Calcutta High Court on Husband Wife Relation

স্ত্রী অসুস্থ বলে ফেলে রেখেছেন হাসপাতালেই! স্বামীকে দায়িত্ব মনে করাল হাই কোর্ট, সাড়ে চার বছর পর বাড়ি ফিরলেন পুনম

পথদুর্ঘটনার পর থেকে স্ত্রীকে হাসপাতালেই ফেলে রেখেছিলেন স্বামী। বিলও মেটাননি। আদালতের নির্দেশে চার বছর পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন রোগী। পুলিশের নজরদারি থাকবে ওই বাড়ির উপর।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২১ মে ২০২৬ ২০:২৯
Share:

কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে হাসপাতাল থেকে সাড়ে চার বছর পর বাড়ি ফিরছেন পুনম গুপ্ত। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

হাসপাতালের বিছানায় সাড়ে চার বছর কাটিয়ে অবশেষে বাড়ি ফিরলেন পুনম গুপ্ত!

Advertisement

শয্যাশায়ী পুনমকে এত বছরেও বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাননি তাঁর স্বামী। মেটাননি হাসপাতালের বিলও। শেষ পর্যন্ত হাই কোর্টের নির্দেশে বৃহস্পতিবার আমহার্স্ট স্ট্রিটে নিজের বাড়িতে ফিরেছেন পুনম। আদালতের নির্দেশ, বাড়িতে তাঁর কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না, সে দিকে নজর রাখবে কলকাতা পুলিশ। সরকারি হাসপাতাল থেকে নার্স গিয়ে নিয়মিত দেখভাল করবেন পুনমের। আদালত তার রায়ে বলেছে, অসুস্থ স্ত্রীর প্রতি নৈতিক, মানবিক এবং আইনগত দায়িত্ব কোনও স্বামী এড়িয়ে যেতে পারেন না।

২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আমহার্স্ট স্ট্রিটেই দুর্ঘটনায় পড়েন পুনম। তাঁর স্বামী জয়প্রকাশ গুপ্ত স্কুটি চালাচ্ছিলেন, পিছনে বসেছিলেন পুনম। স্কুটি থেকে পড়ে গিয়ে তিনি মাথায় আঘাত পান। পুনমকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

Advertisement

তার পর থেকে সেই হাসপাতালই ছিল পুনমের ঠিকানা। কথা বলতে বা চলাফেরা করতে পারেন না বটে, কিন্তু আদালত নিযুক্ত চিকিৎসক কমিটির রিপোর্ট বলছে, ইশারায় সাড়া দেন পুনম। নিজে খাওয়াদাওয়াও করেন। ফলে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাঁর চিকিৎসা করানো সম্ভব।

বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও দীর্ঘদিন ধরেই পুনমের স্বামী জয়প্রকাশকে বার বার অনুরোধ করেছেন স্ত্রীকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। অভিযোগ, সে কথা কানেই তোলেননি পেশায় ছাঁট লোহার কারবারি জয়প্রকাশ। উল্টে হাসপাতালের বিল মেটানো বন্ধ করে দিয়েছেন। আদালতে হাসপাতালের দেওয়া হিসেব বলছে, রোগীর পরিবারের কাছ থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৫ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছে। আর বিমা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছে ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। যদিও ২০২৪-এর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যা হিসেব, তাতে পুনমের চিকিৎসা বাবদ খরচের বিলের পরিমাণ ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা।

২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জয়প্রকাশের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। থানায় সুরাহা না মেলায় ২০২৪ সালের ১০ মে ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিক্যাল এসটাব্লিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশনে (ডব্লিউবিসিইআরসি) অভিযোগ জানান তাঁরা। কমিশন রোগীর পরিবারকে নোটিস পাঠিয়ে ২৪ মে হাজিরা দিতে বলে। অভিযোগ, কেউ হাজিরা দেননি। এর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আদালতে মামলা করতে বলে কমিশন।

হাই কোর্টে দায়ের হওয়া মামলায় জয়প্রকাশের তরফে এই বলে সওয়াল করা হয় যে, পুনম ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ রয়েছেন। অর্থাৎ, কোমায় না-গেলেও তিনি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে অক্ষম। জয়প্রকাশের পক্ষে তাই অসুস্থ স্ত্রীর দেখাশোনা করা সম্ভব নয়। কোনও সরকারি হাসপাতাল বা হোমে রেখে পুনমের চিকিৎসার করা হোক।

রোগীর প্রকৃত অবস্থা জানতে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের বেঞ্চ। সেই কমিটি তার রিপোর্টে বলেছে, বাড়িতে রেখেই পুনমের চিকিৎসা করানো সম্ভব। এর পর জয়প্রকাশের দাবি খারিজ করে চলতি মাসের ৮ তারিখ সিঙ্গল বেঞ্চ বলে, এক সপ্তাহের মধ্যে পুনমকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তার পর প্রয়োজন হলে তাঁকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো যেতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালের বিলও অবশ্য মকুব করে দেন বিচারপতি।

এই রায়ের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানান জয়প্রকাশ। বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ সেই মামলা শোনে। আদালতে জয়প্রকাশের আইনজীবী নবকুমার দাসের সওয়াল ছিল, বেসরকারি হাসপাতালে রোগীকে ফেলে রাখা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না-করে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। আদালত তা করতে পারে না। অসুস্থ বা প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্প থাকা উচিত। সরকার ওই রোগীকে কোনও হোমে পাঠিয়ে তাঁর চিকিৎসার বন্দোবস্ত করুক। এই মামলায় রোগীর পরিবারের তরফে সওয়াল করেছেন আইনজীবী সুমঙ্গল শীলও।

জয়প্রকাশের এই অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করে হাই কোর্ট। ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এ ক্ষেত্রে আইনত বৈধ স্ত্রীর দায়িত্ব এড়াতে চাইছেন স্বামী। শারীরিক ভাবে অক্ষম স্ত্রীকে পরিত্যাগ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্বামী এ ভাবে স্ত্রীর দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তা ছাড়া, ওই মহিলার ১৭ বছরের একটি সন্তান রয়েছে। মাকে অন্যত্র পাঠালে সেই সন্তান মায়ের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবে।

আদালত আরও জানায়, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও মানসিক অসুস্থদের জন্য সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমূলক আইন রয়েছে। কিন্তু তাই বলে সকল অসুস্থকে হোমে পাঠানো যায় না। তা হলে এই রায়কে দৃষ্টান্ত করে ভবিষ্যতে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন সকলেই অসুস্থ আত্মীয়কে পরিত্যাগ করতে পারেন। তাতে সরকারের উপর চাপ বাড়বে। পাশাপাশি, এই ধরনের সমস্যার জন্য সরকারের নির্দিষ্ট নীতি থাকা দরকার বলেও আদালত মনে করেছে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে বোঝা মনে করে পরিবার। খরচের ভয়ে রোগীকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাওয়া হয় না। এর সমাধানে সরকারের নীতি প্রয়োজন।

গত মঙ্গলবার ডিভিশন বেঞ্চের দেওয়া চূড়ান্ত রায়ে বলা হয়েছে, হাসপাতাল থেকে পুনমকে আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন ফুলবাগান থানার ওসি। সেই সময় রোগীর সঙ্গে চিকিৎসক এবং নার্স থাকবেন। বাড়িতে ঢুকতে পুনম যাতে কোনও বাধা না পান, তা নিশ্চিত করতে হবে পুলিশকে। তার পরে রোগীর উপরে নজর রাখতে হবে। দেখতে হবে তিনি নিরাপদে রয়েছেন কি না। আদালত আরও জানিয়েছে, পুনমের চিকিৎসার জন্য সপ্তাহে দু’বার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে নার্স পাঠাতে হবে। যদি শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়, তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হবে। পাশাপাশি, পুনমের কোনও আইনি সহযোগিতা প্রয়োজন কি না, জেলা লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটিকে নিয়মিত বাড়িতে গিয়ে সে বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে।

ডিভিশন বেঞ্চের রায়কে অবশ্য স্বাগতই জানিয়েছেন পুনমের স্বামী। তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য, জয়প্রকাশ স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চান না, এমন নয়। তিনি কেবল দাবি করেছিলেন, বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। আদালতেও তা জানানো হয়েছিল। ডিভিশন বেঞ্চ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা এবং সপ্তাহে দু’বার নার্সকে বাড়িতে পাঠানোর কথা বলায় এই রায়ে পরিবার কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। রায় মানতে তাঁদের কোনও সমস্যা নেই।

সেই রায় মেনেই বৃহস্পতিবার বিকেলে আমহার্স্ট স্ট্রিটে নিজের বাড়িতে ফিরেছেন পুনম। মুক্তি পেয়েছেন দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের মানসিক যন্ত্রণা থেকে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement