পিংলা উস্কে দিল ময়নার স্মৃতি। মৃত সন্তানের ছবি হাতে সোনালি মণ্ডল।
ময়না পেরেছে, পারেনি পয়াগ।
তিন শিশু-সহ চার প্রাণের বিনিময়ে বাজি তৈরির কাজ বন্ধ করেছে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার উত্তমপুর। কিন্তু একাধিকবার মৃত্যু সত্ত্বেও বেআইনিভাবে বাজি তৈরির কাজ চলছে কোলাঘাটের পয়াগ গ্রামে। বুধবার রাতে পাশের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পিংলার ব্রাহ্মণবাড় গ্রামে বাজি কারখানায় ১২ জনের মৃত্যুর পরে নড়েচড়ে বসেছে পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ। শুক্রবার কোলাঘাটের পয়াগ, পাঁশকুড়ার পূর্ব চিল্কা ও মহিষাদলের চিংড়িমারি গ্রামে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রচুর বেআইনি বাজি উদ্ধার করে। এই ঘটনা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বারবার দুর্ঘটনায় মৃত্যু সত্ত্বেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেআইনিভাবে বাজি তৈরির কাজ চলছে রমরমিয়ে।
কোলাঘাটের পয়াগ, পাঁশকুড়ার চিল্কা, মহিষাদলের চিংড়িমারি এলাকার বিভিন্ন গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বেআইনি বাজি তৈরির কাজ চালাচ্ছে বেশ কিছু পরিবার। ওই গ্রামগুলিতে একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটলেও এখনও বাজি তৈরির রমরমায় ছেদ পড়েনি বলে অভিযোগ। প্রতিবার কালীপূজোর আগে এই গ্রামগুলিতে স্থানীয় পুলিশ অভিযান চালিয়ে শব্দ বাজি উদ্ধারের দাবি করে। কিন্তু ধড়পাকরে বাজি তৈরির কাজ চলে বহাল তবিয়তেই। এলাকার বাসিন্দাদেরও অভিযোগ, এইসব এলাকায় বাজি তৈরি হয় জেনেও পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেয় না। ফলে বাজির কারিগর ও ব্যবসায়ীরা দিনের পর দিন বাড়ির মধ্যে বেআইনিভাবে বাজি তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার সুকেশকুমার জৈন অবশ্য দাবি করছেন, ‘‘শুধু কালীপুজোর আগে নয়, জেলার যে সব এলাকায় বাজি তৈরির অভিযোগ পেলে অভিযান চালানো হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।’’
গত ১ সেপ্টেম্বর বাড়ির মধ্যে বাজি তৈরি করতে গিয়ে ময়নার শ্রীকণ্ঠা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার উত্তমপুর গ্রামের দীপক মণ্ডলের পরিবারের তিন শিশু-সহ চার জনের প্রাণ গিয়েছিল। ওই দিন সকালে জ্বলন্ত উনুনের পাশেই বাজি তৈরির কাজ করছিলেন দীপকবাবুর স্ত্রী ছায়াদেবী। উনুনে জ্বালানি দেওয়ার সময় সেখান থেকে আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়ে কাছেই থাকা বারুদের স্তুপের উপর। আর এরপরেই মুহূর্তের মধ্যে বাড়িতে আগুন ধরে যায়। মৃত্যু হয় তিন শিশু-সহ চার জনের। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পরে দীপকবাবু দু’দিন ধরে লুকিয়ে থাকার পরে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন । প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে জেল হেফাজতে থাকার পরে শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়ে এখন বাড়িতে আছেন বছর পঞ্চাশের দীপকবাবু ।
কোলাঘাটের পয়াগ গ্রামে পুলিশি অভিযান। —নিজস্ব চিত্র।
শুক্রবার ময়নার প্রত্যন্ত ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, যে বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছিল সেই বাড়ির কোন চিহ্নই নেই। ভেঙে পড়া বাড়ির জায়গায় মাটির ঢিবির উপর ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে গোয়াল ঘর বানানো হয়েছে। দীপকবাবুর তিন ভাইয়ের একদা দোতলা বিশাল মাটির বাড়িরও চিহ্ন নেই। এখন পাশাপাশি বানানো হয়েছে এক চিলতে করে তিনটি বাড়ি। জমিজমাহীন দীপকবাবুর দুই ছেলে লক্ষ্মীকান্ত ও শ্রীকান্ত এখন ভিন্ রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করেন। এ দিন দীপকবাবুর বাড়িতে গিয়ে ওই বিস্ফোরণের ঘটনার কথা জিজ্ঞাসা করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর বড় বৌমা বন্দনা ও ছোট বৌমা কাকলীদেবী।
পরিবারের তিন শিশু সন্তান ও স্ত্রী ছায়াদেবীকে হারিয়ে দীপকবাবু বলেন, ‘‘একটু বাড়তি রোজগারের আশায় বাজি তৈরির কাজ করত বড় বৌমা ও আমার স্ত্রী। কিন্তু তা থেকে আমাদের যা ক্ষতি হয়েছে তা কোনও দিন পূরণ হবে না। তাই আমি ঠিক করেছি আর কোনও দিন বাড়ির কাউকে ওই কাজ করতে দেব না।’’ বড় বৌমা বন্দনাদেবীও বলেন, ‘‘পাঁশকুড়ার চিল্কায় বাপের বাড়ি এলাকায় বাজি তৈরির কাজ হয়। সেখানেই বাজি তৈরির কাজ শিখেছিলাম। বাড়িতে কিছুটা রোজগারের আশাতেই শাশুড়িকে কাজ শিখিয়েছিলাম। এই কাজে ঝুঁকি আছে জানি, কিন্তু এ ভাবে যে আমাদের সব হারাতে হবে ভাবিনি।’’
তবে বাজি তৈরির চিত্র অটুট মহিষাদলের ইটামগরা-১ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার চিংড়িমারি গ্রামে। বছর চারেক আগে একইভাবে বাজি তৈরির সময় দুর্ঘটনায় চার জনের মৃত্যু হলেও সেখানে এখনও বাজি তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এলাকার ১০-১২ টি পরিবার। এ দিন ওই গ্রামে গিয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু বাজিও বাজেয়াপ্ত করে। যদিও কাউকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। এই গ্রামে বছর পাঁচেক আগে বাজি তৈরির সময় বিস্ফোরণে মারা যায় অমিত মাজি নামে বছর তিরিশের এক যুবক। পাশের গ্রামেরই মণীন্দ্রনাথ ঘোড়ইয়ের বাড়িতে বাজি তৈরির সময় বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় মণীন্দ্রবাবু ও তাঁর এক ভাইপো, এক নাত বউয়ের। ওই দুই পরিবার এখন বাজি তৈরির কাজ বন্ধ করলেও তাঁদের প্রতিবেশীরা এখনও বাজি তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অমিতের কাকা শক্তিপদ মাজির বাড়িতে এ দিন পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে বাজি উদ্ধার করে। যদি পুলিশ আসার আগেই শক্তিপদ পালিয়ে যান। তাঁর স্ত্রী শঙ্করীদেবী বলেন, ‘‘জানি এই কাজে ঝুঁকি আছে। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ। জমিজমা নেই। তাই রোজগারের জন্য এই কাজ করি।’’ বাজি তৈরির কথা স্বীকার করে গ্রামের বাসিন্দা মৃত্যুঞ্জয় মাজি বলেন, ‘‘পূর্বপুরুষ থেকে আমরা বাজি তৈরি করে আসছি। সাবধানতা অবলম্বন করেই এই কাজ করি।’’ কিন্তু এমন ঝুঁকি বহুল পেশা থেকে এইসব পরিবারগুলিকে সরিয়ে আনা যাচ্ছে না কেন ? গ্রামের সিপিএম পঞ্চায়েত সদস্য সাধন সিংহ বলেন, ‘‘গ্রামের মানুষকে বুঝিয়ে এই কাজ থেকে সরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু পরিবার বাজি তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করার প্রশাসনকেও উদ্যোগী হতে হবে।’’