রোহিত ফেরোটেক

কারখানায় তালা, সঙ্কটে হাজার শ্রমিক

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ঠিকাদারদের সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষ নতুন চুক্তি না করায় মাস তিনেক আগে কাজ হারিয়েছিলেন হলদিয়ার রানিচকের রেণুকা সুগারস কারখানার প্রায় চারশো কর্মী।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০১৫ ০১:০১
Share:

কারখানার সামনে জটলা কর্মীদের। ছবি: আরিফ ইকবাল খান।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ঠিকাদারদের সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষ নতুন চুক্তি না করায় মাস তিনেক আগে কাজ হারিয়েছিলেন হলদিয়ার রানিচকের রেণুকা সুগারস কারখানার প্রায় চারশো কর্মী। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই অনির্দিষ্টকালের জন্য তালা ঝুলল হলদিয়ার দুর্গাচকের ভুঁইয়ারাইচকের রোহিত ফেরোটেক নামক একটি ফেরো ম্যাঙ্গানিজ তৈরির কারখানায়। কাজ হারালেন স্থায়ী, অস্থায়ী ও সাপ্লাই কর্মী মিলিয়ে প্রায় এক হাজার কর্মী।

Advertisement

বুধবার ভোরে কারখানার কর্মীরা কাজে এসে দেখেন গেটে সাসপেনসন অব ওয়ার্কের নোটিশ ঝোলানো হয়েছে। বেলা বাড়তেই দফায় দফায় কারখানার গেটের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন আইএনটিটিইউসির কর্মীরা। এদিন দুপুরে ওই কারখানার কয়েকশো কর্মী হলদিয়ার উপশ্রম কমিশনারের অফিসে এসে কারখানা বন্ধের বিষয়টি লিখিতভাবে জানান। হলদিয়ার উপশ্রম কমিশনার মিহির সরকার বলেন, ‘‘মালিকপক্ষ আমাদের না জানিয়ে কারখানায় সাসপেনসন অব ওয়ার্কের নোটিশ দিয়েছেন। এটা বেআইনি। আগামী মঙ্গলবার মালিক ও শ্রমিক পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসা হবে।’’

কী কারণে বন্ধ করা হল কারখানা?

Advertisement

কারখানার গেটে লাগানো বিজ্ঞপ্তি জানাচ্ছে, বিদ্যুতের বেশি মাসুল আর শ্রমিক কর্মচারীদের অনায্য দাবিই কারখানা বন্ধের কারণ। বিজ্ঞপ্তিতে লেখা হয়েছে, একই রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও ডিভিসির তুলনায় ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেকট্রিক ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডব্লিউবিএসইডিসিএল) বিদ্যুৎ মাসুল বেশি। ফলে যে সব কোম্পানি ডিভিসি থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে কারাখানা চালাচ্ছেন তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে রোহিত ফেরোটেক। এই নিয়ে ডব্লিউবিএসইডিসিএল-এর কর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হলেও অবস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। এই পরিস্থিতিতে কারখানার ৬টি ফার্নেসের মধ্যে দুটি ফার্নেস চালু রেখে কারখানা চালু ছিল। কোনও কর্মী ছাঁটাই ছাড়াই কর্মীদের ১৫দিন করে কাজ দিয়ে কারখানা চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু গত ২ জুন কাজের দিন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন কর্মীরা। আবার গত ১৮ জুন কোম্পানির নিজস্ব কর্মীরা বেতন বৃদ্ধির দাবি জানায়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কারখানা খুলে রাখার মতো অবস্থায় নেই কর্তৃপক্ষ। তাই অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা সাসপেনসন অব ওয়ার্ক এর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রোহিত ফেরোটেক কারখানার ৬টি ফার্নেস রয়েছে। তার মধ্যে দুটি ফার্নেস ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ আরও দু’টি। এ দিকে এবছর জানুয়ারি মাস পর্যন্ত কারখানার কর্মীরা মাসে ২৬দিন করে কাজ পেতেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তাঁদের কাজের দিন সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৫ দিনে। কাজের দিন বাড়ানো ও বকেয়া টাকা মেটানোর দাবিতে দিন কয়েক আগেই বিক্ষোভ শুরু করেন কর্মীরা। গত ২ জুনের বিক্ষোভের জেরে প্রায় ১৩ ঘণ্টা বন্ধ ছিল কারখানার উৎপাদন। তবে কর্মীদের বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার পর আন্দোলেন প্রত্যাহার করে
নেন কর্মীরা।

আর বুধবার বিনা নোটিসে এভাবে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কারখানার কর্মীরা। অরুন খিলা, স্বপন ভৌমিক, শীবরাম দাস প্রমুখের প্রশ্ন, ‘‘বিদ্যুতের দাম বেশি হলে এখানকার অন্যান্য কারখানা চলছে কি করে? আমরা চাই কারখানা চালু রেখে আমাদের কাজ দেওয়া হোক।’’ আইএনটিটিইউসি নেতা বিভাস নস্কর, যুগল মণ্ডলের কথায়, ‘‘বিদ্যুৎ মাসুল বেশি আর আর্থিক ক্ষতির কারণ দেখিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে সরকারের কাছে কারখানা চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আবেদন জানাব।’’ সামনেই ঈদ। তার আগে কারখানা বন্ধ হওয়ায় খুব সমস্যায় পড়েছেন অনেক কর্মী। কারখানার অস্থায়ী কর্মী আলি আসগরের কথায় ‘‘আমার তিন ছেলে রয়েছে। ঈদে পোশাক দূরে থাক সংসার চালানোর সমস্যা হবে। কি করব ভেবে পাচ্ছি না।’’

তমলুকের সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী বলনে, ‘‘আমি খবর পাওয়ার পর মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ওই কারখানা আভ্যন্তরীণ কিছু অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সাময়িক সাসপেনসন অব ওয়ার্কের নোটিশ দিয়েছে। আশা করি শীঘ্রই তারা সেই সমস্যা কাটিয়ে কারখানা চালু করবে।’’ তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ যে বিদ্যুৎ মাসুলের সমস্যার কথা তুলেছে সে বিষয়ে অবশ্য শুভেন্দুবাবু কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

প্রসঙ্গত, গত বছর জুলাই মাসে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণ দেখিয়ে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কারখানা চালু হয়েছে। গত বছর নভেম্বর মাসে স্থায়ী কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের জেরে হলদিয়ার দুর্গাচকের ঝিকুরখালির মোনাক্সিয়া লিমিটেড নামে অ্যালুমিনিয়াম তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। মাস তিনেক পরে ওই কারখানা চালু হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ছাঁটাইয়ের অভিযোগ তুলে লালবাবা সিমলেস টিউবস প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি পাইপ তৈরির কারখানার কর্মীরা আন্দোলনে নামেন। ফলে কয়েকদিন সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সে সময় প্রায় ৩০জন কর্মীকে ছাটাই করে কারখানা চালু রয়েছে। ১ এপ্রিল চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ঠিকাদার সঙ্গে নতুন করে চুক্তি না করায় হলদিয়ার রানিচকের রেণুকা সুগারস নামক চিনি কারখানার প্রায় ৪০০কর্মী কাজ হারান।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement