তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
ব্রিগেডে প্যাটিস বিক্রেতাকে মারধরের প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, “এই রাজ্যে কে কী করবে বিজেপির নেতা ঠিক করবে? আমরা করতে দেব না। সারা দেশও যদি গেরুয়াময় হয়ে যায়, এই রাজ্য রুখবে। এই দেশকে পশ্চিমবঙ্গ পথ দেখাবে। আপনার যত ক্ষমতা আছে ব্যবহার করুন। ইডি, সিবিআই, আয়কর দফতর, কেন্দ্রীয় বাহিনী, নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করুন, যত অর্থবল আছে প্রয়োগ করুন। আর এক দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের ১০ কোটি মানুষ। এদের কাছে সব আছে, শুধু মানুষ নেই। সব বিজেপির, শুধু মানুষগুলো তৃণমূলের।”
অভিষেক বলেন, “অমর্ত্য সেনের নাম বাদ দিয়ে দিচ্ছে। অমর্ত্য সেনকে শুনানির নোটিস পাঠাচ্ছে। স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থাকলে তাঁকেও শুনানির নোটিস পাঠাত! বলছে, অনুপ্রবেশকারী ঢুকে গিয়েছে। অনুপ্রবেশকারীর নাম কী? দেব, অমর্ত্য সেন! ক্ষমতা থাকলে প্রমাণ করুক কত জন বাংলাদেশি, কত জন রোহিঙ্গা।”
বিজেপিকে নিশানা করে অভিষেক বলেন, “আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রাজ্যের ২ লক্ষ কোটি নরেন্দ্র মোদীর সরকার আটকে রেখেছে। আমি মিথ্যা বললে, আমার বিরুদ্ধে মামলা করে জেলে ঢোকাবি। রাজ্যে ২৯৪টি বিধানসভা রয়েছে। এক একটি বিধানসভার ৬৮০ কোটি টাকা বিজেপি সরকার আটকে রেখেছে। বাঁকুড়া জেলার ৭ হাজার কোটি টাকা আটকে রেখেছে এই বিজেপি। এই টাকা ছাড়লে রাতারাতি বাঁকুড়ার জন্য সাত হাজার কোটি টাকা দিতে পারবে রাজ্য সরকার। এরা চায় বাংলার মানুষ ওদের পা ধরুক। আপনারা তা চান?”
অভিষেক বলেন, “বিজেপিকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যেন এ রাজ্যের দিকে চোখ তুলে দেখার আগে একশো বার ভাবে। সুভাষ সরকারকে যেমন প্রাক্তন করেছেন, প্রত্যেকটি বুথে এদের প্রাক্তন করতে হবে। বিষ্ণুপুর লোকসভায় কানের পাশ দিয়ে বেরিয়েছে। পাঁচ হাজার ব্যবধান মানে আড়়াই হাজার ভোট এ দিক-ও দিক। আগামী নির্বাচনে এক লক্ষ ভোটে জিতবে।”
অভিষেক বলেন, “আমি রিপোর্ট কার্ডের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। আপনারা তৃণমূলকে প্রত্যাশিত ফল দেননি। তার পরেও পাঁচ বছরে তৃণমূল ৩৫০০ কোটি টাকা খরচ করে লক্ষ্মীর ভান্ডার দিয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে জলের প্রকল্প চলছে। যেখানে যেখানে জলের সমস্যা আছে, ১৫০টি টিউবওয়েলের কাজ অবিলম্বে শুরু করার জন্য অনুরোধ করে এসেছিল জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের মন্ত্রীকে। যেখানে ট্যাঙ্কার দিয়ে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা যায়, সেখানেও তা করতে হবে এসেছি।”
তৃণমূলনেতা বলেন, “৫০ বছর, ৬০ বছর, ৭০ বছর এই মাটিতে থাকার পরে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে? সুভাষ সরকারের নিজের জন্মের সার্টিফিকেট আছে? সৌমিত্র খাঁয়ের জন্মের সার্টিফিকেট আছে? বিজেপির কেউ সার্টিফিকেট চাইলে বলবেন, আগে তোমার বাবার সার্টিফিকেট নিয়ে এসো।”
অভিষেক বলেন, “এসআইআর-এর নাম করে বাঙালির উপরে অত্যাচার করছে। এক সপ্তাহে আগে এক জন বিএলও আত্মহত্যা করলেন। আজ আমি আসার সময়ে শুনলাম, বীরভূমে আবার এসআইআর-এর নোটিস পেয়ে শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে কাঞ্চন মণ্ডল নামে এক ভদ্রলোক মারা গিয়েছেন। দু’মাসের মধ্যে প্রায় ৭০টি প্রাণ হারিয়েছি আমরা। বাঙালিকে শুধু ভাতে মারতে চায়নি। বাঙালিকে প্রাণে মেরেছে এই বিজেপি। যারা আমাদের প্রাণে মেরেছে, তাদের রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষা দিতে হবে।”
অভিষেক বলেন, “৩৪ বছরের জগদ্দল পাথরকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে যে মুক্তির সূর্যোদয় ঘটিয়েছে, তার নাম তৃণমূল কংগ্রেস। নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আপনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটকাবেন? আগে যান সিপিএমের থেকে একটু ট্রেনিং নিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্য ধাতুতে তৈরি। তৃণমূল বশ্যতা স্বীকার করতে জানে না।”
অভিষেক বলেন, “৭০টা বিধায়ক নিয়ে যে দল ব্রিগেডে পেটের দায়ে চিকেন প্যাটিস বিক্রি করার জন্য এক যুবককে আক্রমণ করছে, তাকে আমরা ছাড়ব? বিজেপি ভাবে কি, ইডি দিয়ে, নির্বাচন কমিশন দিয়ে আমাদের আটকাবে? আমি মোদীজিকে বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলার ইতিহাস জানুন।”
অভিষেক বলেন, “যারা হিন্দু ধর্মের ধারক-বাহক বলে নিজেদের দাবি করে, তাদের নেতা মা দুর্গার বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই হল বিজেপির আসল চেহারা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অমিত শাহ এসে বলছেন রবীন্দ্রনাথ সান্যাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম জানে না। ২০১৯ সালের ভোটের আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি টুকরো টুকরো করে ভেঙেছিল বিজেপির কর্মীরা। সুকান্ত মজুমদার বলেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ হচ্ছেন অজ্ঞ বামপন্থী প্রোডাক্ট। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মোধন করছেন বঙ্কিমদা বলে। যেন ছোটবেলায় একসঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতেন।”
অভিষেক বলেন, “২ কোটি ৩০ লক্ষ মায়েদের লক্ষ্মীর ভান্ডার দিতে সরকার খরচা করে ২৭ হাজার কোটি টাকা। যত দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার রাজ্যের মাটিতে আছে, কেউ আপনাদের লক্ষ্মীর ভান্ডার আটকাতে পারবে না। এটা আমাদের শপথ। আমরা কথা দিয়ে কথা রাখার দল।”
তৃণমূলনেতা বলেন, “আজ থেকে পাঁচ দিন আগে বিজেপির রাজ্য কমিটির এক সদস্য সভা করে বলেছেন, যারা লক্ষ্মীর ভান্ডার পায়, তাদের ঘরে বন্দি করে রাখো। তারা যেন ভোট দিতে না পারে। বিজেপির নেতারা মায়েদের বন্দি করে রাখতে চায়। যেদিন ভোটের রেজ়াল্ট বেরোবে, দিল্লি দেখবে কে কাকে বন্দি করেছে। চলবে না অন্যায়, টিকবে না ফন্দি, মায়েদের আদালতে মোদীবাবুকে হতে হবে বন্দি।”
অভিষেক বলেন, “২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে বাঁকুড়ার ১২টি আসনের মধ্যে চারটিতে আপনারা তৃণমূলকে জিতিয়েছিলেন। বাকি আটটিতে জিতেছিল বিজেপির প্রতিনিধিরা। ২০২৪ সালের লোকসভায় চার থেকে বেড়ে আমাদের ছয় হয়েছে। এখন তৃণমূল ছয়, বিজেপি ছয়। বিষ্ণুপুর লোকসভার একটি আসন পড়ে খণ্ডঘোষে। বাঁকুড়া লোকসভার একটি আসন পড়ে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে। বিষ্ণুপুরকে ছয় মারতে হবে, বাঁকুড়াকেও ছয় মারতে হবে। দুটো ছয় মেরে তৃণমূলের পক্ষে ১২-০ করতে হবে। তৃণমূল জিতলে অধিকার পাবেন। বিজেপি জিতলে অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। তৃণমূল জিতলে দু’মুঠো ভাত। বিজেপি জিতলে সাম্প্রদায়িক সংঘাত। তৃণমূল জিতলে দুয়ারে রেশন, মোদী জিতলে দুয়ারে ভাষণ। তৃণমূল জিতলে মানুষের পাতে ভাত। বিজেপি জিতলে খালি মোদীজির মন কি বাত। কী নেবেন, সিদ্ধান্ত আপনার।”
অভিষেক বলেন, “শালতোড়ায় কেন এসেছি? নবজোয়ারের কর্মসূচির আগে আপনাদের কথা দিয়ে গিয়েছিলাম। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরে কিছু জায়গায় ক্রাশারের কাজ আইনি প্রক্রিয়া মেনে চালু হয়েছিল। আবার অনেক বাধ্যবাধকতা, কোর্টের নির্দেশের জন্য সেই কাজ পুরোদমে চালু হয়নি। এখনও পর্যন্ত প্রায় চার-সাড়ে চার হাজার কর্মী এই কাজে যুক্ত রয়েছেন। পুরোদমে চালু হয়ে গেলে ২৫ হাজার লোক কাজ পাবে। সরকারি যে ১৩৩ হেক্টর জমি রয়েছে, সেখানে প্রায় ১৮টি মাইন রয়েছে। এই ১৮টি মাইন শুরু হলে কমপক্ষে ২৫ হাজার লোক কর্মসংস্থানের বাড়তি সুযোগ পাবে। আমি গত দু’মাস ধরে এর উপর কাজ করেছি। আজ সকালেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ৩১ মার্চের আগে সব কাজ চালু করে ২৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কথা দিয়ে কথা রাখার নাম তৃণমূল।”
অভিষেক বলেন, “পাঁচটা খাদান চালু রয়েছে। প্রায় ১২০টি ক্রাশারের কাজ চলছে। ২৫০টির উপরে ক্রাশার রয়েছে। কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। একটি খাদান করতে গেলে অন্তত এক হেক্টর জমির প্রয়োজন হয়। একাধিক সরকারি অনুমতির দরকার হয়। ডাইরেক্টর জেনারেল অফ মাইনিং-এর এনওসি পেতে গেলে মাসের পর মাস লেগে যায়। আইনি প্রক্রিয়া মেনে যদি খাদান চালুও করতে হয়, ৩০-৩২ লক্ষ জমা দিতে হয়। তার পরে অনৈতিক ভাবে ডিজি মাইন-কে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হবে। শালতোড়ার বিধায়ক বিজেপির। ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিল বিজেপির। আমি জিজ্ঞাসা করি, বিধায়ক-সাংসদদের লজ্জা লাগে না! কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থাকে ঘুষ দিতে মানুষকে নিজেদের অধিকারের স্বার্থে লড়তে হয়। তখন এদের বড় বড় ভাষণ কোথায় থাকে!”
অভিষেক বলেন, “কোনও ভদ্রলোক, ভাল লোক, শিক্ষিত লোক, মার্জিত লোক, সভ্য লোক বিজেপি করে না। যত মদ্যপ, মাতাল, পাতাখোর, দুনম্বরি, চোর, চিটিংবাজ, গাঁজাখোর, সব ভারতীয় জনতা পার্টিতে।”
অভিষেক বলেন, “বাঁকুড়ার যে বিস্তীর্ণ এলাকায় মাওবাদীরা দাপিয়ে বেরিয়েছে, আজ সেই বাঁকুড়া শান্ত। যারা সিপিএমের জল্লাদ ছিল, তারাই এখন জার্সি পাল্টে বড় বড় ভাষণ দিচ্ছে।”
অভিষেকের প্রশ্ন, “১২ বছর (কেন্দ্রে) বিজেপি ক্ষমতায়। বিজেপির রিপোর্ট কার্ড কোথায়? ২০১৯ সালে এই বাঁকুড়ার দুই লোকসভা কেন্দ্রেই যে বিজেপি জিতেছিল, তা-ও স্মরণ করান অভিষেক। তিনি বলেন, “বাঁকুড়ার জন্য কী করেছে? এক দিকে আমি আমাদের সরকারের রিপোর্ট কার্ড নিয়ে যাব। অন্য দিকে বিজেপি রিপোর্ট কার্ড নিয়ে আসবে। ভোকাট্টা করে মাঠের বাইরে বার করে দিতে না পারলে মুখ দেখাব না!”
অভিষেকের উপস্থিতিতেই শালতোড়ার সভামঞ্চে তৃণমূলে যোগ দিলেন বিজেপির দুই স্থানীয় নেতা। এক জন প্রাক্তন ব্লক প্রেসিডেন্ট এবং অন্য জন বাঁকুড়া পুরসভার নির্দল কাউন্সিলর।
দুপুর আড়াইটের কিছু পরে সভাস্থলে পৌঁছোন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায়। এ পর্বের অন্য সভাস্থলগুলির মতো বাঁকুড়াতেও অভিষেকের সভামঞ্চে র্যাম্পের ব্যবস্থা রয়েছে। মঞ্চে উঠে সেই র্যাম্পে ঘুরে ঘুরে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের অভিবাদন জানান তিনি।