প্রতীকী ছবি।
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের সন্দেহের সূত্রপাত হয়েছিল কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ল্যাবরেটরির রিপোর্ট থেকে। এনআইভি (পুণে)-র কিটের বদলে আইসিএমআরের সরবরাহ করা নতুন করোনা পরীক্ষার কিট ব্যবহার করার পর থেকেই সেখানে পজ়িটিভের সংখ্যা এক ধাক্কায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গিয়েছিল।
তার পরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। গত সপ্তাহে নতুন কিট (ট্রুপিসিআর) ব্যবহারের পর থেকেই এই নন-কোভিড হাসপাতালে হু হু করে করোনা পজ়িটিভ রিপোর্ট বাড়তে শুরু করে। সেখানে গত রবিবার ৬৬ জনের, সোমবার ৩৪ জনের ও মঙ্গলবার ৪২ জনের রিপোর্ট পজ়িটিভ আসে।
সোমবারই নীলরতনের রোগী কল্যাণ সমিতির বৈঠকে নতুন কিটের রিপোর্টের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সেখানকার মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান চিত্রিতা চট্টোপাধ্যায়। সর্বসম্মতিতে চিকিৎসকদের অনুভব ও অনুমানের কথা জানানো হয় স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমকে। যে দুই হাসপাতালে নতুন কিট ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে আচমকা অত্যন্ত বেশি হারে কোভিড পজ়িটিভ রিপোর্ট আসাটা অবশ্যই যাচাই করা উচিত বলে সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য দফতর।
আরও পড়ুন: ৫০ হাজার পেরোল রাজ্যে করোনা আক্রান্ত, এক দিনে কলকাতায় সংক্রমিত প্রায় ৮০০
এর পরেই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের কর্তাদের সঙ্গে অনলাইনে ভিডিয়ো বৈঠক করে ওই কিট ফেরত নিয়ে অন্য কিট দিতে বলেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। শুক্রবারের মধ্যে ওই কিট তুলে নিয়ে এনআইভি (পুণে)-র পুরনো কিট-ই দিতে বলা হয়েছে। কল্যাণী এবং এন আর এস ছাড়া এসএসকেএম ও স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনেও ওই কিট এসেছে। সেগুলিও প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্যসচিব বলেন, ‘‘আইসিএমআরের সঙ্গে কথা হয়েছে। সমস্যা মেটানো হচ্ছে। ওরা জানিয়েছে, নতুন কিটে পরীক্ষার কিছু নতুন প্রক্রিয়া রয়েছে। সেগুলি আমাদের কর্মীদের শেখাতে বলা হয়েছে।’’ রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের কর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, এই নতুন কিট যথেষ্ট উচ্চমানের। এতে একই সঙ্গে আরএনএ পরীক্ষার জন্য ‘ই’ জিন এবং ‘আর’ জিনের অবস্থা দেখা যায়। তাতে কোভিড স্ক্রিনিং ও চিহ্নিতকরণ, দু’টোই হয়। কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়।
আরও পড়ুন: লকডাউন কড়া হাতে, সর্বত্রই সক্রিয় পুলিশ, রাজ্য জুড়ে যেন বন্ধের ছবি
স্বাস্থ্য মন্ত্রকই এখন বলছে, ওই নতুন কিট ব্যবহারের আগে বিশেষ প্রশিক্ষণ দরকার। রাজ্য প্রশ্ন তুলেছে, তা হলে সেই প্রশিক্ষণ না দিয়ে বা কর্মীদের না শিখিয়ে কিট হাসপাতালে সরবরাহ করা হল কেন? স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘আমাদের আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গে যে কিটগুলি সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলির গুণগত মান ঠিক নেই। কারণ, ওই একই কিট অন্য রাজ্যেও গিয়েছে। সেখান থেকে কিন্তু আমরা ভাল কথাই শুনছি।’’
অনেকে আবার এর মধ্যে অন্তর্ঘাতের গন্ধও পাচ্ছেন। নবান্ন সূত্রের খবর, সেখানে এমন আলোচনাও শুরু হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি করে দেখাতেই ইচ্ছা করে খারাপ কিট পাঠানো হচ্ছে। নীলরতনের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান, তৃণমূলের চিকিৎসক-নেতা শান্তনু সেনের বক্তব্যেও তেমনই ইঙ্গিত মিলেছে। তিনি বলেন, ‘‘ওই কিট পাল্টে অন্য কিট আনার প্রক্রিয়া স্বাস্থ্য দফতর শুরু করেছে। আইসিএমআর যাতে নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে পারে, সেটা কেন্দ্রীয় সরকারের দেখা উচিত।’’
এখন প্রশ্ন, কিট যদি সত্যিই অনুপযুক্ত হয়ে থাকে এবং তাতে রিপোর্ট যদি ঠিক না আসে, তা হলে ওই কিটে যাঁদের রিপোর্ট পজ়িটিভ এসেছে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের কি আবার পরীক্ষা করাতে হবে? এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যকর্তারা কিছু বলতে পারছেন না।
অন্য দিকে, নীলরতনে ১১০ শয্যার করোনা ওয়ার্ড চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চেস্ট, সাইকায়াট্রি, ডার্মাটোলজি ও অর্থোপেডিক বিভাগের অংশ নিয়ে সেটি চালু হবে।