গোলবাজারে প্রভাতী সঙ্ঘের আড্ডা। ইনসেটে, ভেটেরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ঘর। ছবি: রামপ্রসাদ সাউ।
জন্মদিন, দোল, পত্রিকা বেঁচে থাকার রসদ জোগায় নিজস্ব সংবাদদাতা, খড়্গপুর: সম্পৎ কুণ্ডু, অনাদি মুখোপাধ্যায়, তিমিরবরণ আচার্য, স্বপন দাশগুপ্ত, সঞ্জয় চৌধুরী। পেশাগত দিক থেকে এই প্রতিটি নামের আগেই রয়েছে অবসরপ্রাপ্তের তকমা। যদিও একসময়ে তাঁদের হাতেই চলেছে রেল, জ্বলেছে আলো, শিক্ষিত হয়েছেন বহু নবীন। অথচ সেই নবীনদের অনেকের কাছেই এখন তাঁরা ব্রাত্য।
তাতে কী? সে সব ভুলে জীবনের বাকি সময়টা নতুন করে উপভোগ করতে চাইছেন ওরা প্রত্যেকেই। আর তাই নিজেদের উদ্যোগে তাঁরা গড়ে তুলেছেন একাধিক সংগঠন। উদ্দেশ্য একটাই, শহরের যান্ত্রিকতায় নিজেদের না পাওয়া ভুলে বাঁচার লড়াই চালানো। রেলের গতিশীলতার সঙ্গে বসতি বেড়েছে এই শহরের। তবু পরিকাঠামোগত অভাব, স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল দশা, নিরাপত্তার অভাবে দিশেহারা শহরের বয়োঃজ্যেষ্ঠরা।
‘অবসর’, ‘প্রভাতী সঙ্ঘ’, ‘ভেটেরেন্স অ্যাসোশিয়েশন’-এর মতো একাধিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন প্রবীণরা। পাশাপাশি হাঁটা, আর একটু কুশল বিনিময় থেকেই এদের জন্ম। আর সেই সময়টুকুই জোগায় ‘অক্সিজেন’। তবু সমস্যা পিছু ছাড়ে না।
বছর পঁচিশ আগে রামমন্দিরে রেলের প্রাক্তন খেলোয়াড় কিশোরীলাল মিশ্র, দুর্গা রাও, মিন্টু চৌধুরী, হরভজন সিংহ, এ কে পানি, কেভি রামনা রাওরা তৈরি করেছিলেন ‘রেলওয়ে ভেটেরেন্স ক্লাব’। সেরসা স্টেডিয়ামে সারা বছর নানা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করত এই সংগঠন। এখন অবশ্য অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। মারা গিয়েছেন ক্লাবের বহু সদস্যও। এক সময়ের সাংগঠনিক সম্পাদক বছর বাহাত্তরের মিন্টু চৌধুরী বলেন, “সদ্য অবসরগ্রহণের পরে আমাদের মতো রেলের খেলোয়াড়েরা বহু উৎসাহ নিয়ে এই ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিল। তখন ক্লাবের রমরমা ছিল নজরকাড়া। কিন্তু হরভজন সিংহের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরে সবাই ভেঙে পড়েছিল। তার পর একে একে সক্রিয় কর্মকর্তাদের সকলেরই প্রায় মৃত্যু হয়। নবীনেরাও আর ধরে রাখার চেষ্টা করেনি।’’
তবু লড়ে যাচ্ছেন অনেকেই। যেমন ১৯৮৮সালে মন্টু রায়, রবি গুপ্ত, প্রয়াত অবিনাশ দেবনাথ, সুনীল দাসদের উদ্যোগে ‘খড়্গপুর ভেটেরেন্স অ্যাসোশিয়েশন’ গড়ে উঠেছিল। তখন নিজেদের কোনও আস্তানা ছিল না। সুভাষপল্লি বিএনআর ময়দানের মাঝে একটি পরিত্যক্ত লাল রঙের ক্রিকেট প্যাভেলিয়নেই সংগঠনের বৈঠক হত। বিজয়া সম্মিলনী, স্বাধীনতা দিবস, বছরে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। বছর পনেরো আগে বিএনআর ময়দানের ধারে একটি ভবন নির্মাণের সঙ্গেই বহর বেড়েছে ক্লাবের। শহরে এটিই একমাত্র সংগঠন, যেখানে মহিলা সদস্য রয়েছেন। প্রতি বৃহস্পতিবার সংগঠনের মহিলা সদস্যরা যোগদেন পুজাপাঠে। ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও করেন তাঁরা। বর্তমানে এই সংগঠনে প্রায় একশো সদস্য।
ভেটেরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলো সিংহ। যখন আদতে বৃদ্ধ ছিলেন না আলোবাবু, তখনও ছিলেন এই ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক। আর আজ সেই সংগঠনেরই সদস্য হয়ে তাঁর উপলব্ধি, ‘‘পাড়ার কাকু-জেঠুদের উদ্যোগে গড়ে তোলা ক্লাবকে সাহায্য করতাম তখনও। এখন এখানেই নিজের বার্ধক্যকালীন সমস্যাগুলো ভুলে একটা পরিবারে আনন্দে কাটাই। প্রত্যেকে একে-অপরের পাশে দাঁড়াই।’’ আলোবাবু কিন্তু জানাতে কুণ্ঠা বোধ করেন না যে অর্থাভাব একটা সমস্যা। সরকারি অনুমোদন সত্ত্বেও কোনও সরকারি সাহায্য পায় না শহরে সাড়া জাগানো এই সংগঠন।
বছর পনেরো আগে শহরের গোলবাজার সমবায় সমিতি সংলগ্ন এলাকায় রেল কোয়ার্টারের সামনে চায়ের আসর বসত প্রবীণদের। তিমিরবরণ আচার্য, শঙ্কর দেবমণ্ডল, ব্যাস হাজরা, প্রয়াত ননীগোপাল সাহারা নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণের পর আড্ডা দিতেন। তাঁরাই এখন ‘প্রভাতী সঙ্ঘ’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। সকাল ৭টায় সেই একই জায়গায় জড়ো হন সদস্যরা। রাজনীতি, সংস্কৃতি থেকে ঘরের কথা— সবই চলে। চলে নিয়মিত স্বাধীনতা দিবস, রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন। বছরে একবার জেলার বাইরে পিকনিকের আয়োজনও হয়। এই সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী অশীতিপর তিমিরবরণ আচার্য বলেন, “আমাদের সকালের এই আসরে ব্যবসায়ী, অধ্যাপক থেকে রেলকর্মী সকলেই রয়েছেন। অনেক নবীনও এসে আড্ডায় যোগ দেন। আসেন পুরপ্রধানও। রাজনীতির রঙ নেই। তাই সব দলের নেতা-সদস্যরাও আসেন।’’ প্রভাতী সঙ্ঘের সমস্যা বসার জায়গার অভাব। বৃষ্টি বাদলে তাই খুব মন খারাপ তাঁদের।
গত দশবছরেই শহরে সাড়া জাগিয়েছে ‘অবসর’। ইন্দার কমলা কেবিন সংলগ্ন শরৎপল্লি এলাকার প্রবীণদের এই সংগঠন। মোট ২০জন সদস্যের ১৭জনই অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী। একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ও একজন বেসরকারি সংস্থার কর্মী ছিলেন। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা ও সন্ধ্যে ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত সদস্যদের আসর জমে ওঠে। সারাবছর প্রতিটি সদস্যের জন্মদিন পালন করেন অন্যরা। সে এক আলাদা অনুভব, প্রায় সমস্বরে জানালেন সব সদস্য। পিকনিক, ১৫অগস্ট, ২৩ ও ২৬জানুয়ারি তো আছেই। তবে সাদা-কালো বার্ধক্যেও তাঁরা মেতে ওঠেন রঙিন নগর কীর্তনে, দোলের দিন। প্রতিবছর মহালয়ায় প্রকাশিত হয় ‘অবসর’। শুধু সদস্যরা নন, লেখা দিতে পারেন শহরের যে কোনও বয়োঃজ্যেষ্ঠ। পত্রিকার সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী সম্পৎ কুণ্ডু বলেন, “হয়তো খুব উৎকৃষ্টমানের লেখা উঠে আসে না। কিন্তু মনের কথা খোলাখুলি বলার একটা জায়গা আমাদের অবসর পত্রিকা।” সংগঠনের সম্পাদক বেসরকারি সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী বিভাস হোড় বলেন, “জীবনের শেষ সিঁড়িতে পৌঁছে বাঁচার জন্য একটু চেষ্টা করি আমরা। নিজেদের বসার জায়গা নেই। তাই সরকারি জায়গায় বসি। তবে পাকাপাকি বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছি। সরকারি কিছু সাহায্য পেলে ভাল হয়।”
শুধু প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাব-সংগঠন নয়, তালবাগিচা, সুভাষপল্লি, মালঞ্চ এলাকায় প্রবীণদের জমায়েত দেখা যায় সকাল-সন্ধ্যায়। তবু রেলশহরে এখনও সরকারি উদ্যোগ নেই প্রবীণদের জন্য। তাই সবটাই রাস্তার ধারে। এমনকী প্রবীণদের শরীরচর্চা করার জন্য একটি ভাল মাঠও নেই। গোটা শহরে একমাত্র ১১নম্বর ওয়ার্ডের একটি পার্ক আছে। তারও বেহাল দশা।
পুরপ্রধান প্রদীপ সরকার অবশ্য বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে প্রবীণদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। তাঁদের আড্ডায় যাই। আমি চাই সমস্ত ওয়ার্ড এই বিনোদনের পার্ক হোক।’’ তাঁর দাবি, ২০ নম্বর ওয়ার্ডে পার্ক তৈরি করছেন তিনি।
কেমন লাগছে আমার শহর? নিজের শহর নিয়ে আরও কিছু বলার থাকলে আমাদের জানান। district@abp.in-এ। subject-এ লিখুন ‘আমার শহর খড়্গপুর’। ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানান: www.facebook.com/anandabazar.abp অথবা চিঠি পাঠান ‘আমার শহর’, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর বিভাগ, জেলা দফতর, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০১ ঠিকানায়।