প্রথমে বিডিও অফিসে ভাঙচুর, পুলিশ ও বিডিওকে মারধরের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তৃণমূলের পঞ্চায়েত উপ-প্রধান। তারপর সদলবলে অস্ত্র-সহ ধরা পড়েও পালালেন। পুলিশ এখনও খুঁজছে।
অথচ মঙ্গলবার সেই উপপ্রধানই দাবি করলেন তিনি নাকি দফতরে বসে কাজ করছেন। ভোট ঘোষণার পর সর্বত্র জমে থাকা গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করার নির্দেশ থাকেই। সেখানে অস্ত্র আইনে একজনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হওয়ার পরেও কেন গ্রেফতার করতে পারছে না পুলিশ? উত্তর নেই। জেলার পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া বলেন, “নান্টুর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে আমরা ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছি। এলাকায় কিছু লোক নান্টুকে আশ্রয় দিচ্ছে। পুলিশ ঢুকলেই পালাচ্ছে। তাই গ্রেফতার করতে দেরি হচ্ছে। তবে দ্রুত গ্রেফতার করা হবে।”
এ দিকে মহম্মদপুর-১ পঞ্চায়েতের উপপ্রধান নান্টু প্রধান এ দিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “পুলিশ ধরতে পারলে ধরুক। দলের নেতারা আমার পাশে থাকেন কিনা আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করে দেখবো। না-হলে ভোটের আগে আদালতে আত্মসমর্পণ করব। দেখব আমার এলাকা থেকে কত ভোট পায় দল।”
শোনা যাচ্ছিল ফোন নম্বর বদলে বদলে ঘনিষ্ট মহলে যোগাযোগ রাখছেন নান্টু। মঙ্গলবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘মানুষ পাশে রয়েছেন, থানার পুলিশ বা কেন্দ্রীয় বাহিনীর পক্ষে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়।’’ এর আগে পুলিশ অবশ্য দাবি করেছিল নান্টু ও তাঁর ভাই পিন্টু প্রধান-সহ তাঁদের সঙ্গীরা পলাতক। তবে স্থানীয় গোয়ালপুকুর বাজার ও সংলগ্ন এলাকায় তিনি যে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন তা বেশ বোঝা গেল।
২ মার্চ ভগবানপুর-১ ব্লকে স্মারকলিপি দিতে প্রশাসনিক কার্যালয়ে ভাঙচুর চালান এক দল মানুষ, নেতৃত্বে ছিলেন নান্টু। প্রহৃত হন বিডিও-সহ সরকারি কর্মীরা। ঘটনায় বিডিও এফআইআর করেন। গাড়ি ভাঙাচুর ও পুলিশ পেটানোর অভিযোগে পৃথক মামলা দায়ের করে পুলিশও। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ধরা পড়েননি নান্টু। ৮মার্চ পটাশপুর থানার পুলিশ নান্টু প্রধানের ভাই পিন্টু-সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ডাকাতির উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া এবং অস্ত্র আইনে মামলা রুজু করে। ওই রাতে পটাশপুর থানার ছোট উদয়পুর থেকে আটক করা হয় একটি গাড়ি এবং একটি অ্যাম্বুল্যান্স। গ্রেফতার করা হয় ভগবানপুর থানার মহম্মদপুর গ্রামের কনক মণ্ডল, কানাই দাস, সেকবাড় গ্রামের খোকন পাল ও মৃণাল সামন্ত এবং সবং থানার নিমকি মোহাড় গ্রামের বলরাম বেরা ও কৃষ্ণপ্রসাদ বেরাকে। তাদের কাছে একটি পিস্তল ও দু’রাউন্ড গুলি, ভোজালি ও লোহার রড পাওয়া যায়। জেরায় ধৃতেরা জানায় পটাশপুরের কালীরবাজারে একটি সোনার দোকানে ডাকাতি করাতে বেরিয়েছিল তারা।
কিন্তু মঙ্গলবার নান্টু বলেছেন, ‘‘কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করি। ডাকাতি করতে যাব কোন দুঃখে?’’ বরং তির দাবি, ৮ মার্চ রাতে তিনি কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে কাঁথিতে জেলা সভাপতি শিশির অধিকারীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। মহম্মদপুরে ফেরার পথে হেড়িয়ার কাছে পুলিশ গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করে। তিনি কোনওরকমে পালিয়ে গেলেও পুলিশ কয়েকজনকে ধরে ফেলে। পালানোর সময় আহত তিনজনকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য ওই অ্যাম্বুল্যাস আসে। নান্টু আবার তুলে ধরেছেন গোষ্ঠী কোন্দলের বিষয়টিও। তাঁর কথায়, “সে রাতে যে জেলা সভাপতির কাছ থেকে ফিরছি, খবরটা দলের লোকই দিয়েছিল পুলিশকে।”
এ বিষয়ে শিশির অধিকারী অবশ্য বলেছেন, “গণবিবাহের অনুষ্ঠানে নান্টুর সঙ্গে আমার শেষবার দেখা হয়েছিল। আর হয়নি। ও কেন এমন বলছে আমি জানি না।” চণ্ডীপুরের বিধায়ক অমিয়কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, “ঘটনাটির সঙ্গে দলীয় রাজনীতি বা দ্বন্দ্বের কোনও সম্পর্ক নেই। নান্টু না থাকলেও দলীয় কর্মীরা তার অভাব পূরণ করবেন।”
এ দিকে নান্টু যে পঞ্চায়েতে কাজ করছেন তা স্পষ্ট স্বীকার করেছেন মহম্মদপুর-১ পঞ্চায়েত প্রধান ও নান্টুর স্ত্রী অপর্ণা প্রধান। তিনি বলেন, “সোম ও মঙ্গলবার দু’দিনই পঞ্চায়েতে থেকে কিছু কাজ করেছেন উপপ্রধান।’’ তাঁর অভিযোগ, তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। অপর্ণাদেবীর জানিয়েছেন, আগাম জামিনের আবেদন জানিয়েছেন নান্টু।
অর্থাৎ, নান্টু এগোচ্ছেন আত্মসমর্পণের পথেই। পুলিশের খাতায় পলাতক নান্টু প্রধান দু’দিন ধরে পঞ্চায়েতে কাজ করছেন। পঞ্চায়েত বা ব্লক প্রশাসনের কর্মীরা কেন পুলিশকে খবর দিচ্ছেন না? পঞ্চায়েতের কর্মীরা মন্তব্য করতে চাননি। মুখে কুলুপ পঞ্চায়েতের সচিব তপন জানারও।
এ দিকে যে বিডিও-কে পিটিয়ে পুলিশের খাতায় নাম তুলেছিলেন নান্টু, সেই ভগবানপুর ১ ব্লকের বিডিও পরিতোষ মজুমদারও বেশি কথা বলতে চাননি। “এই দু’দিন পঞ্চায়েত খুলেছে। কর্মীরা ওখানেই কাজ করেছেন। আমি আর কিছু বলব না”, বলেই ফোন কেটে দেন বিডিও। তারপর থেকে আর যোগাযোগ করা যায়নি তাঁর সঙ্গে।