মা-র একটা শাড়ি ছিল না?

বস্তাটা ভারী নয় বলেই বাবা নিতে বলল। ওর মধ্যে সেভেনের ইতিহাস বই। হাফ দামেরও কমে পেয়েছি বইগুলো। কলকাতার বুকলিস্টে যদি মেলে! মলাটে তাজমহলের ছবি। তাজমহল আগ্রায় অবস্থিত। আগ্রা দিল্লিতে না?

Advertisement

অধীর বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০১৫ ১৭:০১
Share:

বস্তাটা ভারী নয় বলেই বাবা নিতে বলল। ওর মধ্যে সেভেনের ইতিহাস বই। হাফ দামেরও কমে পেয়েছি বইগুলো। কলকাতার বুকলিস্টে যদি মেলে! মলাটে তাজমহলের ছবি। তাজমহল আগ্রায় অবস্থিত। আগ্রা দিল্লিতে না? অন্য যেগুলো কিনেছিলাম, তার একটাও চলবে না। মন বলল, ইতিহাসটা মিলতে পারে।

Advertisement

বাবা আর কী ভরল যেন! বালিশের খোল, লক্ষ্মী ঠাকুরের ছবি। জপের মালা, তিলক, কোশাকুশি, পুজোয় বাজানো ঝাঁজ। মায়ের ছবি। আর—। বস্তার মুখ বাঁধা না থাকলে দেখে নিতাম।

একটা জিনিস আনব-না-আনব-না করেও নিয়ে যাচ্ছি। তিন্নাথ পালের ফেলে দেওয়া ছাঁচখানা। দুগ্গা ঠাকুরের চালচিত্র বানাতে কলকা লাগে। হাতের চাপে কলকা-ছাঁচ ভেঙে যায়। ফেলে দিয়েছিলেন মণ্ডপের বাইরে। কুড়িয়ে রেখেছিলাম। ওটাই নিয়েছি। যদি কোনও দিন কাজে লাগে। হোক না ভাঙা, বেশি তো ভাঙেনি!

Advertisement

দালাল বর্ডারের পাশে একটা বাড়িতে এনে রেখে দিয়েছিল আমাদের। ভোরবেলা বের করে এখন নৌকো করে যাচ্ছি। নদী কপোতাক্ষ। নদীটা কার ভাগে পড়েছে? পাকিস্তান, না ইন্ডিয়া? গাছগাছালির ডাল সরিয়ে লগি পড়ছিল এমন ভাবে, যেন শব্দ না-ওঠে। মাঝিভাই সে ভাবেই নিয়ে যাচ্ছিল টাবুরে-নৌকো। উই যে দূরের বাঁকে উঁচুতে টঙের মতো কী ওটা? এক জন দাঁড়ানোর মতো ছোট্ট ঘর!

নৌকোয় আট-দশ জন। ছোট মানুষ দু’জন। আমি আর একটা মেয়ে। ঝিকড়গাছায় যখন ইপিআর চেক করছিল, তখনই দেখেছি ওকে। নাক-ফোঁড়ানো সুতোর সঙ্গে চুনের দাগ। —এখন মায়ের হাতে জাপটানো। ও কি ঘুমিয়ে পড়ল?

Advertisement

মা থাকলে এমন ভাবেই হেলান দিয়ে যাওয়া যায়। ঘোড়ারগাড়ি ছাড়া বাবার সঙ্গে কোথাও যাইনি। যাওয়া মানে রামদেবগাঁতি, মামারবাড়ি। গাড়িতে বসেও কোনও দিন এমন জাপটে ধরেনি বাবা।

ছইয়ের দু-দিকই আলগা। মাঝিভাই লম্বা লগি নিয়ে একবার উঠছে, নিচু হচ্ছে। দু’দিকেই ঝাপসা আমগাছ, ঝাউজঙ্গল, নদীর বাঁক। বয়রা কত দূর? ঘাট থেকে উঠলেই না কি বয়রা-বাজার। বাজারের পাশেই পর পর বাস দাঁড়ানো। ইন্ডিয়ার বাস।

ট্রাঙ্কের জামাকাপড় ভাদ্র মাসের রোদ পেয়েছে। তার মধ্যে মায়ের হাতে তৈরি কাঁথাটাও কুচড়িমুচড়ি হয়ে শুকোচ্ছিল। দেখলাম ছেলেদের দু’ তিন রকমের পোশাক। হনুমানটুপি। ন্যাকারপুকার। কাপড়ের প্যাঁক প্যাঁক-জুতো। সে দিন রোদ-উঠোনে আরও কিছু খুঁজতে থাকি। কী খুঁজছিলাম, বলতে পারব না। কিছু একটা। হঠাৎ বলি, শুনছ, আমার মা-র একটা শাড়ি ছিল না?

ওটা কি পেয়েছি আমি? পেলাম তো ভাগের-ভাগ শাশুড়ির ছেঁড়া কাঁথা। পরের বছর ওটাকে রোদে দিতে পারব কি না, জানি না। এমনিতেই ছিঁড়েভুড়ে গেছে, তখন হয়তো কিছুই থাকবে না!

উলটে দেওয়ার নামে কাঁথাটা ছুঁয়ে এলাম। খালি পায়ের মা। পুজোর দিনে ফাটাফুটো পা-দুটো আলতা পেয়েও রঙিন লাগত না। শলার কাঠিতে তুলো জড়িয়ে বলতাম, আমিই পরিয়ে দিচ্ছি, দাও।

‘না, না’ করত, কিন্তু আমি শুনব কেন? হার মেনে মা দেখত আলতা-পরানো ছেলের হাতের নড়াচড়া।— এ সব ভাবতে ভাবতেই রোদ থেকে সরে আসি।

এখন আশ্বিনের রোদেও ঝাঁঝাঁ তেজ। বারোয়ারিতলায় তিন্নাথ পালদের দেখি কই? কলকাতার রাস্তায় বড় বড় হোর্ডিং। থিম-পুজো। কোন ঠাকুর কত লম্বা, লোহালক্কড়, বোতল-প্রতিমা, ‘মাকি তোর একার?’

আমার ছেলেরাও থিম পুজোয় কাজ করছে। মহেশতলা, উল্টোডাঙা। রাত জাগা, ব্যস্ত খুব। মূল শিল্পী দেবাশিসের সঙ্গে ছেলেদের মতো আরও কয়েক জন। অন্য রকম ঠাকুর। এদেরই নাকি কদর।

পুজোর কাজ করে যে টাকা পাবে, তা দিয়ে কী করবে, টুকটাক কানে আসে। ওদের মা-র সঙ্গেই শলাপরামর্শ। আমাকে বলে না। শুনতেও চাই না। ব্যান্ড পনিটেল পিৎজা। এত ব্যস্ততার মধ্যেও এক এক দিন বলে ফেলে, দাড়ি কাটছ না কেন? কী পাগলের মতো লাগছে!

পুজোর দিন যত আসছে, কেন যেন নিতে পারছি না। সত্যিই যেন পাগল-পাগল লাগছে। চলে যেতে ইচ্ছে করছে কোথাও। কাজকর্ম, অনেক কথা ভুলেও যাচ্ছি।

এ বারই পেলাম শেষ বোনাস। পুরোটাই তুলে দিয়েছি। বউ বলল, বললে না, কাকে কী দিতে হবে, পুজোর তো দেরি নেই!

আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছ? কাকে কী দেবে, তুমিই দাও।

রেগে যাচ্ছে কেন?

আমার কোনও মত নেই। যাকে যা মনে হয়, দিয়ে দাও। ও সব আর টানে না।

মানে? মানে, কিছুই না।

অমন করে বলছে কেন?

এ নিয়ে বিরক্ত করবে না। পুজো কর্তব্য দেওয়া-থোয়া একদম ভাল লাগে না।

বউ খুবই অবাক। তাকিয়ে দেখছে শুধু। না, কিছুই বলল না।

আমার পাসপোর্ট নেই। জন্মমাটি ‘মাগুরা’ লিখেছি বলে পাসপোর্ট পাইনি। প্রায় পঞ্চাশ বছর ইন্ডিয়ায় থাকা হয়ে গেল। বুড়োকালে বাড়ির জন্য সত্যিই মন কাঁদছে। ছোড়দা যেমন এ দেশে আসার আগে সাতদোয়ার শ্মশানে মাকে বলতে গেছিল, মা, আমরা চলে যাচ্ছি! তেমন আমারও—।

কুষ্টিয়ার আবুলদা কলকাতায় এসেছিল। বাংলাদেশে যাওয়ার কথা প্রায়ই বলে। সে দিন পাসপোর্ট না পাওয়ার গল্প বললাম। সব শুনে বললেন, দাদা এক জন লোক দিয়ে নিয়ে যাব। আপনার চুলদাড়ি, এমন গরিব দেখে কেউ ধরতেও পারবে না! নিয়ে যাবে আবার সে-ই পৌঁছে দিয়ে যাবে। কিচ্ছু ভাববেন না!

আবুলদা, লোকটাকে পাঠাতে পারেন?— পুজোর আগেই?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement