RG Kar Hospital Controversy

দুই মৃত্যুতেই জড়িয়ে শৌচালয়! লাইন দিতে হয় ডাক্তারদেরও, ইমার্জেন্সি ভাঙচুরের পর থেকে চাপে আরজি করের ট্রমা কেয়ার

আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে ফের অব্যবস্থার কারণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। পরিবারের দাবি, অসুস্থ অবস্থায় হেঁটে হেঁটে দূরের শৌচালয়ে যেতে হয় প্রৌঢ়কে। তাতেই মৃত্যু ঘনিয়ে আসে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৪
Share:

আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে অব্যবস্থার অভিযোগ। —ফাইল চিত্র।

আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে ‘ট্রমা’ কাটতে চাইছে না। সোমবার সেখানে আরও এক রোগীর মৃত্যুতে উঠেছে অব্যবস্থার অভিযোগ। এ ক্ষেত্রেও রোগী সমস্যায় পড়েছেন শৌচালয়ে যেতে গিয়ে। কেন বার বার ট্রমা কেয়ারে আলোচনায় উঠে আসছে শৌচালয়? খোঁজ নিয়ে জানা গেল, হাসপাতালের এই ভবনে শৌচালয়ের সমস্যা দীর্ঘ দিনের। একতলায় পুরুষ, মহিলা, ডাক্তার, কর্মী— সকলের জন্য একটিই শৌচালয় রয়েছে। এমনকি, ডাক্তারদেরও সেই শৌচালয়ের সামনে লাইন দিতে হয়!

Advertisement

গত শুক্রবার ভোররাতে তিন বছরের সন্তানকে শৌচালয়ে নিয়ে যেতে ট্রমা কেয়ারের লিফ্‌টে উঠেছিলেন দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী। লিফ্‌ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দরজায় আটকে ঘষটে মৃত্যু হয় অরূপের। রবিবার রাতে এই ট্রমা কেয়ারেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন প্রৌঢ় বিশ্বজিৎ সামন্ত। অভিযোগ, হেঁটে হেঁটে দূরের শৌচালয়ে যেতে গিয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃতের পরিবারের দাবি, শৌচালয়ের কথা জানতে চাইলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে বাইরে কোথাও নিয়ে যেতে বলেছিলেন। হেঁটে হেঁটে দোতলায় উঠতে হয়েছিল বিশ্বজিৎকে। মেলেনি স্ট্রেচার বা বেডপ্যান। কেন এই অব্যবস্থা? চিকিৎসকদের একাংশ দায়ী করছেন ২০২৪ সালের রাতদখলের সেই রাতের ঘটনাকে। অভিযোগ, জরুরি বিভাগে সেই রাতে যে ভাবে ভাঙচুর করা হয়, তা এখনও মেরামত হয়নি। ফলে ট্রমা কেয়ার ভবনের উপর চাপ বেড়ে গিয়েছে।

ট্রমা কেয়ারের চিকিৎসক তাপস প্রামাণিক বলেন, ‘‘ট্রমা কেয়ারের নীচের তলায় ডাক্তার, নার্স, নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য একটাই শৌচালয় রয়েছে। নতুন করে শৌচালয় বানানোর জায়গাও নেই এখানে। পুরুষ, মহিলা সকলে এই শৌচালয় ব্যবহার করেন। জরুরি বিভাগ ভাঙার পর ট্রমা কেয়ারে চাপ বেড়েছে।’’ একাধিক বার কর্তৃপক্ষকে বলা সত্ত্বেও এখনও জরুরি বিভাগ মেরামতের জন্য কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে দাবি তাপসের। তিনি বলেন, ‘‘এটা তো শুধু আমাদের সমস্যা নয়, রোগীদেরও সমস্যা। ট্রমা কেয়ারে ইমার্জেন্সির মতো পরিষেবা, সুযোগসুবিধা নেই। রোগীর খুব গুরুতর অবস্থা হলে আমাদের কিছু করার থাকবে না।’’

Advertisement

কোনও রোগীর শৌচালয়ের প্রয়োজন হলে চিকিৎসক হিসাবে কী করার পরামর্শ দেওয়া হয় ট্রমা কেয়ারে? তাপসের কথায়, ‘‘এখানে শৌচালয় নেই। ডাক্তার হিসাবে আমরা বাইরে থেকে ‘ইউরিন পট’ এনে বা অন্য কোনও ভাবে ব্যবস্থা করে নিতে বলি। এর সমাধান আমাদের হাতেও নেই।’’ এই ভবনের উপরের তলাগুলিতে এবং হাসপাতালের অন্য ভবনগুলিতে পর্যাপ্ত শৌচালয় আছে বলেই জানিয়েছেন তাপস। সমস্যার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘এই বিল্ডিংকে ট্রমা কেয়ারের মতো পরিকল্পনা করে বানানো হয়েছে। এখানে বাড়তি শৌচালয় তৈরির জায়গা নেই। ইমার্জেন্সি ভাঙচুরের পর এখানে এত ভিড় হয় যে, আমাদেরও শৌচালয়ের জন্য লাইন দিতে হয়। ভিড়ে কোনও রোগীর জন্য পর্দার ব্যবস্থা করে দেওয়ার সুযোগও নেই।’’ হাসপাতালের আর এক চিকিৎসক জানিয়েছন, রোগীর প্রয়োজনে প্রস্রাবের জন্য নলের বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়। কিন্তু সকলের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। কাউকে ‘ইউরিন পট’ কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে অনেকেই তাতে অস্বস্তি বোধ করেন। এ সব ক্ষেত্রে কী করা উচিত, চিকিৎসকদের জন্য তার নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম ঠিক করা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

ট্রমা কেয়ারের এক তলায় একটি শৌচালয় বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আরজি করের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য তথা তৃণমূল বিধায়ক অতীন ঘোষ। তিনি জানান, ওই শৌচালয় থেকে জল চুঁইয়ে এর আগে বেসমেন্টে রাখা যন্ত্রের ক্ষতি হয়েছিল। তাই শৌচালয়টি বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু পূর্ত দফতরের আধিকারিকেরা এত দিনেও খুঁজে বার করতে পারেননি, জল ঠিক কোথা থেকে চুঁইয়ে পড়ছে। অতীন বলেন, ‘‘‌এটা চলতে পারে না। অস্থায়ী শৌচালয়ের ব্যবস্থাই বা কেন করা হয়নি? আমি কথা বলব।’’ সোমবারের মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘হার্টের রোগীদের সবসময়েই ঝুঁকি থাকে। সেটা ডাক্তারের ভাবা উচিত ছিল। জরুরি ভিত্তিতে কর্মীদের শৌচালয়ই ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত ছিল। রোগীর সঙ্গে নার্স বা কোনও কর্মীকে পাঠানো উচিত ছিল। এটা বিভাগের ত্রুটি। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’’ এত দিন পরেও কেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগ স্বাভাবিক হল না? অতীন বলেন, ‘‘স্বাস্থ্য ভবন থেকে অনুমোদন নিয়ে আসতে হবে জরুরি বিভাগে মেরামতির কাজ শুরু করার জন্য। আমি শীর্ষ পর্যায়ে বিষয়টি তুলব। অনুমতি নিয়ে আসব। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের সঙ্গে কথা বলব। চার হাজার রোগী সামলানোর মতো পরিষেবা ট্রমা কেয়ারে নেই। ফলে দ্রুত ইমার্জেন্সিটা চালু করতে হবে।’’

২০২৪ সালের অগস্টে আরজি করের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত এক চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল। তার প্রতিবাদে রাতদখলের ডাক দিয়েছিল নাগরিক সমাজ। ১৪ অগস্ট রাতের সেই আন্দোলনে আরজি করে বহিরাগতেরা ঢুকে হামলা চালায় বলে অভিযোগ। জরুরি বিভাগে ভাঙচুর চালানো হয়। তার পর থেকে ট্রমা কেয়ার ভবনেই জরুরি বিভাগের কাজ চলছে। অভিযোগ, এতে পরিকাঠামোগত সমস্যা বেড়েছে। কিছু দিন আগে আরজি করের সেই নির্যাতিতার মা বিজেপির টিকিটে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে লড়াইয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাতে রাজনৈতিক তরজা বেড়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement