মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
সম্প্রতি হওয়া বাংলাদেশ ভোটের উদাহরণ টেনে এ বার জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! কমিশনের ‘অত্যাচারের’ কথা আন্তর্জাতিক স্তরে তোলা এবং ‘তথ্য ফাঁস’ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মমতা! পক্ষান্তরে, বিরোধীদের কটাক্ষ, বারবার নানা জিনিস ‘ফাঁস’ করার হুমকিই কেন দিয়ে চলেন মুখ্যমন্ত্রী? কেন সে সব প্রকাশ্যে আনেন না?
মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবার নবান্ন থেকে তোপ দেগেছেন, “তাদের (কমিশনের) দেখা উচিত, কিছু দিন আগে বাংলাদেশে ভোট হয়েছে। সবাই ভেবেছিল অশান্তি হবে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। ভারত গণতান্ত্রিক দেশ। তুঘলকি-কমিশন! লজ্জা হওয়া উচিত।” এই সূত্রেই বিজেপির হয়ে কমিশনের কাজ করার অভিযোগে ফের শাণ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, “দেশের গণতান্ত্রিক প্রচার ও সংস্কৃতির ছবি আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরব। দেশের বিরুদ্ধে নই, দেশকে ভালবাসি। কিন্তু এই একটি সরকার, একদলীয় শাসন, একদলীয় উদ্দেশ্য আর একদলীয় কমিশন। তুঘলকি-কমিশন চলছে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে।”
মমতার অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ না-মেনে ১৪ ফেব্রুয়ারি আচমকা নাম তোলার পোর্টাল বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি, এসআইআর-নথি হিসাবে বিহারে ফ্যামিলি রেজিস্টার, বনের অধিকারপত্র, সরকারের দেওয়া জমি-বাড়ির শংসাপত্র, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট গ্রাহ্য হলেও, এখানে তা নয় কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কমিশনে কর্মরত এক মহিলা আধিকারিকের নাম না-করে মুখ্যমন্ত্রীর ফের তোপ, “এক জন বিজেপি-কন্যা আইটি-সেলের মাধ্যমে ৫৮ লক্ষকে বাদ দিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে যোগ্য ভোটার আছেন।”
যদিও কমিশন সূত্রের বক্তব্য, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত যাবতীয় পদক্ষেপ আইন ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষিত, যা যে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ দিন পর্যন্ত প্রায় ২.৪৩ লক্ষ ভোটার ‘অযোগ্য’ হিসাবে চিহ্নিত। নথি ‘আপলোড’ বাকি প্রায় ১.১৪ লক্ষের।
নাম না-করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উদ্দেশেও এ দিন ফের সরব হয়েছেন মমতা। তিনি বলেছেন, “আপনার চাকরি কত দিন থাকবে? অনেক কিছু ঘটছে, বলছি না। ২০২৬-এ কেন্দ্রের এই সরকার থাকবে না! আপনাদের নাম-পদের পরিচয় সব নথিবদ্ধ আছে। আমাকে আঘাত করলে প্রত্যাঘাত করব। গোটা পৃথিবীতে প্রচার করব।” তাঁর সংযোজন, “টি-বোর্ডে এক জন বাবু বসে রয়েছেন, যিনি এই রাজ্যের খেয়ে-পরে কিছু ‘গুপ্ত শত্রু’কে সঙ্গে নিয়ে এখানকার ক্ষতি করছেন। আপনাদের ইতিহাস, ভূগোল সব আমাদের কাছে আছে।” আর বিজেপিকে নিশানা করে মমতার প্রশ্ন, “একটাও অনুপ্রবেশকারী পেলেন? আমার কাছে অনেক তথ্য আছে, আপনারা কাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। চাইলে ফাঁস করতে পারি।” প্রয়োজনে ফের রাস্তায় নেমে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কমিশন সূত্রে পাল্টা বক্তব্য, দু’দফায় শুনানির দিন ধার্য করার পরেও ইআরও, এইআরও-রা কাজ বকেয়া রাখলে, সে দায় কমিশনের নয়। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভাবে ওই কর্মীদের ‘চাপ তৈরি’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কমিশন-কর্তাদের একাংশ। এক কর্তার দাবি, ‘‘যে ৫৮ লক্ষের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা মৃত, ঠিকানা বদল, অনুপস্থিত ও ‘ডুপ্লিকেট’ ভোটার। সব তথ্য, খসড়া তালিকা প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে দিলেও কাগজে-কলমে কেউ আপত্তি জানায়নি। ফ্যামিলি রেজিস্টার ইত্যাদি নথি তৈরির জন্য পশ্চিমবঙ্গে নির্দিষ্ট আইন নেই। বিহার-সহ নানা রাজ্যে তা আছে। তাই সেগুলি সেখানে কার্যকর হয়েছে।” পাশাপাশি, রাজ্য সরকারের আইন অনুযায়ী, স্থায়ী বাসিন্দা শংসাপত্র বা ডমিসাইল তাঁরাই পাবেন, যাঁরা প্রধানত অবাঙালি ও সেনা বা আধাসেনার চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর ‘ফাঁস-হুঁশিয়ারি’ নিয়ে পাল্টা সরব হয়েছে বিরোধীরাও। বিজেপির রাজ্য সহ-সভাপতি অগ্নিমিত্রা পালের বক্তব্য, “মুখ্যমন্ত্রী কোন তথ্য ফাঁসের হুমকি দিচ্ছেন? দেশের তথ্য না কি অনুপ মাজির কয়লার টাকায় গোয়ায় নির্বাচন লড়ার তথ্য? আন্তর্জাতিক স্তরের উপরে আকাশগঙ্গা বা সৌরজগতেও যেতে পারেন! লাভ হবে না।” আর সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর প্রশ্ন, “অমিত শাহের সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন, ফাঁস করছেন না। এখন বলছেন, নির্বাচন কমিশনের লোকজন সম্পর্কে জানেন, কিন্তু ফাঁস করছেন না! কমিশন মানুষকে হেনস্থা করছে। তা হলে মুখ্যমন্ত্রী যা জানেন, বলছেন না কেন? শুধু হুমকি কেন? না কি ওঁর কথা মতো চললে সব রাখঢাক করে দেওয়া হবে, এটাই বোঝাতে চাইছেন?”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে