অলিখিত একটা বোঝাপড়া হয়ে ছিল—১৪-৮। সেই নিভৃত সমঝোতায় শুধু ধাক্কা নয় অন্তত দু’টি আসনে বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের ইশারা দিয়েই মঙ্গলবার মুর্শিদাবাদে তাদের আসন ঘোষণা করল কংগ্রেস।
বামেদের সঙ্গে অলিখিত আসন সমঝোতা হলেও, তাদের গড় মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস যে ২২টি আসনের মধ্যে পাঁচটির বেশি যে বামফ্রন্টকে ছাড়ছে না, মঙ্গলবার তাদের আসন ঘোষণায় তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েকটি আসনে লড়াই হবে বন্ধুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ওই আসনগুলিতে বামেরাও প্রার্থী দেবে। যা শুনে তৃণমূলের ঠেস— লড়াই আবার বন্ধুত্বপূর্ণ হয় নাকি, এ থেকেই স্পষ্ট জোট কেমন হচ্ছে!
এ দিন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরি বলেন, ‘‘জোট হচ্ছে। তবে কংগ্রেসের অস্তিত্ব তো হারিয়ে নয়। তাই আমাদের জেতা আসনে আমরাই প্রার্থী দেব।’’
বামফ্রন্টকে ছেড়ে দেওয়া ৫টি আসনের মধ্যে রয়েছে গত বিধানসভা ভোটে ভরতপুর থেকে জয়ী আরএসপি-র ঈদ মহম্মদের আসনটি। বাকি চারটি আসন— সিপিএমের জেতা নবগ্রাম, সমসেরগঞ্জ ও জলঙ্গি। অন্য আসনটি, সমাজবাদী পার্টির জেতা ভগবানগোলা বিধানসভা কেন্দ্র। সিপিএমের সঙ্গে ডোমকল ও হরিহরপাড়ায় কংগ্রেস ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ লড়াই চায়। তাই, গত বিধানসভা ভোটে সিপিএমের জেতা ওই দু’টি আসনেও এ বার ‘জোটের অন্দরের লড়াই’।
গত বিধানসভা ভোটে রানিনগর ও মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রে বাম শরিক ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থীরা হেরে গিয়েছিলেন কংগ্রেসের কাছে। ওই আসন দু’টিতে এ বারও লড়াই করতে চাইছে ফরওয়ার্ড ব্লক। ফব-র জেলা সম্পাদক বিভাস চক্রবর্তী এ দিনও বলেন, ‘‘আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট চাই ঠিকই। তা বলে নিজের দলের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে কোনও মতেই নয়। ফলে বামফ্রন্টের মধ্যে থেকেই ওই দু’টি আসনে ফরওয়ার্ড ব্লক লড়াই করবে।’’
বাম শরিক ফব-র মতোই একই জেদ ধরে আছে আরএসপি-ও। গত বিধানসভায় এ জেলার আটটি কেন্দ্রে লড়াই করে প্রাপ্তি ছিল ভরতপুর। কংগ্রেসের কাছে বাকি সব ক’টিতেই হেরে গিয়েছিল তারা।
আরএসপি-র জেলা সম্পাদক বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘বহরমপুরে ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত মোট চার বার জিতেছি। বেলডাঙাতেও ১৯৭১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বার।’’ তাই, জোটের স্বার্থে বহরমপুর, বেলডাঙা ও রেজিনগর-সহ তিনটি আসন ছেড়ে দিয়ে, ভরতপুর, বড়ঞা, রঘুনাথগঞ্জ, নওদা ও সুতিতে আরএসপি প্রার্থী দেবে। তবে রাতে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে আরও তিনটি আসন ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে জেলা আরএসপি।
এ কথা শুনে অধীর পাল্টা বলছেন, ‘‘আমরা আরএসপি, ফব চিনি না। বামেরা যদি এ কথা বলে, তাহলে আমরাও ভরতপুর আসনটি ছাড়ব না। সেখানেও প্রার্থী দেব।’’
এই অবস্থানে সবাই অনড় থাকলে জেলার ২২টি আসনের মধ্যে কেবল ১০টি কেন্দ্রে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বাম-কংগ্রেসের এক জন করে প্রার্থী লড়াই করবে। বাকি ১২টি কেন্দ্রে তৃণমূলের বিরুদ্ধে রয়েছে জোটের প্রার্থী।
ডোমকল ও হরিহরপাড়ায় বিগত বিধানসভা ভোটে সিপিএমের প্রার্থীরা জিতেছেন। তার মধ্যে ডোমকলে জিতেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী আনিসুর রহমান ও হরিহরপাড়ায় ইনসার আলি বিশ্বাস। তবুও ওই দু’টি আসনে কংগ্রেস কেন প্রার্থী দিতে জেদ ধরেছে? অধীরের কথায়, ‘‘ওই দু’টি আসনে কংগ্রেস লড়াইয়ে না থাকলে তৃণমূল আপার হ্যান্ড পেয়ে যাবে।’’
কংগ্রেসের এক নেতার কথায়, ‘‘২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে ওই দু’টি আসনে নানা কারণে সিপিএম জিতেছিল ঠিকই, তবে সেই সব কারণ এখন আর নেই। তা ছাড়া ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের ফলাফল অনুসারে ডোমকলে সিপিএমের থেকে ৩৩ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল কংগ্রেস। একই ভাবে হরিহরপাড়ায় কংগ্রেসের লিড ছিল ৬ হাজার ভোটে।’’ একই ভাবে, ২০১১ সালে সাগরদিঘি আসনটি তৃণমূলের সুব্রত সাহা জিতলেও ২০১৪ সালের লোকসভায় ভোটে তৃণমূলকে তৃতীয় স্থানে ঠেলে দিয়ে কংগ্রেস ও সিপিএম প্রায় সমান ভোট পেয়েছে। এ কারণে সাগরদিঘিতেও লড়বে কংগ্রেস।
আসন বন্টনের প্রশ্নে আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক ও কংগ্রেস ঝেড়ে কাশলেও মন খোলসা করেননি সিপিএমের মুর্শিদাবাদ জেলা সম্পাদক ম়ৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য। মৃগাঙ্কবাবু বলেন, ‘‘তৃণমূলকে হারাতে আমরা বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়তে চাই। সেই লড়াইয়ের জন্য আসন বন্টন চূড়ান্ত হলে তখন মন্তব্য করব। এখন নয়।’’
সিপিএমের এক জেলানেতা বলেন, ‘‘ডোমকল, হরিহরপাড়া ও সাগরদিঘি নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে আমাদের চূড়ান্ত ফয়সালা এখনও হয়নি। সে কারণে মৃগাঙ্কদা খোলসা করে আপাতত কিছু বলছেন না।’’ কবে বলবেন? সে দিকেই তাকিয়ে দুই দলের তৃণমূল স্তরের নেতারা।