ধান কেনার রসিদ। নিজস্ব চিত্র।
এলাকার ২ নম্বর ব্লকের পচেট গ্রামের চাষি প্রফুল্ল মাইতি সরকারিভাবে ২৭ কুইন্ট্যাল ধান বিক্রি করে চেক পেয়েছেন। তবে ধান কেনার জন্য সরকারিভাবে খড়াই বাজারে খোলা ‘ডিমান্ড পারচেজিং ক্যাম্প’-এ তিনি ধান দিয়েছেন মাত্র তিন কুইন্ট্যাল। বাকি ২৪ কুইন্ট্যাল দিয়েছেন এক ধান ব্যবসায়ীর ধানগোলায়। পেয়েছেন তার রসিদও। দুর্নীতির এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে ইদানীং তাতে মিশেছে নগ্ন রাজনীতি। কারণ যে ব্যবসায়ীর গোলায় ঢুকেছে সিংহভাগ ধান তিনি নিজে একটি গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান।
তৃণমূল পরিচালিত পচেট গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান দুর্গাপদ পাহা়ড়ির বিরুদ্ধে সরব শুধু চাষিরা নন। দলের ভিতরেই তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ। তৃণমূলের অনেকেই অভিযোগ করছেন, ধান কেনার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি রয়েছে। ক্যাম্প করে ধান কেনার ব্যবস্থা করে চাষিদের নানা অজুহাতে বিপাকে ফেলা হচ্ছে। ঘুরপথে ধান কিনছেন ফড়েরাই। অভিযোগ উঠেছে চাষিদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করা ও কুইন্ট্যাল প্রতি চার থেকে আট কেজি বেশি ধান নেওয়ারও। দলীয়ভাবেই বিষয়টি জানানো হয়েছে রাজ্যের সমবায় মন্ত্রী জ্যোতির্ময় করকে। মন্ত্রী নিজেই স্থানীয় বিধায়ক। তিনি বলেন, “এমনটা হওয়ার কথা নয়। আমি দেখছি।”
দুর্গাপদবাবুর দাবি, তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছেন খোদ পূর্ব মেদিনীপুর জেলা খাদ্য নিয়ামক প্রণয় কুমার গোস্বামী। যদিও এ বিষয়ে প্রণয়বাবুকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। প্রশাসন সূত্রের খবর, পচেট ও খাড় গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ব্লকের জন্য নির্দিষ্ট ইটাবেড়িয়ার কিষাণ মান্ডির দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। সে কারণে এই দুই পঞ্চায়েতের জন্য খড়াই বাজারে ওই ক্যাম্প খোলা হয় ২১ ডিসেম্বর। এখনও পর্যন্ত ৮৭০ জন চাষির কাছ থেকে ১৫ হাজার কুইন্ট্যাল ধান কেনা হয়েছে বলে প্রশাসন দাবি করেছে। অভিযোগ, বিভিন্ন বুথ এলাকা থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে দিনে চারশো কুইন্ট্যাল ধান কেনার কথা থাকলেও সে নিয়ম মানা হচ্ছে না। দলের তরফেই অভিযোগ করা হচ্ছে, এর মধ্যেও রয়েছে দলের ভিতরের দ্বন্দ্ব। দুর্গাপদবাবুর নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
কেমন করে ঠাকনো হচ্ছে চাষিদের? স্থানীয় চাষি টোকন দাস বলেন, “দু’বার গিয়েছি ধান বিক্রির জন্য। কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে পড়ে রয়েছে বিক্রয়যোগ্য ২৫ কুইন্ট্যাল ধান। দু’মাস বস্তা বন্দি থাকার পরেও বলছে ধান ভেজা আছে। এটা কি সম্ভব? আর এই অজুহাতে কুইন্ট্যাল প্রতি আট কেজি করে বেশি ধান চাইছে।” একই অভিজ্ঞতা যুগল নায়ক, গৌরহরি দাস, ছবিরানি কুণ্ডুদের। উপায়ান্তর না দেখে অতিরিক্ত ধান দিয়ে তবে ধান বিক্রি করেছেন তাঁরা। অপর এক চাষি বরুণ দাস বলেন, “চার বিঘা জমির ধান আলাদভাবে নিয়ে গিয়েছিলাম আমি আর বাবা। আমার ধান নিল কিন্তু বাবার ধান নিল না ভিজে অজুহাতে। দোকানের দেনা মেটাতে বাধ্য হয়ে বাবা কুইন্ট্যালে প্রায় চারশো টাকা কম দরে ফড়ের কাছে ধান বিক্রি করেন।” তৃণমূল কর্মী দিলীপ পাত্রের অভিজ্ঞতা আবার পৃথক। তিনি বলেন, “আমার ধানও নিতে চাইছিল না। এলাকার এক নেতার নাম বলতেই নিয়ে নিল।”
ক্যাম্পে ধান বিক্রি করেছেন এমন চাষিদের অভিযোগ, চাষি পিছু অতিরিক্ত কুড়ি টাকা করে নেওয়া হচ্ছে অফিস খরচের নাম করে। পচেটের এক ফড়ে শক্তিনাথ পণ্ডা নিজেই জানান, তিনি নিজে এ পর্যন্ত ছ’শো কুইন্ট্যাল ধান কিনেছেন। আর চাষি হিসাবে ক্যাম্পে বিক্রি করেছেন ৩০ কুইন্ট্যাল ধান। ওই ক্যাম্পের পারচেজিং অফিসার তথা খাদ্য সরবরাহ দফতরের আধিকারিক কল্লোল দে অতিরিক্ত ধান নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর যুক্তি, ‘‘ধানের মান খারাপ থাকায় চাল কলের মালিকরা দাবি করছেন বেশি ধান না পেলে তারা লাভ পাবেন না। মালিক ও চাষি উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়েই অতিরিক্ত ধান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা দফতর।”
দুর্গাপদবাবু জেলা ধান ব্যবসায়ী সমিতির জেলা কমিটির সদস্য। তিনি কিন্তু স্পষ্ট বলেছেন, “অতিরিক্ত ধান ও টাকা নেওয়া হচ্ছে বাধ্য হয়েই। যে জমিতে ধান কেনা বেচা চলছে তার ভাড়া, কুপন, কাজের দেখভালের জন্য থাকা কর্মীর পারিশ্রমিক ও অন্যান্য খরচ সরকার দিচ্ছে না। তাই ওই বাবদ টাকা নেওয়া হচ্ছে।” তৃণমূলের স্থানীয় অঞ্চল সভাপতি নীলমাধব দাস অধিকারীর অভিযোগ, “প্রধান ও সংশ্লিষ্টদের অন্ধকারে রেখে পঞ্চায়েতের সিল ব্যবহার করে উপপ্রধান নিয়ম বহির্ভূতভাবে কুপন দিচ্ছেন। ক্যাম্পে ধান কেনার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি চলছে।” জেলা স্তরের এক নেতা বলেন, “ক্যাম্প পরিচালন ব্যবস্থার সঙ্গে ফড়েদের ঘুরপথে বোঝাপড়া রয়েছে। ফলে নানা অজুহাতে চাষিদের ফেরানো হচ্ছে। চাষিরা ফড়েদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।