কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। —ফাইল চিত্র।
শাহ বলেন, “উত্তরবঙ্গে এমস তৈরির জন্য জমি আটকে রেখেছে মমতার সরকার। বাগডোগরার নতুন বিমানবন্দর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আটকে রেখেছেন। রেল প্রকল্প আটকে রেখেছেন তিনি। চা শ্রমিকদের জন্য মোদীজি যা কিছু করেছেন, অসমে তা কার্যকর হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের চা শ্রমিকদের কোনও সুবিধা হয়নি। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের জমির মালিকানা দেওয়ার বদলে দেশলাই বাক্সের মতো ঘর দিতে চাইছে। আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, অসমের মতো পশ্চিমবঙ্গেও চা শ্রমিকদের জমির অধিকার দেওয়ার কাজ করবে বিজেপি। চা বাগানগুলিও বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে মমতার সরকার। উত্তরবঙ্গের পাহাড়কে কেটে ফেলা হচ্ছে। এ সব বন্ধ করতে হলে বিজেপিকেই ক্ষমতায় আনতে হবে।”
শাহ বলেন, “বিজেপিকে একটা সুযোগ দিন। বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ব। এমন পশ্চিমবঙ্গ গড়ব, যেখানে অনুপ্রবেশ থাকবে না, যেখানে শিল্প আসবে।,দুর্নীতি ছাড়াই চাকরি মিলবে, তরুণদের ভিন্রাজ্যে যেতে হবে না।”
অমিত শাহ বলেন, “২০১১ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ৬৯০০ টি সংস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে ১১০টি সংস্থা শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ছিল। সব রাজ্যের বাইরে চলে গিয়েছে।” দেশের মাথাপিছু আয় এবং জিডিপি-তে অতীতে পশ্চিমবঙ্গ কী অবস্থায় ছিল এবং এখন কী অবস্থায় রয়েছে, সেই পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন শাহ।
শাহ বলেন, “মোদীজি ১০ লক্ষ কোটিরও বেশি টাকা পশ্চিমবঙ্গে পাঠিয়েছেন। কংগ্রেসের আমলে সরকারকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমর্থন দিয়েছেন। ওরা ১০ বছরে দু লক্ষ কোটি পাঠিয়েছে। মোদীজি পাঠিয়েছেন ১০ লক্ষ কোটি। আপনাদের কাছে কিছু এসেছে? তা হলে এই ১০ লক্ষ কোটি টাকা কোথায় গেল? এই ১০ লক্ষ কোটি টাকা তৃণমূলের সিন্ডিকেটের কাছে চলে গিয়েছে। আপনারা বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী বেছে নিন, সিন্ডিকেটের সকলকে জেলে পুরে দেব।”
শাহ বলেন, “২০২৪-২৫ সালের রাজ্য বাজেটে ৩ লক্ষ ৬৭ হাজার কোটির বাজেট ঘোষণা করা হয়। কিন্তু উত্তরবঙ্গের জোটে ৮৬১ কোটি। অর্থাৎ, চার ভাগের এক ভাগেরও কম। অথচ উত্তরবঙ্গের আয়তন রাজ্যের মোট আয়তনের ২৪ শতাংশ। ২৫ শতাংশ বাজেট পাওয়ার কথা। তার বদলে ০.২৫ শতাংশ দিয়েছে। এর বেশি অর্থ তো মোদীজি উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন।” তিনি আরও বলেন, “দিদির নজরে উত্তরবঙ্গ শুধু সোনার ডিম পারা মুরগি। এটা বেশিদিন চলবে না। আপনার টাটা বাই বাই-এর সময় এসে গিয়েছে। এই বছরের এপ্রিলের শেষে আপনাকে বিদায় নিতে হবে। আমরা উত্তরবঙ্গবাসী কথা দিচ্ছি, উত্তরবঙ্গের আয়তন এবং জনসংখ্যার হিসাবে যে পরিমাণ বাজেট হওয়ার কথা, তার চেয়ে এক টাকা হলেও বেশি বাজেট দেব উত্তরবঙ্গের জন্য। অন্যায় হতে দেব না।”
শাহ বলেন, “উত্তরবঙ্গ এবং শিলিগুড়ি বিজেপির দুর্ভেদ্য গড়। শিলিগুড়ি অঞ্চলকে গোটা দেশ ভালবাসে। শিলিগুড়ি উত্তর-পূর্বে যাওয়ার রাস্তা। সেই কারণে ভালবাসে। কিছু দিন আগে কয়েক জন দিল্লিতে স্লোগান তোলে, চিকেন্স নেককে বন্ধ করে দেবে। কেন বন্ধ করবে, কারও বাবার জমি নাকি! এটা ভারতের জমি, কেউ হাত লাগাতে পারবে না। দিল্লি পুলিশ তাদের জেলে পুরে দিয়েছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ওদের ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত গিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়। সুপ্রিম কোর্টও ওদের দাবি খারিজ করে দিয়েছে।”
শাহ বলেন, “আমি আজ বলে যাচ্ছি, অনুপ্রবেশ শুধু বন্ধই করব না। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধরে ধরে প্রত্যেক অনুপ্রবেশকারীকে ফেরত পাঠাব। সেই জন্যই মমতা এসআইআর-কে ভয় পাচ্ছেন। কারণ উনি জানেন, এসআইআর হলে অনুপ্রবেশকারীরা বেরিয়ে যাবে।”
রাজ্যে গরু পাচার মামলা থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলা-সহ বিভিন্ন ঘটনায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতার নাম উঠে এসেছে। সেই অভিযোগের কথা শিলিগুড়ি থেকে ফের তুলে ধরেন শাহ। অভিযুক্তদের নাম ধরে বলেন, “যদি আপনি দুর্নীতির সমর্থনে না থাকেন, তা হলে এই ২৩ জনকে ভোটের টিকিট দেবেন না। তা হলে বুঝব আপনি দুর্নীতিকে সমর্থন করেন না।” এর পরেই শাহ বলেন, “উনি টিকিট দেবেন। টিকিট না দিলে ওরা ভাইপোর নাম বলে দেবে।”
শাহ বলেন, “আজ গোটা দেশে বিজেপি এবং এনডিএ-র ২১টি সরকার রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে আমাদের ৬০ জন কর্মীকে খুন করেছে তৃণমূলের গুন্ডারা। বিজেপির কর্মীরা কি তা সহ্য করবেন? উত্তরবঙ্গের কর্মীরা কি তা সহ্য করবেন? ২১টি সরকার গঠনের পরেও নরেন্দ্র মোদী খুশি নন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করার পরে তাঁর মুখে হাসি ফুটবে।”
“২০২৬ সালের ভোটে তৃণমূল সরকারকে সমূলে উৎখাত করতে হবে”। শিলিগুড়ির কর্মী সম্মেলন থেকে বললেন শাহ। তৃণমূলের ‘মা মাটি মানুষ’ স্লোগান নিয়েও রাজ্যের শাসকদলকে বিঁধলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, এ রাজ্যে মহিলারা সুরক্ষিত বোধ করতে পারেন না।
শাহ বলেন, “যখন বন্দেমাতরম নিয়ে সংসদে আলোচনা হচ্ছিল। তৃণমূল তার বিরোধিতা করছিল। আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারছিলাম না কেন এর বিরোধিতা করছে। আমি ওদেরই এক সাংসদকে জিজ্ঞাসা করলাম। উনি বললেন, আমাদের অনুপ্রবেশকারী ভোটব্যাঙ্ক ‘বন্দেমাতরম’ নিয়ে অসন্তুষ্ট। তাই আমরা বিরোধিতা করছি। লজ্জা করুন মমতা। ভোটব্যাঙ্কের জন্য বন্দেমাতরম-এর বিরোধিতা করছেন।”
শাহ বলেন, “মমতাদির যাওয়ার সময়ে এসে গিয়েছে। আপনার থেকে তো কমিউনিস্টরা ভাল ছিল। পুরো রাজ্যে গোর্খাদের বাঙালিদের সঙ্গে লড়াই বাধিয়ে দিয়েছেন। আদিবাসীদের সঙ্গে কুর্মিদের ঝামেলা বাধিয়ে দিয়েছেন। রাজ্যের একতাকে তছনছ করে দিয়েছেন। মমতাদি, আপনার সময় শেষ হয়ে গিয়েছে।”
দুপুর সাড়ে তিনটের কিছু আগে শিলিগুড়ির কর্মী সম্মেলনে পৌঁছোন অমিত শাহ।
ব্যারাকপুরের কর্মী সম্মেলন শেষ করে বেলা ৩টে ২০-তে বাগডোগরায় পৌঁছোনোর কথা শাহের। শিলিগুড়ির এই কর্মসূচি সেরে বাগডোগরা থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শিলিগুড়ি থেকে শাহ কী বার্তা দেবেন, তা নিয়ে অপেক্ষায় বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা।
ব্যারাকপুর থেকে শাহ বলেন, “২০২৪ সালে ৩৯ শতাংশ ভোট মিলেছে। ২০২১ সালের বিধানসভায় ৭৭টি ভোট পায় বিজেপি। এ বার ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে লাফ দেবে বিজেপি। ’’
ব্যারাকপুরের কর্মী সম্মেলন থেকে আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তোলেন শাহ। অপরাধীদের জেলে পাঠানোর দাবি তোলেন তিনি। শাহ এ-ও জানান, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন শুভেন্দুরা। তাঁদের বাধা দেওয়া হয়।
শনিবার পশ্চিমবঙ্গে জোড়া কর্মিসভা রয়েছে অমিত শাহের। প্রথমটি হয়েছে ব্যারাকপুরে। সেই কর্মসূচি সেরে কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে শাহ রওনা দেন শিলিগুড়ির উদ্দেশে। বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছোনোর পরে বিমানবন্দরের অদূরেই এয়ারফোর্স মাঠে শিলিগুড়ি বিভাগের কর্মী সম্মেলন রয়েছে তাঁর। সেখানে ডাকা হয়েছে দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার সাংগঠনিক জেলার বিজেপি কর্মীদের।