—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
ওঁরা বাঙালি। কিন্তু বাংলায় কথা বলা যথা সম্ভব এড়িয়ে চলছেন। উল্টে, চেষ্টা করছেন অন্য ভাষা শেখার। কারণ, কর্মস্থল ভিন্-রাজ্য। ওঁরা সেই পরিযায়ী শ্রমিক, বাংলায় কথা বলায় কর্মস্থলে হেনস্থা, মারধর, এমনকি, বাংলাদেশি অপবাদে পুলিশের হাতে হয়রান হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে যাঁদের। আজ, শনিবার, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেও মুর্শিদাবাদের মনসুর, দক্ষিণ দিনাজপুরের আনারুলেরা মাতৃভাষা উচ্চারণে স্বচ্ছন্দ হতে পারবেন না।
দিল্লিতে কাজ করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে বাংলাতেই কথা বলতেন মুর্শিদাবাদের ডোমকলের বাসিন্দা মনসুর আলি ও তাঁর সঙ্গীরা। পুলিশ তাঁদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করে। পরে ছাড়া পেলেও, আর দিল্লি যাননি মনসুরেরা। এখন মুম্বইতে কাজ করেন। মনসুর বলছেন, ‘‘এখন মুম্বইতে হিন্দি শেখার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। বাইরে বেরোলে যতটা সম্ভব কথা না বলে থাকার চেষ্টা করি। জরুরি হলে, ভাল হিন্দি জানে এমন বন্ধুর সাহায্য নিই।’’
মুর্শিদাবাদেরই হরিহরপাড়ার পরিযায়ী শ্রমিক শাইনুর ইসলাম বলছেন, ‘‘ওড়িশায় বাংলায় কথা বলে নির্যাতিত হয়েছিলাম। আর সেখানে যাইনি। পেটের টানে এখন চেন্নাইতে থাকি। তবে পুরনো ভয়ের কারণে কাজ চালানোর মতো তামিল ভাষা রপ্ত করেছি।’’ দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জের শ্রমিক আনারুল ইসলাম মিঁয়া রয়েছেন রাজস্থানে। তিনি বলেন, “হিন্দিতে কথা বললেও এখানকার লোকে বুঝে যায়, আমরা বাঙালি। কারণ, শুদ্ধ হিন্দি উচ্চারণ জানা নেই। ভয়ে দিন কাটে।”
ভাষাতত্ত্ববিদ ও অভিধানকার সুভাষ ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘ভিন্-রাজ্যে কাজে গেলে সেখানকার ভাষা শিখে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাংলায় কথা বলার অধিকার সকলেরই রয়েছে। কেউ যদি ভিন্-রাজ্যে গিয়ে বাংলা বলার জন্য নির্যাতনের শিকার হন, তা হলে সে রাজ্যের প্রশাসনের তা দেখা উচিত।’’ কলেজ সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান সৌরেন বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, “ভারতবর্ষ বহুত্ববাদী দেশ। সে দেশে ভাষার জন্য আক্রান্ত হওয়া সত্যিই খুব লজ্জার, নিন্দার।’’ কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান নন্দিনী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত, ‘‘বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকেরা ভিন্-রাজ্যে গিয়ে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারবেন না বা কথা বলতে হলে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে, এটা বাংলার জন্য আশঙ্কা এবং উদ্বেগের। প্রেক্ষাপট তদন্ত করে রাষ্ট্রের উচিত, প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করা।’’
তত্ত্ব বোঝেন না মালদহের রতুয়ার আবু হানজেলা। গত সপ্তাহে এই বাঙালি ফেরিওয়ালাকে বাংলায় কথা বলায় ওড়িশায় মারধর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। আবু বোঝেন, ‘‘বাংলায় কথা বললে সুবিধা হয়। কিন্তু ওড়িশায় যা হল, তার পরে সেখানে ভয়ে তা বলার কথা ভাবতে পারছি না।’’ ‘পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ’-এর রাজ্য সম্পাদক আসিফ ফারুক বলেন, ‘‘বাংলা ভাষা বললেই ভিন্-দেশি বলে দেগে দেওয়া বা হয়রানির অভিজ্ঞতা বাঙালি শ্রমিকদের মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে থাকতে বাধ্য করছে। মাতৃভাষা দিবসে এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে!’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে