শব্দদানবের তাণ্ডব নেই। তাই পোস্টারে শুভেচ্ছা। নিজস্ব চিত্র।
শেষ কবে কলেজ মোড়ে এমন সরস্বতী পুজো হয়েছে, মনে করতে পারছেন না প্রবীণ নাগরিকেরাও। সার দিকে সাউন্ড বক্স নেই। নেই কান ফাটা শব্দে গান বাজানো। কলেজ মোড়ে এমন অন্য বাণী বন্দনাই দেখল শনিবারের মেদিনীপুর। সৌজন্যে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা।
মেদিনীপুরের কলেজ মোড়ে সরস্বতী পুজোর আকর্ষণই আলাদা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন প্রভাবিত ক্লাবগুলির সরস্বতী পুজোয় রাজনৈতিক তরজা থাকে। সে সব দেখতে বহু মানুষ ভিড়ও জমান। কিন্তু বিগত বছরগুলিতে বক্সের দাপটে দর্শনার্থীদের কানে তালা লাগার জোগাড় হত। এ বার সমস্যা মেটাতে দিন কয়েক আগেই পুজো উদ্যোক্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসে পুলিশ-প্রশাসন। পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, সোমবার থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শুরু হচ্ছে। ফলে, কোনও রকম মাইক বাজানো যাবে না। বাজালে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। সেই নির্দেশে কাজ হয়েছে। কোনও পুজোর উদ্যোক্তাই এ বার সাউন্ড বক্স ব্যবহার করেননি।
এমন স্বস্তির পুজোয় খুশি দর্শনার্থীরা। শহরের প্রবীণ নাগরিক অনুপ সামন্ত বলেন, ‘‘এ বার সত্যিই অন্য রকম পুজো হয়েছে কলেজ মোড়ে। এ ভাবেই পুজো হওয়া উচিত। কার্টুন আর মডেলের পাশে বিভিন্ন লেখা থাকে। অন্য বার মাইকের আওয়াজে সে সব পড়াই যেত না। এ বার তেমনটা হয়নি।’’ শহরের আর এক বাসিন্দা অভিনব রায়ের কথায়, ‘‘অনান্য বছর কলেজ মোড়ের পুজোয় এত জোরে সাউন্ড বক্স বাজে যে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। এ বার তা হয়নি। সত্যি ভাল লেগেছে।’’
পুজো উদ্যোক্তাদের গলাতেও এ বার শব্দ-বিরোধী সুর। কলেজ মোড়ের একটি সরস্বতী পুজোর উদ্যোক্তা নরসিংহ দাস বলছেন, “পুলিশ-প্রশাসনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। জোরে সাউন্ড বক্স বাজলে অনেকেরই সমস্যা হয়।’’ আর একটি পুজোর উদ্যোক্তা অভিজিত্ করের কথায়, “তারস্বরে মাইক বাজলে পুজো দেখতেও সমস্যা হয়। আমরা শব্দদূষণের বিরুদ্ধে।’’
সব মিলিয়ে শনিবার সকাল থেকেই কলেজ মোড়ের পরিবেশটা ছিল অন্য রকম। সুষ্ঠু ভাবে পুজো দেখেছেন দর্শকেরা। বেলা যত গড়িয়েছে, ভিড় তত বেড়েছে। সন্ধের পরে তো তিলধারণের জায়গা ছিল না। শহরের এই এলাকায় প্রায় কুড়িটি পুজো হয়। হাতেগোনা কয়েকটি পুজো বাদ দিলে বাকিগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। কোনও পুজোর নেপথ্যে টিএমসিপি, কোথাও সিপি, কোথাওবা এসএফআই কিংবা এবিভিপি। রাজনীতির আকচাআকচিই যেন এখানকার পুজোর মূল আকর্ষণ। পুজো প্রাঙ্গণে বিভিন্ন মডেল থাকে। কোনওটা মাটির, কোনওটা প্লাইউডের। পাশে থাকে ব্যাঙ্গাত্মক লেখা, তীর্যক মন্তব্য।
এ বার বিধানসভা ভোটের বছর। তাই তরজার পারদ অনেকটাই চড়েছে। কোনও পুজোয় তৃণমূলকে বিঁধে লেখা হয়েছে, ‘প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা, ভেঙেছিস ঘরবাড়ি/সে কথা কি আমি জীবনে-মরণে, কখনও ভুলতে পারি?’ আবার কোনও পুজোয় মহাকরণের ছবির সামনে সূর্যকান্ত মিশ্রের ছবি রেখে লেখা হয়েছে, ‘খোকাবাবু যায়, লাল জামা গায়ে/ যেতে যেতে বারে বারে পিছনে তাকায়!’ রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তাও। লেখা হয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদীদের কোনও ধর্ম হয় না, তাদের জন্য ঘৃণা থাক। ধর্ম যদি মানুষ মারে, সে ধর্ম তবে নিপাত যাক।’
একটি পুজো মণ্ডপে আবার নিশানায় রাজনীতিই। লেখা হয়েছে, ‘সময় বলছে কাঁচা রক্তে শরীর ভেজাবে নগ্ন রাজনীতি/সময় বলছে ভাল মানুষেরা ছেড়ে যাবে রাজনীতি।’