আম্মা-দর্শন। শহরের এক রেস্তোরাঁয়। ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী।
‘‘উডম্ব ইঙ্গে কলকাতা-লা, মানস অঙ্গে চেন্নাই-লা।’’
যন্ত্রণায় ভাঙাচোরা মুখের রেখা অস্ফুটে বলে চলেছে শব্দগুলো।
চোখে-মুখে রাত জাগার ছাপ। মালতী রাজাগোপালন বললেন, ‘‘রাতভর ঘুমোতে পারিনি। আমার শরীরটা এখানে, মন কিন্তু পড়ে আছে চেন্নাইয়ে।’’
গোলপার্কের বৃদ্ধা ৭০ পার করেছেন কিছু দিন হল। চার দশক ধরে এ শহরের বাসিন্দা। স্বামীর কর্মসূত্রে এসে বাঁধা পড়েছেন। মালতী বলছিলেন, ‘‘এই ২০১৬ সালটা আমার কাছে বড় ধাক্কার। আট মাস আগে স্বামী চলে গেলেন। এর পরেই আম্মা।’’ টিভি-তে #রিপআম্মা দেখে চোখে জল আসছে তাঁর। ফোনে চেন্নাইয়ে বেয়াই-বেয়ানদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেও কেঁদেছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে হিন্দুস্থান পার্কের ক্যালকাটা সাউথ ইন্ডিয়া ক্লাবে একটা কাজ সারতে এসেছিলেন। বিকেলে মেরিনা সৈকতের অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠান শুরুর আগেই বাড়িমুখো হলেন। বললেন, ‘‘গলা দিয়ে কিছু নামছে না। শি ওয়াজ মাই রোলমডেল।’’ হরিদেবপুরের মঞ্জু মুখোপাধ্যায়ের শাশুড়ি সাবিত্রী নারায়ণনও খবরটা পাওয়া ইস্তক কিছু দাঁতে কাটেননি। রুপোলি পর্দার নায়িকা জয়ারও অন্ধ ভক্ত তিনি।
প্রিয় নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যুতে মাটিতে আছড়ে পড়ে ডুকরে কান্না, বুক চাপড়ে হাহাকারের দৃশ্য দেখছে চেন্নাই। সেই স্বভাবসিদ্ধ তামিল আবেগের খানিকটা যেন এ দিন কলকাতাও টের পেল।
এমনিতে এ শহরের বাসিন্দা কয়েক লক্ষ তামিলভাষীর একটা বড় অংশই বর্ণে ব্রাহ্মণ। নিজেদের রাজ্যে দ্রাবিড় রাজনীতির রমরমার দিনে তাঁরা দেশান্তরী হয়েছিলেন। এমজিআর-জয়ললিতা ও করুণানিধির দুটো দলই ততটা প্রিয় নয় তাঁদের। কিন্তু আম্মার ‘ম্যাজিক’ আলাদা। ব্রাহ্মণকন্যা হয়েও যিনি জাতি-শ্রেণি নির্বিশেষে সকলের ‘আইকন’। তামিলনাডুর ভাইফোঁটা তথা কার্তিগই দীপমের প্রাক্কালে কলকাতার সাউথ ইন্ডিয়া ক্লাবে প্রদীপ জ্বালানোর অনুষ্ঠানটাই তাই এক রকম ভেস্তে গেল।
শোকার্ত মহিলা কণ্ঠে বারবার ভেসে এল, জয়ললিতার বিখ্যাত পাঁচ টাকার হোটেল আম্মাউনাভাহাম বা মেয়েদের ঘরে ঘরে দোসার ব্যাটার তৈরির মিক্সি বিলির তারিফ। আম্মার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা স্বৈরাচারের অভিযোগও তাঁরা মানতে নারাজ। লেক মার্কেটের ইডলি-দোসা রেস্তোরাঁর কর্মী পি মোহনের কাছেও আম্মা মানে গোটা গ্রামের মা। কারও বিয়ে হলেই বাড়তি ১০ হাজার, শাড়ি, ছাত্রদের ল্যাপটপ যিনি অকাতরে বিলিয়ে চলেন।
তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, নবতিপর করুণানিধির হাঁটুর বয়সী জয়ললিতার মৃত্যুর অভাবনীয় অভিঘাতে বিহ্বল অনেকেই। বালিগঞ্জের রেস্তোরাঁ-কর্তা স্বামীনাথন রামানির কথায়, ‘‘যমরাজের এ কী খেয়াল! নেভার থট। এনেক্কেভে ইল্লে।’’
ত্যাগরাজা হল-এর সাংস্কৃতিক সংগঠন রসিকারঞ্জন সভার সম্পাদক পদ্মা রায় বর্ধন আইয়ারের সঙ্গে ফোনে কথা হল দেশপ্রিয় পার্কের ভারতী তামিল সঙ্ঘমের কর্তা ভেঙ্কটেশের। হাওড়া, কলকাতায় তামিলভাষীদের বিভিন্ন সংগঠন দলমত নির্বিশেষে রবিবার শোকসভার ডাক দিয়েছে।