সাংবাদিক বৈঠকের পথে তপন দত্ত (বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয়)।
রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন করে গোঁজ প্রার্থীর ঘোষণা। সরাসরি দলনেত্রীর মতের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে ব্লক সভাপতি জানিয়ে দিলেন তিনিই প্রার্থী হবেন। তৃণমূলের আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুর এমন ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকল।
তৃণমূল প্রার্থী তালিকা প্রকাশের আগেই দাসপুর কেন্দ্রে মমতা ভুঁইয়ার নামে দেওয়াল লেখা শুরু হয়েছিল। তাতেই প্রকাশ হয়েছিল দলের ভিতরের কোন্দল। কালীঘাট থেকে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তালিকা প্রকাশের পরই সে কোন্দল একেবারে নগ্ন হয়ে পড়েছে। জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই প্রার্থী বদলের দাবিতে স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশ তৃণমূল ভবনে ফ্যাক্সও করেছেন। কিন্তু রাজ্য নেতৃত্বের তরফে আশা ব্যঞ্জক উত্তর পাননি মমতা ভুঁইয়ার বিরোধীরা।
বুধবার দাসপুর ২ ব্লকের সদর শহর সোনাখালিতে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে দলের ব্লক সভাপতি তপন দত্ত দাবি করেন, “আমি এ বার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। আগামী ১৫ মার্চ দলীয় প্রার্থী হিসাবেই মনোনয়ন পত্র জমা দেব।’’ তবে তিনি এ কথাও জানাতে ভোলেননি, ‘‘যদি দলের টিকিট না পাই, তবে নির্দল প্রার্থী হিসাবেই লড়ব।”
দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে চর্চা চলছিল। এ দিন বিক্ষুদ্ধ গোষ্ঠী তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিল। স্বভবতঃই উদ্বেগে দলীয় নেতারা। তবে একেবারে প্রথম থেকেই দাসপুর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী বদল নিয়ে এক গোষ্ঠী সরব ছিল। সে কথা অজানা নয় রাজ্য নেতাদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের জেলার কোর কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, “রাজ্য নেতৃত্বের একটি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর এতে পরোক্ষ মদতও রয়েছে।’’ বলা বাহুল্য তেমনটা না-হলে তপন দত্ত ও তাঁর অনুগামীরা দলের বিরুদ্ধে এত বড় সাহসী পদক্ষেপ করতে পারতেন না।
২০১১ সালে পরিবর্তনের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী অজিত ভুঁইয়া। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর ২০১২ সালে উপ-নিবার্চনে প্রার্থী করা হয় অজিতবাবুর স্ত্রী মমতা ভুঁইয়াকে। যদিও সে সময় থেকেই দাসপুর ২ ব্লক নেতৃত্ব তাঁদের ব্লক থেকেই কাউকে প্রার্থী করার জন্য সরব। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্যের একাধিক প্রথম সারির নেতা একাধিকবার দাসপুরে এসেছেন।
দলেরই একটি সূত্রের খবর, এ বারেও আগেভাগেই দাসপুর ২ ব্লক থেকে প্রার্থী করার দাবি ছিল প্রবল। স্থানীয় নেতৃত্ব লিখিতভাবে তৃণমূল ভবনে আর্জিও জানিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু লাভ হয়নি।
পশ্চিম মেদিনীপুরে সব কেন্দ্রেই ভোট হয়ে যাবে দ্বিতীয় দফায়। স্বাভাবিক ভাবেই তালিকা প্রকাশের পর সর্বত্রই দেওয়াল লিখন চলছে, শুরু হয়েছে প্রচার-প্রস্তুতি। প্রার্থী তালিকা নিয়ে কমবেশি সব জায়গাতেই ক্ষোভ রয়েছে তৃণমূলের অন্দরে। কিন্তু দেওয়াল লিখনে বা ভোট প্রস্তুতিতে তার তেমন প্রভাব পড়েনি।
দাসপুরের ছবিটা আলাদা। সোমবার থেকে অবশ্য বিক্ষিপ্তভাবে দাসপুর ২ ব্লকে দেওয়াল লিখন শুরু হয়েছে। তবে সেখানে প্রার্থীর নামের উল্লেখ নেই। তেমনটাই যে হবে তা সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়েও দিয়েছেন তপনবাবু। তিনি বলেছেন, ১৩ মার্চ পর্যন্ত দল যদি প্রার্থী বদল না-করে তবে ১৫ মার্চ তিনি মনোনয়ন পেশ করবেন। দল তা অনুমোদন না করলে তখন নির্দল হিসাবে লড়বেন। তাই আপাতত দেওয়াল লিখনে প্রার্থীর নাম না-রেখে শুধু তৃণমূলকে সমর্থনের আবেদন করছেন তাঁরা। এ দিকে শোনা যাচ্ছে প্রার্থী বদল নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে দাসপুর ২ ব্লক নেতৃত্বের মধ্যও। এই দোলাচলে দিশেহারা দলের সাধারণ কর্মীরা।
স্বাভাবিকভাবেই এই কোন্দলকে কাজে লাগাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বাম জোট। দাসপুর কেন্দ্রে এখনও বাম-জোট প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়নি। তবে সিপিএম সূত্রের খবর, এই কেন্দ্র থেকে এ বার রাজ্য স্তরের কোনও মহিলা নেত্রীকে প্রার্থী করা হতে পারে।
দাসপুর বিধানসভার অন্তর্গত দাসপুর ১ ব্লকে ১০ টি এবং দাসপুর ২ ব্লকে ১৪টি পঞ্চায়েত। কিন্তু দাসপুর ১ ব্লকে ১০টি পঞ্চায়েতের চারটি ঘাটাল ও চন্দ্রকোনা বিধানসভার অধীন। স্বাভাবিকভাবেই এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীর জয়ের ভরসা দাসপুর ২ ব্লক।
তথ্য বলছে, দাসপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটার ২লক্ষ ৭৩ হাজার ৬৯৫। তারমধ্যে দাসপুর ১ ব্লকে মোট ভোটার ৮৭ হাজার ৭৩৯। বাকিটা দাসপুর ২-এর। গত বিধানসভা উপ-নিবার্চনে মমতা ভুঁইয়া ১৭ হাজারের কিছু বেশি ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। দাসপুর ২ ব্লকেই তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল ১২ হাজার। গত লোকসভা ভোটেও দাসপুর বিধানসভা কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থী দীপক অধিকারী (দেব) ৩৭ হাজার ভোটে এগিয়েছিলেন। দাসপুর ২ ব্লকেই তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ২৭ হাজার। ফলে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন দলের উপর তলার নেতারাও।
জেলার এক নেতা আশঙ্কা লুকিয়ে রাখেননি, “দাসপুরে গোঁজ প্রার্থী দাঁড়ালে এই কেন্দ্রটি যে দলের হাতছাড়া হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।” দলের ওই ব্লকের যুব সভাপতি সৌমিত্র সিংহরায় বলেন, “দাসপুর ২ ব্লক প্রথম থেকেই বঞ্চিত। উন্নয়নও হয়নি। রাজ্যকে জানিয়েও ছিলাম। সে দাবি মান্যতা পায়নি। তাই এই সিদ্ধান্ত।” যদিও দাসপুর ১ ব্লক সভাপতি সুকুমার পাত্র দাবি করেছেন, ‘‘কোথাও অশান্তি নে ই। দুই ব্লকের নেতা-কর্মীরা মিলেই চলছে ভোটের প্রস্তুতি।’’
ছবি: কৌশিক সাঁতরা।