মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ক্ষোভের জবাবে তীব্র পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেনই। রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে পরামর্শ দিয়েছেন, ‘‘ভোটের আগে বিজেপির কথায় রাজনীতি করবেন না!’’ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ‘সংঘাতে’র পথে চলে যাওয়ার পাশাপাশিই পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে দেখানোর জন্য বিজেপিকে কার্যত ‘চ্যালেঞ্জ’ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তীব্র আক্রমণ করলেন রাজ্যের নতুন রাজ্যপাল (এখনও দায়িত্ব নেননি) আর এন রবিকেও। মুখ্যমন্ত্রীর এই সংঘাতমূলক মনোভাব দেখে বিরোধী শিবিরে প্রশ্ন উঠছে, মুখ্যমন্ত্রী কি নিজেই রাষ্ট্রপতি শাসনের মতো কেন্দ্রীয় পদক্ষেপ চাইছেন? একই জল্পনা শাসক শিবিরের অন্দরে একাংশেরও।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও বিপুল সংখ্যাক মানুষের নাম ‘বিবেচনাধীন’ রাখার প্রতিবাদে ধর্মতলায় তাঁর ধর্না-মঞ্চ থেকে শনিবার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি শাসনের পরিকল্পনা আছে? সেই গান গেয়ে যাচ্ছেন, কোনও নীল নকশা আছে? কেন হঠাৎ রাজ্যপাল বদল?’’ একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘‘করো দেখি, এখানে রাষ্ট্রপতি শাসন! দেখতে চাই চেহারাটা। আমারই ভাল হবে, ক’দিন ঘুমিয়ে নেব তার পরে আবার লাগব!’’ নতুন রাজ্যপালের প্রতি ইঙ্গিত করে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘ছিপছিপে বাবু, রবিবাবু আসছেন, অফিসারদের ধমকাবেন! রাজভবন থেকে ফ্ল্যাট বিলি হবে, টাকা বিলি হবে? এ সব দেখা হয়ে গিয়েছে। এখানে ২০২১ সালের আগে অনেক কিছু দেখেছি।’’
দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার থেকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল, বিশেষ তালিকা পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত— কেউই এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর তোপের বাইরে ছিলেন না! জ্ঞানেশ কলকাতা সফরে আসার প্রাক্কালে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘ছেলে-মেয়ে, নাতি-পুতি, ভাইপো-ভাইঝি সব গুছিয়ে নিয়েছে। আর কত বলব!’’ সিইও আগরওয়ালের নাম না-করে প্রশ্ন তুলছেন, ১০ কোটি টাকার বাড়ি করেও দু’টি সরকারি ফ্ল্যাট করেছেন এবং বাড়ি ভাড়ার টাকাও নেন— এগুলো কি অন্যায় নয়? বিশেষ তালিকা পর্যবেক্ষকের প্রতি ইঙ্গিত করে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘আর এক জন এসেছেন বাংলার গুপ্ত শত্রু! বিজেপির জন্য কাজ করছেন আর ঝালমুড়ি খাচ্ছেন! কী হবেন, রাজ্যপাল না উপরাষ্ট্রপতি?’’ এঁদের সকলের উদ্দেশেই মমতার প্রশ্ন, ‘‘জগদীপ ধনখড়কে দেখে শিক্ষা হয়নি?’’
বিজেপি সূত্রের খবর, দলের রাজ্য নেতৃত্ব কোনও ভাবেই পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির পক্ষপাতী নন। সে ক্ষেত্রে মমতা ‘শহিদে’র মর্যাদা পেয়ে যাবেন। আর মুখ্যমন্ত্রীর এ দিনের মনোভাবে প্রশ্ন উঠছে, মমতা কি আসলে সেটাই চাইছেন তাঁর রাজনৈতিক ফায়দার জন্য? রাজ্য বিজেপির এক নেতা অবশ্য তার পাশাপাশি মনে করাচ্ছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী যদি এসআইআর নিয়ে হাই কোর্ট-সু্প্রিম কোর্ট করতে থাকেন, তা হলে ৩৫৬ ধারার প্রয়োজনই হবে না। নির্বাচন পিছোতে হবে, অন্য দিকে বিধানসভার মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে।’’
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর মত, ‘‘রাষ্ট্রপতি যা বলেছেন এবং তার প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী যা বলেছেন, নজিরবিহীন। কোনও বিষয় অপছন্দ হলেও সাংবিধানিক পদের মর্যাদার কারণে অনেক কথা বলা যায় না। তৃণমূলের সরকার গোটা রাজ্যকে লজ্জিত করছে! মনে হচ্ছে যেন মুখ্যমন্ত্রীই একটা সাংবিধানিক সঙ্কটের পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছেন!’’ এই পরিস্থিতিতে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেছেন, “রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপালের মতো সাংবিধানিক পদগুলির গরিমা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার প্রতি দিন নষ্ট করছে। দেশে অনেক সমস্যা আছে। রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীদের সে দিকে বেশি নজর দেওয়া দরকার। তা না করে নিজেদের মধ্যে লড়লে সমাজের কী হবে?”
মমতার এ দিনের মন্তব্যের পরে সমালোচনার সুর তুলে আসরে নেমে পড়েছেন বিজেপির বহু কেন্দ্রীয় নেতা। আর বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দম্ভ চরমে পৌঁছেছে। রাষ্ট্রের প্রধানের মর্যাদা ওঁর কাছে কোনও গুরুত্ব পায় না। উনি সব কিছুতেই রাজনৈতিক লাভ-লোকসান খোঁজেন। আদিবাসী সমাজের প্রতি ওঁর আচরণ বরাবরই পীড়াদায়ক।” শুভেন্দুর সংযোজন, “এটা কোনও ভুল নয়, পরিকল্পতি অবজ্ঞা!’’
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের আক্রমণ করে হুঙ্কার দিয়েছেন, ‘‘বাংলার নির্বাচনের পরে আমার টার্গেট দিল্লি! সারা দেশে ঘুরব আর তোমাদের ( বিজেপি) মুখোশ টেনেটেনে খুলব। তখন বুঝবে, দেখ কেমন লাগে! ওয়াটার গেট-এর মতো এপস্টিনও বেরিয়ে যাবে। রেখে দিয়েছি। ভোটের সময় লাগবে। দুর্যোধন, দুঃশাসন জেনে রাখো, বাংলা মরে যায়নি।’’ এসআইআর নিয়ে জনতার উদ্দেশে তাঁর আহ্বান, ‘‘ভাববেন না, এটা শুধু আজকের লড়াই। ভোট দিতে গিয়েও দেখতে পারেন যে নাম নেই। ছক্কাপাঞ্জা চলছে।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে