শনিবার ব্যারাকপুরের কর্মিসভায় অমিত শাহ। ছবি: সংগৃহীত।
তৃণমূল সরকারকে উপড়ে ফেলার ডাক দিলেন শাহ। ‘সোনার বাংলা’ গড়ার ডাক দিলেন তিনি। বললেন, ‘‘আপনারা সহমত হলে হাত তুলুন। ভারত মাতার জয়। বন্দে মাতরম, জয় শ্রীরাম।’’
শাহ বলেন, ‘‘মমতাজি মতুয়াদের ভয় দেখাচ্ছেন। শান্তনু ফোন করছেন। আমি বলছি, ভয় পাবেন না। আপনাদের ভোট তিনি ছিনিয়ে নিতে পারবেন না। এসআইআরের বিরোধ যতই করুন, যে ভাবে তা চলছে, চলবে। অনুপ্রবেশকারী হটাব। যারা বাকি থাকবে, তাদের বিজেপির সরকার এসে হটাবে।’’
শাহ বলেন, ‘‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতীয় জনসঙ্ঘ স্থাপন করেন। এই মাটির তিনি। পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষা করেছিলেন, নয়তো আজ তা বাংলাদেশের অংশ হত। তিনি কাশ্মীরকে রক্ষা করেছেন। প্রাণ দিয়েছেন। আজ তাঁর দল দেশে ২১ রাজ্যে সরকার গড়েছে। কিন্তু আমরা সন্তুষ্ট নেই। তখনই মোদীজি এবং আমরা হাসব, যখন ২২তম রাজ্য হবে আমাদের বাংলা। এই হবে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা। শ্যামাপ্রসাদের জন্যও এটাই হবে শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই দায়িত্ব আমাদের সকলের।’’
শাহ বলেন, ‘‘আমাদের ৬০ জনের বেশি কর্মী মারা গিয়েছে। শত শত মানুষ আহত। কত লোকের ঘর পুড়েছে। ভুল মামলায় কত মানুষ জেলে। আজ সকল কর্মীদের বলছি, আমাদের যাঁরা শহিদ হয়েছেন, তাঁদের স্মরণ করুন। আজ থেকে গণনা পর্যন্ত কমল প্রতীককে সমর্পণ করুন।’’
শাহ বলেন, ‘‘ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির তদন্ত করব। এক এক জন দুর্নীতিগ্রস্তকে বেছে বেছে জেলে ঢোকাব। ১০ লক্ষ কোটির বেশি টাকা বাংলার সরকারকে দিয়েছি। আপনাদের গ্রামে এসেছে? কোথায় গেল? সব টাকা, যা মোদীজি পাঠান, তা তৃণমূল সিন্ডিকেটের হাতে যায়। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, বিজেপির সরকার গড়ুন, মোদীজি যা টাকা দেবেন, সব গ্রামে গ্রামে পৌঁছোবে। কোনও কাটমানি হবে না।’’
শাহের কথায়, ‘‘সব সীমা অতিক্রম করেছে দুর্নীতি। এখানকার মানুষ সিন্ডিকেট নিয়ে বিরক্ত। গুণ্ডাদের হাতে যায় টাকা। এই সরকার কি চলা উচিত? পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, জীবনকৃষ্ণ সাহা, মদন মিত্র, পরেশ পাল, মানিক ভট্টাচার্য, অজিত মাইতি, চন্দ্রনাথ সিংহ, কুন্তল ঘোষ, আরাবুল ইসলাম, ফিরহাদ হাকিম, শোভন চট্টোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, অনুব্রত মণ্ডল— সকলে জেলে গেছেন। আমাদের সরকার গড়তে দিন, বাকিদেরও ভরে দেব। মমতাজি, সাহস থাকলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইলে, এঁদের টিকিট দেবেন না। ওঁদের টিকিট না দিলে ওঁরা ভাইপোর নাম বলে দেবে।’’
শাহ বলেন, ‘‘মমতার শাসনে দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠান করে ফেলেছে। এসএসসি, পুরসভা নিয়োগ, গরু, একশো দিনের কাজ, পিএম আবাসের দুর্নীতি হয়েছে। হাজার কোটির দুর্নীতি হয়েছে। মমতাজি, আপনার চোখে পড়ে না। ভাইপোকে মুখ্যমন্ত্রী করবেন বলে আপনার চোখে ঠুলি পড়েছে। বাংলার মানুষ ছানির অস্ত্রোপচার করে দেবে। আপনার চোখে সব পড়বে।’’
শাহ বলেন, ‘‘এপ্রিলের শেষে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী ৪৩ দিনে সীমানার কাজ করবে। এটা আমাদের প্রতিশ্রুতি। অসমে কংগ্রেসের সরকার ছিল, অনুপ্রবেশ চলত। বন্ধ হত না। আমাদের সরকার এসে বন্ধ করেছে। গুজরাত, রাজস্থানে বিজেপির সরকার। সেখানে অনুপ্রবেশ হয় না। যেখানে বিজেপির সরকার সেখানে অনুপ্রবেশ হয় না। বাংলার মানুষকে বলছি, লাল, সবুজ সরকার হয়েছে। এক বার বিজেপি সরকার আনুন। অনুপ্রবেশ বন্ধ হবে।’’
শাহ বলেন, ‘‘এ বার বাংলায় বিজেপি সরকার গড়া শুধু এ রাজ্যের জন্য জরুরি নয়। এখানে যে ভাবে অনুপ্রবেশ হচ্ছে, তাতে গোটা দেশের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। অনুপ্রবেশকারীদের রুখতে হবে তো? মমতাদিদি বলেন, কেন্দ্র কী করে? আমি সংসদে বলেছিলাম, ফেন্সিংয়ের জন্য জায়গা দিচ্ছে না মমতার সরকার। তাই সীমানা দেওয়া যাচ্ছে না। তাই নদী, নালা দিয়ে যে অনুপ্রবেশ হয়, তাদের আপনার পুলিশ আটকায় না। তাদের জাল নথি দিয়ে পুরো দেশে পাঠিয়ে দেয়। তৃণমূলের সাংসদেরা এই নিয়ে বিরোধিতা করেন আমার ভাষণের। কলকাতা হাই কোর্টও কিছু দিন আগে নির্দেশ দিয়েছে জমি দিতে। হাই কোর্ট বলেছে, মমতার সরকার অনুপ্রবেশ রুখতে সচেষ্ট নয়। বড় ধাক্কা লেগেছে। উনি এখনও দেবেন না। কারণ তাঁর ভোটব্যাঙ্ক ওই অনুপ্রবেশকারী।’’
শাহ বলেন, ‘‘মা-মাটি-মানুষ বলে ক্ষমতায় এসেছিল মমতার সরকার। মহিলাদের নিরাপত্তা নেই। মাটি অনুপ্রবেশকারীরা হজম করেছে। মানুষ সিন্ডিকেট নিয়ে বিপর্যস্ত। তিনটির রক্ষা করতে হলে বিজেপির সরকার গড়তে হবে।’’
শাহ বলেন, ‘‘টানা তিন বার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন মোদী। অন্ধ্রে আমরা সরকার গড়েছি। ওড়িশায় প্রথম বার গড়েছি সরকার। অরুণাচলে তিন বার সরকার গড়েছি। দিল্লির পরে বিহারে গড়েছি। ২০২৬ সালে কেরলে তিরুঅনন্তপুর পুরসভায় প্রথম বার বিজেপি জিতেছে। মুম্বইয়েও পুরসভা ভোটে জিতেছি। এ বার বাংলা।’’
শাহ বলেন, ‘‘আমায় পরিহাস করেন। মমতাদি, রামসেতু যখন হয়েছিল, রাবণও পরিহাস করেছিল, যে আমায় কেউ হারাবে না। ২০২৪ সালে ৩৯ শতাংশ ভোট মিলেছে। ২০২১ সালের বিধানসভায় ৭৭টি আসন পায় বিজেপি। শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা। এ বার ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে লাফ দেবে বিজেপি। ’’
শাহ বলেন, ‘‘এটা তৃণমূল সরকারকে টাটা বাই বাই করার বছর। কমিউনিস্টদের থেকে মুক্তি পেতে তৃণমূল সরকারকে এনেছিল বাংলার মানুষ। তৃণমূল এসে ওদেরও ভাল করে দিয়েছে। এখানে কাটমানি, ভাইপোর দাদাগিরি, পুলিশের ভুল প্রয়োগ, অনুপ্রবেশ একটা শিল্প হয়ে গিয়েছে। বিজেপির সরকার হবে প্রচুর জনমতে।’’
শাহ বলেন, ‘‘অগ্নিকাণ্ডে আপনার লোক শামিল মমতাজি। জলা জমিতে গুদাম হয়েছে। তা বাইরে থেকে কেন বন্ধ ছিল? ভিতরে লোক জ্বলে পুড়ে মরেছে। বাইরে আসতে পারেননি। মমতাজি, পর্দা দিতে চাইলে দিন, এপ্রিলের পরে বিজেপি সরকার আসবে। এই অগ্নিকাণ্ডের অপরাধীদের জেলে পাঠাব।’’
শাহ আনন্দপুর কারখানা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুললেন। অপরাধীদের জেলে পাঠানোর দাবি তুললেন। তিনি জানান, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন শুভেন্দুরা। তাঁদের বাধা দেওয়া হয়।
শাহ বলেন, ‘‘আনন্দপুরে যে আগুন লেগেছে, তা দুর্ঘটনা নয়। ২৫ জন মৃত। ২৭ জন নিখোঁজ। কেন হল? মোমো কারখানার মালিক যিনি, তিনি কার ঘনিষ্ঠ? সেখানে কার টাকা বিনিয়োগ হয়েছে? বিমানে ওই মালিক সফর করেছেন। তাঁকে গ্রেফতার করা হল না কেন? এত জন মারা গেলেন, অনুপ্রবেশকারী হলে এ রকমই করতেন মমতাজি? এই নিয়ে রাজনীতি কেন করছেন? লজ্জা পাওয়া উচিত। ’’
শাহ বলেন, ‘‘এই বন্দে মাতরমের জন্ম এই বাংলার মাটিতে। সেই নিয়ে যখন সংসদে আলোচনা চলছিল, মমতার সাংসদের এই নিয়ে আলোচনার বিরোধিতা করেন। বাংলার মাটি কি এটা সহ্য করবে? বাংলার ঘরে ঘরে বার্তা নিয়ে যেতে হবে, অনুপ্রবেশকারীদের খুশি করতে মমতা বন্দে মাতরমের বিরোধিতা করছেন। মমতাজি, আপনাকে বলছি, এর বিরোধ করে মোদীজির বিরোধ করছেন না। আপনি বাংলার অস্মিতা, ভারতের স্বাভিমানের বিরোধ করছেন। এই বিরোধিতা যারা করছে, আগামী নির্বাচনে উপড়ে ফেলুন। রাষ্ট্রভক্ত সরকার গড়ুন।’’
শাহ ‘হরিচাঁদ ঠাকুরের পবিত্র মাটিকে’ প্রণাম জানান। তিনি বলেন, ‘‘বন্দে মাতরম এ বছর ১৫০ বছরে পা দিয়েছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বন্দে মাতরম লেখেন। স্বাধীনতার লড়াই যাঁরা করেছিলেন, তাঁরা একে মন্ত্র করেছিলেন। যাঁরা শহিদ হন, সকলের মুখে শেষ শব্দ ছিল বন্দে মাতরম। মোদী সরকার এই গানের ১৫০ বছর পূর্তির উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ’’
শাহ এর পরে একে একে মঞ্চে উপস্থিত বিজেপি নেতার নাম নেন। তিনি বলেন, ‘‘আজ যখন বাংলায় এলাম, বিশাল কর্মী সম্মেলনে এলাম, তখন আনন্দপুরে মোমো কারখানায় মৃতদের শ্রদ্ধা জানিয়ে কথা শুরু করছি। এটা দুর্ঘটনা নয়। মমতা ব্যানার্জি সরকারের দুর্নীতির কারণে হয়েছে। এই নিয়ে পরে কথা বলছি।’’