শিলিগুড়ি আদালতে তোলা হচ্ছে প্রতারণার অভিযোগে ধৃত নাগমা খাতুনকে। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।
মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির টোপ দিয়ে ফের বড়সড় প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। সোমবার রাতে এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এক তরুণী নাগমা খান ও তাঁর বাবা আনোয়ার খানকে শিলিগুড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁদের বাড়ি গুয়াহাটিতে। নাগমা বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী।
নাগমা ও তাঁর বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে তাঁরা এক ছাত্রীর কাছ থেকে ৫৫ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ওই ছাত্রী আন্দামানের বাসিন্দা। পুলিস জানিয়েছে, ওই ছাত্রীর দাবি, প্রথমে তাঁকে বেঙ্গালুরুর একটি মেডিক্যাল কলেজেই ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা দেওয়া হয়। পরে তাঁকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ বা বিহারের কাটিহার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা না হওয়ার পরে ওই ছাত্রী তাঁর দেওয়া টাকা ফেরত চান। তখন তাঁকে বলা হয় শিলিগুড়িতে এসে টাকা নিয়ে যেতে। সেই মতো তিনি শিলিগুড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু টাকা ফেরত না দিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। নানা ভাবে হেনস্থাও করা হচ্ছিল। বাধ্য হয়ে ওই ছাত্রী গত ২২ নভেম্বর শিলিগুড়ি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এরপরেই তদন্তে নেমে পুলিশের একটি দল গুয়াহাটিতে নাগমাদের বাড়িতে যান। সেখান থেকে তাঁরা খবর পান, নাগমারা শিলিগুড়িতেই গিয়েছেন। তারপরে পুলিশ শহরের একটি হোটেল থেকে নাগমা ও তাঁর বাবাকে গ্রেফতার করে।
মেডিক্যালে ভর্তির প্রতারণার চক্রের সঙ্গে বারবার উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নাম জড়িয়ে পড়ায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং লাগোয়া ডেন্টাল কলেজে ভুয়ো ইন্টারভিউ নিয়ে একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে অন্তত ২০ লক্ষ টাকা করে নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছিল। এমসিআই এবং মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের প্যাড এবং অধ্যক্ষের সই জাল করে ভর্তির অনুমোদনের ভুয়ো চিঠিও দেওয়া হয়েছিল প্রার্থীদের। তখন প্রশ্ন ওঠে হাসপাতাল এবং কলেজ চলাকালীন সেখানে বাইরের লোক ঢুকে কী করে ইন্টারভিউ নিলেন? ওই ঘটনায় ডেন্টাল কলেজের দুই চতুর্থ শ্রেণির কর্মীকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। তবে মেডিক্যাল কলেজ এবং ডেন্টাল কলেজের প্রশাসনের কয়েকজন উচ্চপদাসীন ব্যক্তিও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে কর্তৃপক্ষের একাংশেরই সন্দেহ। ওই ঘটনার তদন্তের ভার পুলিশ ইতিমধ্যেই সিআইডির হাতে তুলে দিয়েছে।
ফের এমবিবিএস-এ আর একটি প্রতারণা চক্রের ক্ষেত্রেও উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন কর্তৃপক্ষ। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সুপার সমীর ঘোষ রায় বলেন, ‘‘খুবই উদ্বেগজনক ঘটনা। পুলিশ তদন্ত করে দেখুক।’’
রাজ্যের স্বাস্থ্য বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান তথা শিলিগুড়ির বিধায়ক রুদ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘টাকা নিয়ে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে ভর্তির আশ্বাস যদি দেওয়া হয়ে থাকে, সেটা উদ্বেগের। বিষয়টি রাজ্যের স্বাস্থ্য বিষয়ক স্টান্ডিং কমিটির আলোচনাতে তুলব।’’ মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিধায়ক তথা উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য শঙ্কর মালাকারের দাবি, বিষয়টি বিস্তারিত তদন্ত হওয়া জরুরি।
এ দিন আদালতে তোলা হলে নাগমাকে সাত দিনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার অনুমতি দেয় আদালত। আনোয়ারকে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
সরকারি পক্ষের আইনজীবী সুদীপ রায় বসুনিয়া বলেন, ‘‘আন্দামানের ওই ছাত্রীর কাছ থেকে দফায় দফায় মোট ৫৫ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছে। কখনও নগদে, কখনও ব্যঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা দিয়েছে অভিযোগকারী। নাগমা এবং তাঁর মা নওয়াজিস খানের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ওই টাকা যে জমা হয়েছে, তার নথিপত্র রয়েছে।’’ নাগমাদের বাড়ি গুয়াহাটির কামারপট্টি রোডে ফ্যান্সিবাজার এলাকায়। ডোনেশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য ওই বাড়িতেই তাঁদের একটি সংস্থা রয়েছে। এই সংস্থাটি বেআইনি কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ওই ছাত্রীর অভিযোগ, আরও একাধিক ছাত্রছাত্রী এই চক্রের প্রতারণার শিকার। পরিচিত বন্ধুদের কাছ থেকে তিনি নাগমার ফোন নম্বর পেয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। নাগমার কথা মতোই বেঙ্গালুরুতে গিয়ে একাধিকবার টাকা দিয়ে এসেছেন। ২০১৩ সালে ভর্তি করিয়ে দিতে ৪০ লক্ষ টাকা চাওয়া হয়। ওই বছর ভর্তি করিয়ে দিতে না পারলে বলা হয় আরও টাকা লাগবে। তা হলে পরের বছর ভর্তির ব্যবস্থা হবে। সেই মতো ৬০ লক্ষ এবং পরে ৮৫ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। যার অনেকটাই তাঁরা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন।
অভিযোগকারী ছাত্রীর বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী। তিনি বলেন, ‘‘নানা ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছিল। টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছিল না।’’ নাগমার আইনজীবী চিন্ময় সরকার বলেন, ‘‘ডোনেশন দিয়ে অনেক মেডিক্যাল কলেজেই ভর্তি করানো হয়। কিন্তু ওই ছাত্রী ঠিক মতো ডোনেশনের টাকা দেয়নি। সেই সঙ্গে এন্ট্রান্স পরীক্ষাগুলিতেও সুযোগ পাচ্ছিল না। অথচ জোর করে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।’’