টিভি উড়িয়ে যাত্রা ফিরছে শীত-মাঠে

দেওয়ালে যাত্রার পোস্টার দেখে নিজের চোখকেই প্রথম বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সীতানাথ পান্ডা। শীতের রাতে আবার যাত্রার আসর বসবে চটির মাঠে?

Advertisement

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০১৬ ০১:৩২
Share:

নবদ্বীপের রাস্তায় যাত্রা পোস্টার। — নিজস্ব চিত্র

দেওয়ালে যাত্রার পোস্টার দেখে নিজের চোখকেই প্রথম বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সীতানাথ পান্ডা। শীতের রাতে আবার যাত্রার আসর বসবে চটির মাঠে?

Advertisement

নট্ট কোম্পানির প্রাক্তন জুড়িবাদক, সাতাশি বছরের সীতানাথে নাকে টিন আর চট দিয়ে ঘেরা আসরের চেনা গন্ধটা অনেক দিন বাদে ধাক্কা মারে। ঘোর লেগে যায়। কানে বাজতে থাকে কনসার্ট। চেনা শিবরঞ্জনী। কুয়াশার সাদা চাদরে মোড়া মাঠ। মাঝে আলো ঝলমলে মঞ্চে দাপাচ্ছেন স্বপনকুমার, দিলীপ চট্টোপাধ্যায়, তপনকুমার, শেখর গঙ্গোপাধ্যায়, বীণা দাশগুপ্ত, বেলা সরকার, জ্যোৎস্না দত্তেরা।

কী সব পালা! নটসূর্য দিলীপ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত সোনাইদীঘি, নট্ট কোম্পানির অচল পয়সা, মা মাটি মানুষ, গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম। বীণা দাশগুপ্তর সুপারডুপার হিট পালা মীরার বধুঁয়া। জ্যোৎস্না দত্ত-গুরুদাস ধারা অভিনীত বৈজু বাওরা। সন্তু মুখোপাধ্যায়ের ভগবান বাবু। শান্তিগোপালের আমি সুভাষ, লেনিন বা স্তালিন। মঞ্চ ঘিরে বুঁদ জনতা। এই কান্নায় ভাসছে তো, পরক্ষেই হাসির হুল্লোড়ে গড়িয়ে পড়ছে। আসর ভাঙলে যখন ‘নটী বিনোদিনী’ বা ‘মীরার বধুঁয়া’র সদ্য শোনা গান গুনগুনিয়ে তাঁরা যখন বাড়ি ফিরতেন, রাত তখন নিশুতি।

Advertisement

আধুনিক যাত্রার জনক মতিলাল রায়ের শহর নবদ্বীপে চিরকালই যাত্রার রমরমা ছিল। এখানেই প্রথম আধুনিক দল গড়ে তোলেন তিনি। সময়টা ১২৮০ বঙ্গাব্দ। তাঁর ‘নবদ্বীপ বঙ্গ গীতাভিনয় সম্প্রদায়’-এ ১৩০ জন বেতনভূক শিল্পী ও কলাকুশলী ছিলেন। খান চল্লিশ পালা তাঁরা নতুন আঙ্গিকে মঞ্চস্থ করেছিলেন। মতিলাল দল প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পরে নবদ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হয় বউকুণ্ডুর যাত্রাদল। ১২৮৫ বঙ্গাব্দে নবদ্বীপে প্রথম রঙ্গমঞ্চ গড়ে ওঠে। পরে গড়ে ওঠে বহু দল। এর মধ্যে বান্ধব নাট্যসমাজ, বিজয়া নাট্যগোষ্ঠী, বৈদেহী নাট্য সম্প্রদায়, নদিয়া নাট্যসমাজ, রামকৃষ্ণ অপেরা, দেশবন্ধু ক্লাবের নাম উল্লেখযোগ্য।

নদিয়া নাট্য সমাজের শুরুর দিন থেকে ছিলেন সীতানাথ পাণ্ডা। তাঁর কথায়, “আমাদের বিখ্যাত পালা ছিল নদের নিমাই। পাঁচের দশকে রাসবিহারী মোহান্তের উদ্যোগে তাঁরই নাটমন্দিরে আমাদের নদিয়া সমাজের প্রতিষ্ঠা। একটানা পঁচিশ বছর ধরে সারা দেশ জুড়ে আমরা নদের নিমাই করেছি। কম করে সাড়ে ছ’শো রজনী অভিনীত হয়েছিল।” অভিনয় নিজে তিনি খুব একটা করেননি। কনসার্টে জুড়ি বাজাতেন। পরে পালার সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। নদিয়া সমাজ থেকে তাঁকে ডেকে নিয়ে যান তরুণ অপেরার শান্তিগোপাল। সেখান থেকে নট্ট কোম্পানির মাখনলাল নট্ট। তাঁর মতে, গাঁয়ে-গঞ্জে টিভি আসার পরেই যাত্রার বারোটা বাজে। লোকের রুচি বদলে দিয়েছিল টিভি। যাত্রা সেই মতো নিজেকে বদলাতে পারেনি।

আট এবং নয়ের দশকে নবদ্বীপে একচেটিয়া যাত্রার আসরের আয়োজন করতেন নিত্যানন্দ মহাপাত্র। স্থানীয় স্পোর্টিং ক্লাবের তৎকালীন কর্তা নিত্যানন্দ বলেন, “সাতের দশকের শেষ থেকে চিৎপুরের যাত্রাদল নবদ্বীপে আসতে শুরু করে। তখন প্রথম দিকে এক সঙ্গে তিন ‘নাইট’ যাত্রা হত। পরপর তিন রাত্রিব্যাপী বিরাট যাত্রানুষ্ঠান। প্রথম রাতে সাধারণত পৌরাণিক পালা, দ্বিতীয় রাতে ঐতিহাসিক এবং শেষ রাতে সামাজিক পালা। দলগুলো তখন বারো-পনেরো হাজার টাকা নিত। পরে তিন রাত্রি কমে হল দু’রাত এবং শেষ দিকে একটা করে শো। তত দিনে অবশ্য যাত্রার চরিত্র আমূল বদলে গিয়েছে।”

বদল মানে, যাত্রায় সিনেমা-টিভির তারকাদের আনাগোনা। যাত্রাপালার নিজস্ব শিল্পীদের পিছু হটতে বাধ্য হওয়া। কিন্তু মাইক্রোফোন এবং ক্যামেরার কারবারে অভ্যস্ত তারকারা চারদিক খোলা মঞ্চে তেমন পসার জমাতে পারেননি। ফলে লোকে ফিল্ম আর্টিস্টের নাম শুনে যাত্রা দেখতে গিয়ে হতাশ হয়েছে। একাধিক যাত্রার আসরে গোলমাল হয়েছে। গ্রামের মেঠো দর্শক ভাল পালা দেখতে না পেয়ে ভাঙচুর করেছে। বেগতিক বুঝে উদ্যোক্তারা যাত্রা আনা বন্ধ করে দিয়েছেন। তত দিনে তাঁদের হাতে চলে এসেছে বিনোদনের নতুন মধ্যম — তারকাখচিত ‘নাইট’।

যাত্রার সুদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নিত্যানন্দ বলেন, “মনে আছে, মীরার বঁধূয়া দেখতে ট্রাক্টরে চড়ে বর্ধমানের অগ্রদ্বীপ থেকে লোক এসেছিল। নিরুপায় হয়ে যাত্রা শুরুর আগেই টিন খুলে দিতে হয়েছিল।” নবদ্বীপের চটির মাঠে শেষ যাত্রা এসেছিল দু’দশক আগে। শক্তি কপূর অভিনীত একটি পালা। তার পর ফের আসছে আবার এই ২০১৬-তে।

এত দিন পরে আবার যাত্রার দিকে ঝুঁকলেন? উদ্যোক্তাদের তরফে নিতাই বসাক বলেন, “আমরা যখন ছোট, তখন চটির মাঠে যাত্রা দেখতাম। একটু বড় হয়ে যখন যাত্রা আনতে শুরু করলাম, তখন তার জনপ্রিয়তায় ভাঁটার টান ধরেছে। মানুষ টিভিতে মজেছেন। এখন লোকে টিভি দেখতে দেখতেও একঘেয়েমিতে ভুগছেন।” তাই ফের যাত্রার পোকা নড়ে উঠেছে নিতাইবাবুদের।

এত দিন পরে যাত্রার আসর। পরপর দু’রাত্রি। প্রথম রাতে শ্রী চৈতন্য অপেরার ‘আমি রাম রহিমের মা।’ অভিনয় করতে আসছেন ছোট পর্দার চেনা মুখ সায়ন্তিকা। দ্বিতীয় রাতে আনন্দবীণা অপেরার ‘খোকাবাবুর বিয়ে’। কেমন সাড়া পাচ্ছেন? উদ্যোক্তাদের দাবি— আশাতীত। কী রকম?

নিতাই হিসেব দেন, প্রায় দশ হাজার লোক বসার ব্যবস্থা করেছেন তাঁরা। এর মধ্যে প্রথমে সাতশো চেয়ার রেখেছিলেন। দৈনিক পঞ্চাশ টাকা করে। বাকি সব জমি। দৈনিক কুড়ি টাকা করে। কিন্তু এখন চাহিদার বহর দেখে চেয়ারের সংখ্যা দ্বিগুণ করেও কুল পাছেন না।

আবার প্রচার গাড়ি থেকে ফোন নম্বর নিয়ে বর্ধমানের পূর্বস্থলী থেকে লোকেরা টিকিট চাইছেন। যেমন চেয়েছেন শ্রীরামপুরের তপন মণ্ডল। কী করবেন এত টিকিট? উত্তরে তিনি বলেন ‘‘পুরনো বন্ধবান্ধবরা দল বেঁধে যাব। কত দিন পরে জমিয়ে বসে যাত্রা দেখব। ভাবতেই দারুণ লাগছে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement