জোড়াসাঁকো

ফুটপাথে ভাতের হোটেল, রাস্তা জুড়ে পার্কিং

ছোটবেলায় ওই লাল বাড়িটাকে ঘিরে আমাদের কৌতূহলের শেষ ছিল না। লোহার গেটের বাইরে থেকে কয়েক বার দেখেছি দীর্ঘদেহী সেই মানুষটি বয়সের ভারে কিছুটা ঝুঁকে পড়লেও বাগানে পায়চারি করছেন। তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য গেটের বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি মারতেন পথ চলতি উৎসুক মানুষ। সরাসরি কখনও সাক্ষাৎ হয়নি— তবু তাঁকে নিয়ে আজও গর্ব করে বলি আমি রবিঠাকুরের পাড়ার লোক।

Advertisement

অরুণকৃষ্ণ দাঁ

শেষ আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:৫৩
Share:

ছোটবেলায় ওই লাল বাড়িটাকে ঘিরে আমাদের কৌতূহলের শেষ ছিল না। লোহার গেটের বাইরে থেকে কয়েক বার দেখেছি দীর্ঘদেহী সেই মানুষটি বয়সের ভারে কিছুটা ঝুঁকে পড়লেও বাগানে পায়চারি করছেন। তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য গেটের বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি মারতেন পথ চলতি উৎসুক মানুষ। সরাসরি কখনও সাক্ষাৎ হয়নি— তবু তাঁকে নিয়ে আজও গর্ব করে বলি আমি রবিঠাকুরের পাড়ার লোক।

Advertisement

এই জোড়াসাঁকোর নরসিংহচন্দ্র দাঁয়ের পরিবারে আমার জন্ম। আমাদের বাড়িটা বিবেকানন্দ রোডের উপরে। বাড়ির গা ঘেঁষে গিয়েছে শিবকৃষ্ণ দাঁ লেন। রাস্তার ও-পারে বলরাম দে স্ট্রিট। বর্তমানে তেজেন্দ্র উদ্যানের সামনে, যেখানে বারাণসী ঘোষ স্ট্রিট মিশেছে রাজপথে, সেখান থেকে, বিবেকানন্দ রোড ধরে সোজা রবীন্দ্র সরণি ছুঁয়ে বাঁ দিকে রবিঠাকুরের বাড়ি পেরিয়ে মদন চ্যাটার্জি লেনের সংযোগস্থলে গিয়ে শেষ হয়েছে আমার পাড়ার অলিখিত চৌহদ্দি।

যানজট কমাতে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে এলাকায় তৈরি হচ্ছে বিশাল উড়ালপুল। তাই ঢেকেছে বাড়ির সামনের খোলা আকাশ। আগের মতো বাড়ির বারান্দা কিংবা জানলা দিয়ে আর রাজপথ দেখা যায় না। মনে হয় যেন বহু যুগের অন্ধকার থেকে উঠে আসা প্রাগৈতিহাসিক এক সরীসৃপ ক্রমেই মাথা তুলে ঢেকে ফেলছে পাড়াটাকে।

Advertisement

তবু বলব এলাকার উন্নতি হয়েছে। আগে যেখানে ছিল জঞ্জালের স্তূপ সেখানে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্যান। ঘিঞ্জি এলাকায় তেজেন্দ্র উদ্যানটি যেন এক টুকরো সবুজের সমাহার। ফলে ছোটদের খেলাধুলোর একটা নতুন জায়গা হয়েছে। সকাল সন্ধ্যা প্রবীণরাও গিয়ে দু’দণ্ড বসেন সেখানে। আগে এলাকায় উদ্যান বলতে ছিল কিছুটা দূরে গিরিশ পার্ক।

গত কয়েক বছরে কাউন্সিলর স্মিতা বক্সীর প্রচেষ্টায় এলাকার উন্নতি হয়েছে। তাঁর সঙ্গে পাড়ার মানুষের সম্পর্ক আন্তরিক। সুখে দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেন। পাড়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভাল। এখন ল্যাম্পপোস্টে শোভা পাচ্ছে জোরালো আলো। জলেরও কোনও সমস্যা নেই। দু’বেলা নিয়ম করে রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছে। আগের মতো জঞ্জাল জমে থাকে না। রাস্তায় ছড়ানো হচ্ছে ব্লিচিং পাউডার, মশা মারার তেল। এলাকার মূল বাজার বলতে একটু দূরে নতুন বাজার। তা ছাড়া কাছেই সিংহীবাজারে টুকটাক সবই পাওয়া যায়।

Advertisement

তবে কিছু সমস্যাও আছে। ফুটপাথের কিছু জায়গায় গজিয়ে উঠেছে ভাতের হোটেল, ফাস্টফুডের দোকান। এতে হাঁটাচলায় যেমন অসুবিধা হয় তেমনই ফুটপাথও নোংরা হয়। এ ছাড়াও যত্রতত্র গাড়ির পার্কিং-এর জন্য মাঝে মধ্যেই বাড়ির সামনে নিজের গাড়িটাই রাখা সম্ভব হয় না।

রবীন্দ্র সরণি পেরিয়ে এই বিবেকানন্দ রোড-এর নাম কালীকৃষ্ণ ঠাকুর স্ট্রিট। জোড়াসাঁকোর মোড় মানে আজ গণেশ টকিজের মোড়। এখানকার ল্যান্ডমার্ক হল মহাত্মা অ্যান্ড কোম্পানি— বহু পুরনো একটি ওষুধের দোকান।

ঠাকুর পরিবার ছাড়াও আমাদের পাড়ায় বিখ্যাত কিছু পরিবারের বাস ছিল। যেমন সিংহীবাগানে কালীপ্রসন্ন সিংহের বাড়ি, শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের বাড়ি, লালাবাবুর বাড়ি, রায়বাড়ি। ও দিকে জোড়াসাঁকোর রাজবাড়ি, ঘড়িওয়ালা মল্লিকবাড়ি, হরেন শীলের বাড়ি ইত্যাদি।

এক দিন, জোড়াসাঁকোর এক বাঙালি স্বপ্ন দেখেছিলেন ভারতে রেলপথ স্থাপনের, ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব হুগলির তীরে নিয়ে আসার। সেই প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর বাঙালির কাছে আজ শুধুই স্মৃতি।

দিন দিনে কমেছে এ অঞ্চলে বাঙালির সংখ্যা। বেড়ে চলা বাণিজ্যিক প্রভাবে ঘরোয়া সেই পরিবেশটা হারিয়ে যাচ্ছে। তবু এই অঞ্চলে বাঙালি-অবাঙালির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে।

এই জোড়াসাঁকোর মোড়ে রাজবাড়ির ঠিক উল্টো দিকে সকাল-বিকেল চলে দুধের বেচাকেনা। টেম্পো কিংবা ভ্যানে সারি সারি ক্যান ভর্তি দুধ আসে। বেচাকেনার বহর দেখে সেখানে আচমকাই দাঁড়িয়ে পড়েন পথচলতি মানুষ। তার ঠিক উল্টো দিকে রাজবাড়ির নীচে সারি সারি বহু পুরনো ছুরি, কাঁচি, দা-র দোকান। একে বলে বিশ্বকর্মা ভান্ডার।

তেমনই রবীন্দ্র সরণি ধরে একটু হাঁটলেই রাস্তার দু’ধারে সারি সারি পাথরের মূর্তির দোকান। দেব-দেবীরা ছড়িয়ে আছেন পথের দু’ধারে। এখানেই আদি ব্রাহ্ম সমাজের বহু স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়িটি, যেটি আজ পাথরের গুদাম। দেওয়ালে ঝুলছে বিবর্ণ মলিন কাঠের সাইনবোর্ডটা। তারই সামনে কালের গতি স্মরণ করিয়ে ঠংঠং শব্দে নড়তে নড়তে এগিয়ে চলে যাত্রিবাহী ট্রাম।

আমাদের ছেলেবেলায় পাড়ায় কোনও খেলার মাঠ ছিল না। তবু খেলাধুলোয় আমাদের আগ্রহের খামতি ছিল না। এর জন্য একটু দূরে কোম্পানি বাগানে গিয়েই বন্ধুরা মিলে ক্রিকেট, ফুটবল খেলতাম। সেই সময়, শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের বাড়ির উঠোনে ক্যারম খেলা হত। এখন ছোটদের খেলাধুলোয় সেই আগ্রহটা কিছুটা হলেও কমেছে।

ছেলেবেলায় দেখতাম রোজ সকালে নিয়ম করে ভিস্তিওয়ালা রাস্তা পরিষ্কার করত। বাড়ির সামনে রাস্তার উল্টো দিকে বলরাম দে স্ট্রিটের মুখে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত ঘোড়ার গাড়ি। তার পর এক দিন বিজলিবাতির আলোয় চারি দিক আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। গাড়ির কর্কশ আর্তনাদে হারিয়ে গেল ফেরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার নানা আওয়াজ।

উত্তরের অন্যান্য পাড়ার মতো রকের আড্ডার সংস্কৃতি এ অঞ্চলে খুব একটা ছিল না। এর কারণ এলাকার মিশ্র সংস্কৃতি। তবে বিভিন্ন বাড়িগুলিতে বসত ঘরোয়া আড্ডা। আজও উৎসবে অনুষ্ঠানে কিংবা পুজোর দিনগুলিতে বাড়িতেই আড্ডা বসে। তেমনই এ পাড়ার বিভিন্ন বাড়িতে বসত সঙ্গীতের আসর। ঠাকুরবাড়ি ছাড়াও লালাবাবুর বাড়িতে বসত ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর— আসতেন দেশের তাবড় সব শিল্পী।

বন্দুকের পারিবারিক ব্যবসা বলেই আমাদের বাড়িটাকে এলাকার মানুষ বন্দুকওয়ালা বাড়ি বলেই চেনেন। নরসিংহচন্দ্র দাঁ প্রথমে ব্রিটিশদের সঙ্গে বারুদ কেনা বেচার ব্যবসা শুরু করেন, পরে বন্দুকের ব্যবসা করেন। অন্যান্য পাড়ার মতোই এ পাড়ার বাড়ির পুজো দেখতে আজও বহু মানুষ ভিড় করেন। আমাদের বাড়ি ছাড়াও শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের বাড়িতেও পুজো হয়।

আজও পুরনো দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে দ্বারকানাথ ঠাকুর আর শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের মধ্যে রেষারেষির কাহিনি। শিবকৃষ্ণ জার্মানি থেকে রাংতা, তবক আর ফরমায়েসি গয়না আনাতেন প্রতিমা সাজাতে। সেগুলি বিসর্জনের আগে অবশ্য খুলে রাখা হত। দ্বারকানাথ প্রতিবেশী শিবকৃষ্ণকে টেক্কা দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে আরও দামি গয়না এনে প্রতিমা সাজিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, নিজের আভিজাত্য বজায় রাখতে দ্বারকানাথের নির্দেশে সেই সব বহুমূল্য গয়না-সহ প্রতিমার বিসর্জন হয়েছিল!

অতীতের এই সব কাহিনি আজও কত মানুষকে টেনে আনে এই পাড়ায়। আসলে অতীত আর বর্তমানের মাঝে আমাদের পাড়াটা যেন চলমান ঐতিহ্য।

লেখক দাঁ পরিবারের সদস্য

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement