—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
কাঁটাতারের ধারে জ়িরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন এক প্রবীণ বাসিন্দা— “রাস্তার হাল তো দেখছেনই। পানীয় জলটাও কিনে খেতে হয়। ভোটের সময় সবাই আসে, তার পর আর কেউ খোঁজ রাখে না।”
অদূরেই ইছামতী— স্রোত হারিয়ে তার বুক জুড়ে থমকে থাকা কচুরিপানা, যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা নীরব অভিমান— যেখানে জ়িরো পয়েন্টে বাস করা মানুষজনকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাজার বা স্কুল যেখানেই হোক যাওয়ার জন্য পরিচয়পত্র জমা রাখতে হয় বিএসএফ চৌকিতে।
রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের প্রান্তিক এলাকা দত্তপুলিয়া পঞ্চায়েতের হাবাসপুর— সীমান্তের কাঁটাতারের এ-পারে এক নিরুচ্চার জীবনযাপন। প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াই। রাজ্য জুড়ে ভোটের উত্তাপ বাড়লেও এই জনপদ কার্যত নিস্তরঙ্গ। শুধু দেওয়ালে দেওয়ালে, পতাকা আর ব্যানারে জেগে উঠেছে নির্বাচনের রং— পদ্ম ও জোড়াফুলের সরাসরি লড়াই। হাবাসপুরের এক মুদি দোকানি আক্ষেপ করেন, “সমস্যা তো একই রয়ে গিয়েছে— রাস্তা খারাপ, জল কিনে খেতে হয়।”
রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভা মূলত গ্রামীণ। রানাঘাট ২ ও হাঁসখালি ব্লকের অংশ নিয়ে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রে রয়েছে ১১টি গ্রাম পঞ্চায়েত— ছ’টি তৃণমূল, পাঁচটি বিজেপির দখলে। এক সময়ে বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটি ছিল এই অঞ্চল। সময়ের পালাবদলে সেই জমিতে প্রথমে তৃণমূলের উত্থান, আর এখন বিজেপির রমরমা। গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৩১ হাজার ভোটে জয়ী হয় বিজেপি, লোকসভা ভোটে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ হাজারে। এই পরিস্থিতিতে প্রার্থী বদলের পথ বেছে নিয়েছে তৃণমূল। দু’বারের বিধায়ক সমীর পোদ্দার গত বার এই আসনে হেরে যান। তাঁকে অন্য কেন্দ্রে সরিয়ে এখানে প্রার্থী করা হয়েছে জেলা মহিলা সভানেত্রী বর্ণালী দে-কে।
মতুয়া অধ্যুষিত এই অঞ্চলে ভোটের সমীকরণ যে জটিল, তা মানছেন তৃণমূল নেতৃত্বও। আড়ংঘাটা পেরিয়ে সবদলপুরে চায়ের দোকানের আড্ডায়, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সামনে সকালের জটলায় শোনা গেল প্রশ্ন, “এত মানুষের নাম বাদ দিয়ে আবার ভোট চাইতে এসেছ?” আবার পাল্টা সুরও শোনা যায়— “যারা বৈধ ভোটার, তাদের নাম তো বাদ যায়নি। এত দিন তৃণমূল কী করেছে? পঞ্চায়েত ভোট কী ভাবে করেছে তা তো আমরা দেখেছি।"
পানিখালি বাজারে পৌঁছতেই চোখে পড়ে পতাকা, ব্যানার, হোর্ডিংয়ে মুখোমুখি তৃণমূল ও বিজেপি। ক্ষীণ হলেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে সিপিএমও। পূর্ব নওপাড়ার কার্যালয়ে দেখা মিলল বিদায়ী বিধায়ক তথা বিজেপি প্রার্থী অসীম বিশ্বাসের। তাঁর দাবি, “তৃণমূলকে বাইরে থেকে প্রার্থী আনতে হয়েছে। লোকও আনছে বাইরে থেকে।” প্রার্থী ঘোষণার পর যে তাঁকে নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে বিজেপির অন্দরেই?
অসীমের বক্তব্য, “বিজেপি একটা বড় পরিবার। কিছু মান-অভিমান থাকতেই পারে, তবে এখন সবাই এক সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছে।” আবার, বগুলায় প্রচারের ফাঁকে তৃণমূল প্রার্থী বর্ণালী দে বলছেন, “এত মানুষের নাম বাদ দিয়ে যে ভাবে হেনস্থা করা হয়েছে, তার জবাব মানুষই দেবে।”
ধানতলার পথে ফিরে আসে অস্বস্তিকর ধানতলা কাণ্ডের স্মৃতি। বাম আমলের সেই ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল অনেক বাম নেতার। তবে ধানতলা বাজারে এক বৃদ্ধ বলেন, “এই আমলে তো এর থেকেও অনেক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে!” সবদলপুর পার করে বস্তা এলাকায় প্রচারের ফাঁকে সিপিএম প্রার্থী মৃণাল বিশ্বাস আবার দাবি করেন, “ধানতলা কাণ্ডে অভিযুক্তেরা এখন তৃণমূল-বিজেপির নেতা। তৃণমূল আর বিজেপির আঁতাত মানুষ বুঝে গিয়েছে। মানুষের হয়ে আমরাই লড়ছি।”
স্রোতহীন ইছামতীর মতোই স্তব্ধ এই গ্রামগুলির অন্তর্লীন স্রোত এখনও অদৃশ্য। নানা চোরা অঙ্কে পাক খাচ্ছে ভোটের তরী।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে