বহির্বিভাগে পড়ে রয়েছে চিকিৎসকের খালি চেয়ার। নিজস্ব চিত্র।
চার বছর আগে শুরু হয়েছিল ইনডোর পরিষেবা। ঝকঝকে ১০টি শয্যার উদ্বোধন হয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে সেই সব শয্যা তেমনই পড়ে রয়েছে। হাসপাতাল ভবনের বাইরে এখনও ঝোলে বিরাট মাপের তালা। কাঁথি ৩ ব্লকের লাউদা গ্রাম পঞ্চায়েতের বনমালীচট্টা প্রথামিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ছবিটা এমনই। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইতিহাসটা দীর্ঘ। ১৯৫৩ সালে বিধানচন্দ্র রায়ের হাতে ১৬ একর জমি ও নগদ একলক্ষ টাকা তুলে দিয়েছিলেন বনমালীচট্টা গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ জানা। ১৯৫৪ সালেই চারটি শয্যা নিয়ে চালু হয়ে গিয়েছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। এখন অবশ্য সেই চার শয্যার সুবিধাটুকুও নেই।
অথচ এই হাসপাতালের উপর নির্ভর করেন স্থানীয় পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৩০টি গ্রামের প্রায় ষাট হাজার মানুষ। আশা জাগিয়েও ব্যর্থ হয়েছে সব প্রচেষ্টা। এমনকী ক্রমশ বেহাল হয়েছে বহির্বিভাগের যাবতীয় পরিষেবাও। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিন জন চিকিৎসকের থাকার কথা। সেখানে রয়েছেন মাত্র একজন। সেই একজন চিকিৎসকেও সপ্তাহে দু’দিনের বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দেখতে পাওয়া যায় না বলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। আবার সেই দু’টি দিনও নির্দিষ্ট নয়। অভিযোগ, চিকিৎসক আসেন নিজের ইচ্ছে মতো। ফলে বেশিরভাগ দিনই দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেও ফিরে যেতে বাধ্য হন।
শুধু চিকিৎসক নন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই কম্পাউন্ডার, চতুর্থশ্রেণির কর্মীও। কার্যত ‘নেই’ রোগে আক্রান্ত বনমালীচট্টা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন টিঁকে আছে একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক, তিন জন নার্স আর ঠিকাচুক্তিতে নেওয়া একজন মহিলা সাফাইকর্মী দিয়ে।
লাউদা গ্রামপঞ্চায়েতের তৃণমূল উপপ্রধান সত্যব্রত দাস জানিয়েছেন, “স্বাস্থ্য দফতরের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। সুরাহা হয়নি।” স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপযুক্ত পরিকাঠামো, ২৪ ঘন্টা স্বাস্থ্য পরিষেবার চালুর দাবিতে হাসপাতাল বাঁচাও কমিটিও কাঁথির সহকারি মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছেও স্মারকলিপি দিয়েছে। কমিটির সম্পাদক পঞ্চানন দাসের অভিযোগ, “এখানে ‘মাতৃযান’ প্রকল্পের সুবিধাটুকুও নেই। লাউদা, কুসুমপুর, মারিশদা, কুমির্দা, ভাজাচাউলি পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দাদের ছুটতে হয় ১২ কিলোমিটার দূরে খড়িপুকুরিয়াতে ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কাঁথি মহকুমা হাসপাতালের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার।’’
দায়িত্বপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক বাদল মাইতি বলেন, “স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন শতাধিক রোগী আসেন। যে দিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক মফিদুল ইসলাম উপস্থিত থাকেন সেদিন সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও কর্মী না থাকায় পরিষেবা দিতে অসুবিধা হয়।” কাঁথি ৩ ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক বিক্রম পণ্ডাও কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন অব্যবস্থার কথা, “ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও চিকিৎসক বাড়ন্ত। তাই বনমালীচট্টা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক মফিদুল ইসলামকে সেখানেও অতিরিক্ত পরিষেবা দিতে হয়। সমস্যা সমাধানে খড়িপুকুরিয়া ব্লক প্রাথমিক ও বনমালীপুর প্রাথমিক স্বাস্থকেন্দ্রে অবিলম্বে চিকিৎসক বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছি।” কিন্তু কবে চালু হবে ইনডোর পরিষেবা, উত্তর দিতে পারেননি বিডিও।
ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবার দাবিতে স্থানীয় ৩০টি গ্রামের বাসিন্দারা ২০০৮ সালে ৭২ জন সদস্যের হাসপাতাল বাঁচাও কমিটি গঠন করেন। সেই থেকে চলছে আন্দোলন। কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের হাল ফেরেনি। কমিটির সম্পাদক পঞ্চানন দাস-সহ যুধাজিত দাস, তরুণ মণ্ডল প্রমুখেরা জানালেন, ‘‘আগামী দিনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৪ ঘন্টা স্বাস্থ্য পরিষেবা ও ইনডোর চালুর দাবিতে ফের আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি
শুরু হয়েছে।”
তালা ঝুলছে ইনডোরে।