই চলেছে। বিরামহীন। ফলে, মুখ ভার ম্যাড়মেড়ে কলকাতার আকাশের সঙ্গে রং মিলিয়ে বাজারে-শপিংমলে দোকানদারদের মুখও থমথমে।

Advertisement

ছাউনি থাকায় বড় দোকানগুলি খোলা। একটানা বর্ষণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ফুটের উপরে ঘাঁটি গাড়া দোকানিরা। ইদের আগে তাঁদের ঘিরেই তো খদ্দের গিজগিজ করে! লাগাতার বৃষ্টিতে ধর্মতলায় ফুটপাথের জুতোর দোকান থেকে ব্যাগের স্টল— সবই প্লাস্টিকের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল।

রংবেরঙের সালোয়ার কামিজের পসরা সাজলেও ক্রেতার দেখা নেই। তবে বাজার সবচেয়ে খারাপ শাড়ির। নিউ মার্কেটের একটি দোকানের মালিক বলেন, ‘‘অন্যান্য বছর ইদের বাজারে জর্জেটের শাড়ির চাহিদা থাকে। কিন্তু এ বছর তেমন দেখছি না। তার উপরে যা বৃষ্টি! রবিবারের ছুটির দিনটাই চৌপাট হয়ে গেল!’’

Advertisement

গোমড়ামুখো লাচ্চা, সিমুইয়ের কারবারিরাও। লাচ্চা, সিমুই ছাড়া ইদের পার্বণে ফাঁক থেকে যাবে। রাজাবাজারের একটি দোকানের মালিক ব্যাজার মুখে বললেন, ‘‘ভেবেছিলাম, আজকের সন্ধের মধ্যে লাচ্চা-সিমুইয়ের সব স্টক শেষ হয়ে যাবে! কোথায় কী!’’ এ বছর ছবিটাই যে আলাদা। লাগাতার ধারাপাতে ক্রেতাদের দেখা মিলছে বিক্ষিপ্ত ভাবে, বহুক্ষণ বাদে বাদে।

তবু এই ভাটার টানেই নিজেদের মতো করে ছক কষে পসরা সাজিয়েছেন বিক্রেতারা। বলছেন, সময় পাল্টেছে। এখন খোলা লাচ্চার তুলনায় প্যাকিং করা লাচ্চার চাহিদা বেশি।

নিউ মার্কেটের রেডিমেড পোশাক-বিপণিতে সুপারহিট ‘বাজিরাও মস্তানি সালোয়ার’। ইদের বিশেষ আকর্ষণ। ছড়ানো ঘেরের আনারকলি কামিজ ও স্মার্ট ঝকমকে জ্যাকেটের কম্বিনেশন। সালোয়ার ‘পালাজো’-স্টাইলে ঢলঢলেও চলছে, আবার কদর রয়েছে ‘চুড়ি পা’-রও। তবু এ-সব আকর্ষণও মিইয়ে যাওয়া বাজারকে চাঙ্গা করতে পারল কই?

তবে ভিলেন শুধু বৃষ্টি নয়। বিক্রেতারা বলছেন, আরও কারণ আছে। তাঁরা দেখছেন, ইদানীং মফস্সলের ক্রেতারা কলকাতায় কমই আসেন। আগে মগরাহাট, বারুইপুর, অশোকনগর, হাবড়া থেকেও লোকে ঝেঁটিয়ে কলকাতায় কেনাকাটা করতে আসতেন। এখন তাঁদের দেখা মেলে কম। কলকাতার লাগোয়া শহর-গঞ্জেও অনেক জামা কাপড়ের দোকান, এমনকী বিভিন্ন শপিং মলও খুলে গিয়েছে। মানুষ সেখানেই মনপসন্দ পোশাক কিনতে পারেন। কলকাতায় আসার আর দরকার পড়ে না তেমন। বিক্রেতারা কেউ কেউ এ-ও বলছেন, এখন গোটা রমজান ধরেই টুকটাক কেনাকাটা করে ইদের জন্য তৈরি হন মানুষ। শেষ রবিবারের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন না। তবু এমন বৃষ্টি না-হলে যে দোকানপাটের চেহারা এমন সুনসান থাকত না, সে-কথা কম-বেশি মানছেন সকলেই।

সন্ধের একটু আগে ধর্মতলার মোড়ে ছাতা মাথায় কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মুচকি হাসলেন, ‘‘শেষ রবিবারের ভিড়ের কথা ভেবে যানজট সামাল দিতে আমরা কিন্তু তৈরিই ছিলাম। বৃষ্টিই দেখি আমাদের কাজটা হাল্কা করে দিল!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement