দিদির শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণের দাম দিতে হয়েছিল ভাই রাজীব দাসকে। বারাসাতের সেই ঘটনার ছায়া এ বার পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুরেও।
গত বুধবার সন্ধ্যায় কম্পিউটার শিখে বাড়ি ফেরার পথে বাইশ বছরের এক তরুণীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছিল স্থানীয় এক যুবকের বিরুদ্ধে। বোনের সেই অপমানের প্রতিবাদ করাতে তরুণীর দাদাকে গাছে বেঁধে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার পর অভিযুক্ত শ্যামগোপাল মাইতি ওই তরুণীর পরিবারকে হুমকিও দেয়। প্রথমে কিছুটা গুটিয়ে থাকলেও শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই তরুণী পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান। লিখিত সেই অভিযোগের বয়ান অনুযায়ী, শ্যামগোপাল তাঁর শ্লীলতাহানি করেছে। আর তার প্রতিবাদ করায় বেধড়ক মেরেছে তাঁর দাদাকেও। পুলিশ অবশ্য শনিবার পর্যন্ত শ্যামগোপালকে ধরতে পারেনি। জেলার পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া বলেন, ‘‘অভিযুক্ত পলাতক। তার খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে।’’
বারবার এই ধরনের ঘটনায় রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার নড়বড়ে দিকটাই বেআব্রু হচ্ছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। শনিবার তমলুকে দলীয় কাজে এসেছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র। ভগবানপুরের ঘটনার প্রেক্ষিতে তাঁর মন্তব্য, ‘‘রাজ্যের নানা প্রান্তে অনবরত এমন ঘটনা ঘটছে। আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছোট ঘটনা, সাজানো ঘটনা বলে সেগুলিকে লঘু করে দেখাচ্ছেন।’’
ঠিক কী হয়েছিল বুধবার?
ওই তরুণী জানিয়েছেন, বাজকুলের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ সাইকেলে ফিরছিলেন তিনি। তখনই পথ আটকায় বছর আঠাশের শ্যামগোপাল। এমনকী তাঁকে জোর করে সাইকেল থেকে নামিয়ে হাত ধরে টানাটানিও করে। তরুণীর চিৎকারে লোক জড়ো হয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে পালায় শ্যামগোপাল। তরুণী বাড়ি ফিরে সব কথা জানান তাঁর বছর সাতাশের দাদাকে। তিন মাস আগে বেঙ্গালুরু থেকে ফেরা দাদা বোনের এই অপমান সইতে পারেননি। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ শ্যামগোপালের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তরুণীর দাদা জানান, যেখানে বোনের শ্লীলতাহানি হয়েছিল, সেখানে গিয়েই দেখা মেলে শ্যামগোপালের। সঙ্গে ছিল আরও জনা কুড়ি যুবক। তরুণীর দাদার কথায়, ‘‘আমি যেতেই ওরা আমাকে ঘিরে ফেলে। তারপর গাছে বেঁধে মারতে শুরু করে শ্যামগোপাল। বাকিরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল। রাত দেড়টা পর্যন্ত আমাকে ওরা আটকে রাখে।’’
ঘটনায় জড়িয়েছে রাজনীতিও। তরুণীর দাদাকে মারধরের পর এলাকার তৃণমূল অঞ্চল সদস্য অজিত পট্টনায়কের বাড়ি নিয়ে গিয়ে মুচলেকা লেখানোরও অভিযোগ উঠেছে শ্যামগোপালের বিরুদ্ধে। সেখানে অজিতবাবু ছাড়াও ছিলেন কোটবাড়ের তৃণমূল নেতা তপন পাত্র ও এলাকার বাম নেতা কার্তিক জানা। তরুণীর দাদার কথায়, ‘‘আমাকে উপর কোনও অত্যাচার করা হয়নি বলে লিখিয়ে নেয় ওরা।’’ মুচলেকা লেখানোর কথা স্বীকার করেননি তপন ও অজিতবাবু। তবে বাম নেতা কার্তিকবাবু বলেন, ‘‘ ওই দুই তৃণমূল নেতাই আমাকে ডেকেছিলেন। ছেলেটাকে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে মুচলেকায় সইও করেছিলাম।’’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, ২০১৩ সাল থেকেই ওই তরুণীকে বারবার উত্ত্যক্ত করত শ্যামগোপাল। ভূগোল অনার্সের ওই ছাত্রী জানিয়েছেন, এর আগেও ওই যুবক তাঁর ব্যাগ, মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছিল। এমনকী রাতে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি এসে হুমকিও দিয়ে যেত। সেই সময় পুলিশে অভিযোগ জানানো হয়নি কেন? তরুণীর বাবা বলেন, ‘‘ছেলে বেঙ্গালুরুতে রান্নার কাজ করত। আমি ছাড়া বাড়িতে কোনও পুরুষ নেই। ভয়ে কাউকে কিছু বলিনি।’’