পুজো বলতে মণ্ডপে মণ্ডপে থিমের ঠাকুর দেখা আর ম্যাডক্সের জমজমাট আড্ডা। এটি বাঙালির প্রথম পছন্দ হলেও নতুন প্রজন্মের বেশি ভোট আড্ডার দিকেই। আর আড্ডা শুধু পাড়ার মণ্ডপ বা ম্যাডক্সে আটকে নেই। জেন-ওয়াইয়ের কাছে বিকল্প প্রচুর। তাই থিমের রমরমা বাড়লেও তাদের পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে উপরে মাল্টিপ্লেক্স ও বিভিন্ন কফিশপই। তার জন্য জব-প্রোফাইল বা বাঙালির আলসেমিকে দায়ী করা যেতেই পারে, তবে মাল্টিপ্লেক্সের আরামেই এখন পুজোয় পাওয়া এক টুকরো অবসর উপভোগ করতে চান নতুন প্রজন্ম।
আর তা হবে না-ই বা কেন? মাল্টিপ্লেক্স-সংস্কৃতি তো এখন ‘ব্র্যান্ড সচেতন’ বাঙালির রন্ধ্রে-রন্ধ্রে। তবে কি না সারা বছরের সঙ্গী মাল্টিপ্লেক্স পুজোর দিনেও? তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত অর্চন সেনগুপ্ত বললেন, “মণ্ডপের ধাক্কাধাক্কি, ভিড় থেকে মাল্টিপ্লেক্সে আড্ডা বেশি প্রিয়।’’ এই যুক্তি ভিড় না-পসন্দ প্রায় সব বাঙালিরই। মাল্টিপ্লেক্সে কি ভিড় হয় না? হয়। আসলে বাসে–ট্রামে বাদুড়ঝোলা হওয়া রোজনামচা থেকে একটু ছুটির খোঁজে শরীর-মন জুড়োনো আড্ডাতেই গা-ভাসাতে আগ্রহী এই প্রজন্ম।
আর আড্ডা জমাবার জন্য যা যা প্রয়োজন, তাতেও কোনও ত্রুটি রাখেন না মাল্টিপ্লেক্স কর্তারা। ডাকের সাজ থেকে কাশফুল, ঢাকের বাদ্যি থেকে ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতা— সবই হাজির। থাকে নানা নাচ-গানের অনুষ্ঠান, গেম শো। আর পুজো মানেই তো ভুরিভোজ। রোজের ডায়েট বা বাধা-নিষেধ এই চার দিন এক্কেবারে মাফ। গতে বাঁধা রেস্তোরাঁগুলির পাশাপাশি এই চার দিন বিভিন্ন রকম খাবার পসরা নিয়ে স্টল বসে মাল্টিপ্লেক্স চত্বরে। উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারতীয় তো বটেই, মিলবে বাঙালি খানাও। আর মাল্টিপ্লেক্সে জায়গা না পেলে, পাড়ায় বাহারি কফিশপ আর পিৎজার ঠেক তো আছেই।
আর পুজোয় ক’টা দিনই তো মাত্র ছুটি। তার মধ্যে আর ক’জনের বাড়ি গিয়েই বা দেখা করা সম্ভব! অথচ আত্মীয়-বন্ধুদের নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করাও যথেষ্ট কঠিন। নতুন প্রজন্মের কাছে এর সমাধানও কিন্তু সেই মাল্টিপ্লেক্সেই। কাছাকাছি কোথাও দেখা করে নিলে সময়ও বাঁচে, বন্ধুত্বের দাবিও রক্ষা হয়।
তবে দুধের স্বাদ যাঁরা ঘোলে মেটাতে চান না, পথ চলাতেই যাদের আনন্দ, সব ভিড়কে উপেক্ষা করে তাঁরা ঠাকুর দেখাই পছন্দ করবেন। কারও আবার একসঙ্গে চাই দুই-ই। এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মী শময়িতা শীল বললেন, ‘‘ঠাকুর দেখার চেয়ে আড্ডাই পছন্দের। তবে তা কোনও রাজবাড়িতে, যেখানে মিলবে পুজোর স্বাদও।’’ বেসরকারি সংস্থার কর্মী উত্সব সাহা বললেন, ‘‘শরীরকে ব্যস্ত না করে আলসেমি জড়ানো পুজোর আড্ডাটাই তো আসল।’’
কর্মসূত্রে যাঁরা প্রবাসী, পুজোয় বাড়ি ফিরে অন্তত একটা দিন পরিবারের সঙ্গে জমজমাট খাওয়াদাওয়া-আড্ডার জন্যও কিন্তু বেশিরভাগই বেছে নেন মাল্টিপ্লেক্সই। ছুটোছুটি না করেই এক ছাদের তলায় মেলে সবই। আর শুধু নতুন প্রজন্মই নয়, চলতি হাওয়ার স্বাদ নিতে তাঁদের সঙ্গে জুড়ে যান বাড়ির বড়রাও। ‘‘বন্ধুদের বড় বড় দল আর পারিবারিক আড্ডার ভিড়ই এই সময়ে বেশি হয়।’’— বললেন মণি স্কোয়ারের এগজিকিউটিভ ম্যানেজার স্বর্ণেন্দু বাগচী।
তবে আদতে তো আমরা বাঙালি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বদলেছে বিনোদনের পরিভাষা, পাল্টেছে তার মাধ্যমও। তবে শিকড়ের টান কী এত সহজে উপড়ে ফেলা যায়? তাই কফিশপে বসে আড্ডা হলেও বাড়ি ফেরার সময়ে শেষবেলার নিজস্বী তুলতেও কিন্তু বাঙালি ঢুঁ মারে মণ্ডপেই। অর্থাৎ, আবহে সেই পুজোই।