তৃণমূল কর্মী দয়াময় সাহা খুনে প্রতিবেশি যে দুই বন্ধুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, বুধবার বিকেলে তাঁদের গ্রেফতার করল পুলিশ। পুলিশের দাবি, জেরাই ওই দুই যুবক স্বীকার করেছে, ঘটনা ঘটার আগে নিজেদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। সে সময় বন্ধুকে রাগের মাথায় ‘গুলি করে’ তারাই খুন করেছে। এবং গভীর রাতে বাঁশে বেঁধে নদীর চরে নিয়ে গিয়ে দয়াময়কে পুঁতে দেয় তারাই।
সোমবার সন্ধ্যায় নদীর বালিতে পুঁতে রাখা অবস্থায় দয়াময় সাহা নামে এক তৃণমূল কর্মীর দেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। পুরন্দরপুর পঞ্চায়েত এলাকা নিজুরি গ্রামের বাসিন্দা ওই যুবকের দেহটি উদ্ধার হয় গ্রামের অদূরে বক্রেশ্বর নদের চরে। রবিবার সিউড়ি ২ ব্লকে অনুব্রতর সভায় যোগ দিতে গিয়েছিলেন প্রতিবেশি দুই বন্ধুর সঙ্গে। সেদিন আর বাড়ি ফেরেননি দয়াময়। পরদিনই নদীর চরে তাঁর দেহ উদ্ধার হয় একেবারে উলঙ্গ অবস্থায়। তাঁর মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্নও ছিল। দয়াময়ের পরিবার অভিযোগ করেছিল, উত্তম মণ্ডল (রাজু) ও ফাল্গুনি চট্টোপাধ্যায় (বাবু)— দয়ার এই দুই বন্ধুই ঘটনার পিছনে রয়েছে।
পুলিশ মঙ্গলবার দুই বন্ধুর একজনের সোয়েটারে রক্তের দাগ দেখে। ঘর থেকে উদ্ধার হয় রক্তের দাগযুক্ত তোষক ও চটও। পুলিশের অনুমান, খুন করে বাড়িতেই কিছুক্ষণ ফেলে রাখার হয় বন্ধুর দেহ। সেখান থেকে তুলে নিয়ে নদীর চরে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। মঙ্গলবার অভিযুক্ত উত্তম মণ্ডল ওরফে রাজু এবং ফাল্গুনি চট্টোপাধ্যায় ওরফে বাবুর কোনও হদিশ পুলিশ পায়নি। জিনিস উদ্ধারের পর উত্তম মণ্ডলের বাড়ি সিল করে দেয় পুলিশ।
ঘটনা হল, সোমবার সকালেও ওই দুই বন্ধু রাজু ও বাবু বাড়িতে থাকলেও দেহ উদ্ধার হওয়ার আগেই তাঁরা গা ঢাকা দেয়। তাতে মৃতের পরিবারের সন্দেহ বাড়ে। ওই দুজনের বিরুদ্ধে নিহত দয়ময়ের মামা দিলীপ সাহা সোমবার রাতে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পরই পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ছিল। কিন্তু অভিযুক্তদের খোঁজ পায়নি। মঙ্গলবার দুপুরে উত্তম মণ্ডলের বাড়ি তল্লাসি করার সময়ই পুলিশ রক্তের দাগ যুক্ত পোষাক ও তোষক উদ্ধার করার পরই খুনের সঙ্গে অভিযুক্তদের যোগসূত্র মেলে।
এ দিকে মঙ্গলবারও দেহ পরিবারের হাতে পৌঁছয়নি। দেহটি সোমবার সিউড়ি সদর হাসপাতালে ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হলেও মঙ্গলবার সিউড়িতে তা না করে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে পাঠানো হয়। বুধবার সেখানেই ময়নাতদন্ত হয়েছে। এবং বুধবার বর্ধমান থেকে দয়াময়ের দেহ ফেরে বাড়িতে। দয়াময়ের মা রেখা সাহা সোমবার জানিয়েছিলেন, ‘‘রাত সাড়ে নটা নাগাদ আমাকে ছেলে জানিয়েছিল বাড়িতে খাব না। খেয়ে ফিরছি। রাজুরা সঙ্গে রয়েছে। যখন শুনলাম ওরা ফিরছে তাই আর চিন্তা করিনি। কিন্তু এভাবে যে ছেলেকে শেষ করে দেবে তা কে জানত!’’
ফাল্গুনির বাড়ি নিজুরি গ্রামে দয়াময়দের বাড়ির ঠিক পাশেই। ফাল্গুনির বাড়িতে ফাল্গুনি ও তাঁর বিধবা মা বাণী চট্টোপাধ্যায় থাকেন। অন্যদিকে সমান্য দূরেই উত্তমদের বাড়ি। আছেন মা, বাবা ও ভাই। বিবাহিত হলেও বেশ কিছুদিন উত্তমের স্ত্রী ও দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়িতে। উত্তম তাঁদের বাড়ির ঠিক পাশেই একটি নতুন বাড়িতে থাকেন। সেখান থেকেই রক্তমাখা পোশাক ও তোষক উদ্ধার করেছে পুলিশ। পড়শি যুবক খুনে তাঁদের ছেলেদের নাম জড়িয়েছে শুনে প্রথম থেকেই অস্বস্থিতে ছিলেন দুটি পরিবার। পুলিশ প্রমান উদ্ধারের পর আরও ভেঙে পড়েছেন ফাল্গুনীর মা বাণীদেবী ও উত্তমের বাবা খগেন মণ্ডলেরা। তাঁরা বলছেন, যে ছেলেরা এমন অন্যায় করতে পারে তাঁদের যে কোনও শাস্তির জন্য আমরা তৈরি।
দয়াময়ের দুই বন্ধু গ্রেফতারের পর বুধবারও এলাকায় জল্পনা, কেন খুন হতে হল দয়াকে। এলাকা সূত্রে জানা গিয়েছে, সিউড়ি দুই ব্লকের পুরন্দরপুর পঞ্চায়েতে ১০০ দিনের কাজ-সহ পঞ্চায়েতের নানান কাজ দেখাশোনা করতেন তিন বন্ধু তথা শাসকদলের ওই কর্মীরা। বেশ কিছু দিন আগে থেকে দয়াময় বোলপুরে থাকতে শুরু করলেও কোথাও টাকা পয়সার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদের জেরেই এমন নৃশংস খুন নাকি অন্য কোনও কারণ তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ওই সংসদের নির্বাচিত তৃণমূল পঞায়েত সদস্য তথা পুরন্দরপুরের উপপ্রধান অশ্বনি মণ্ডল বলছেন, পঞ্চায়েতের ১০০ দিনের কাজ অনেকে দেখাশোনা করে। ওঁরা তিন জনও তার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু কোনও সমস্যার কথা কানে আসেনি।