সোহেল কি তাহলে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে গেল?
পুলিশ তো বটেই, প্রশ্নটা পাক খাচ্ছে রানিনগরের সীমান্ত ঘেঁষা জনপদ, ডিহিরমাঠেও। মঙ্গলবার দুপুরে সোহেল শেখের স্ত্রী জেসমিন বিবির (২৬) আর্তনাদে ছুটে এসেছিলেন পড়শিরা। তাঁরা এসে দেখেন, জেসমিনের সাড়ে চার বছরের ছেলে উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। লোকজন দেখে ঘরের বন্ধ দরজার দিকে হাত তুলে সেই শিশু শুধু বলেছিল, ‘‘বাবা মাকে মারছে।’’
সকলে ছুটে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। ধাক্কা দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করতেই ভিতর থেকে শোনা যায় সোহেল শেখের হুঙ্কার, ‘‘কাউকে আস্ত রাখব না। আমাকে ছুঁলেই কেটে ফেলব।’’ সেই হুমকি উপেক্ষা করেই সকলে দরজা ভাঙেন ঠিকই। কিন্তু সোহেলের সে মূর্তি দেখে কেউ তার কাছে ঘেঁষতে সাহস পাননি। মাথার উপরে ধারাল হাঁসুয়া ঘোরাতে ঘোরাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সে। তারপর এলাকা ছেড়ে পালায়।
ঘটনার পরেই পুলিশ বিএসএফকে সতর্ক করেছিল। বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে বাংলাদেশ। ডিহিরমাঠ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই। আর শুকিয়ে যাওয়া শীর্ণ পদ্মা এখন হেঁটেই পার হওয়া যায়। ফলে প্রথম থেকেই পুলিশের একটা আশঙ্কা ছিল যে, সোহেল পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পারে। মঙ্গলবার তারা বিএসএফকেও সতর্ক করে। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের দাবি, পাখি তার আগেই উড়ে গিয়েছে।
মঙ্গলবারের ওই ঘটনার পরে জেসমিনের বাবা সাদের শেখের শেখের অভিযোগের ভিত্তিতে সোহেলের বিরুদ্ধে পুলিশ একটি খুনের মামলা রুজু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে এই খুন। জেসমিনকে উদ্দেশ্য করে লেখা এক যুবকের চিঠিও উদ্ধার করা হয়েছে। জেলা পুলিশের এক কর্তার কথায়, ‘‘ঘটনার পর থেকেই সোহেলের খোঁজে তল্লাশি চলছে। তবে সীমান্ত পেরিয়ে তার বাংলাদেশে যাওয়ার সম্ভাবনাও আমরা উড়িয়ে দিচ্ছে না।’’
পুলিশের একাংশ ও সোহেলের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গিয়েছে, গোটা ঘটনাটি পূবর্পরিকল্পিত। এমনকী ঘটনার বেশ কয়েকদিন আগে সোহেল একটি জমি বন্ধক দিয়ে নগদ কয়েক হাজার টাকাও পেয়েছে। পুলিশের অনুমান, বাংলাদেশে আশ্রয় নেবে বলেই সোহেল নগদ ওই টাকা জোগাড় করেছিল। পুলিশের কাছে খবর পৌঁছনোর আগেই সে সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারে বলে অনুমান পুলিশের একাংশের। প্রতিবেশী ও পুলিশের দাবি, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে জেসমিনের সঙ্গে সোহেলের প্রায়ই অশান্তি হত।
ঘটনার দিনও সোহেল নেশাগ্রস্ত ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। সোহেলের এক বন্ধুর দাবি, ‘‘সে দিন সোহেল মদ ও গাঁজা দু’টোই খেয়েছিল। হঠাৎ এ ভাবে নেশা করা নিয়েও আমরাও প্রশ্ন করেছিলাম। কিন্তু সে কোনও উত্তর দেয়নি। তখন বুঝতে পারিনি, সোহেল এমন কাণ্ড করবে।’’ তবে এ দিনও মেয়ের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কথা মানতে চাননি জেসমিনের বাবা সাদেক। তিনি জানান, সোহেল ইদানীং নেশা করত। জুয়া খেলেও প্রচুর টাকা নষ্ট করছিল। গত বৃহস্পতিবার সোহেলের সঙ্গে জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে অশান্তি করে জেসমিন সাদেকের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। শনিবার সোহেলও যায় শ্বশুরবাড়ি। সেখানে গিয়ে সে সকলের কাছে ভাল ব্যবহার করে।
সাদেক বলছেন, ‘‘সোহেল আমাদের বলে ‘আর ভুল হবে না। মেয়েকে পাঠিয়ে দিন আমার সঙ্গে।’ আমরা তাকে বিশ্বাস করে ভুল করেছি। খুন করবে বলেই বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েই মেয়েটাকে শেষ করে দিল।’’ সাদেকের দাবি, ‘‘জেসমিনা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে সেটা আমরা জানতাম। সেই মতো বোঝাতাম। তাতেও ফল না হলে সোহেল তো সম্পর্কটা ভেঙে দিতে পারত। আসলে তেমন কিছুই না। জেসমিনের গলায় একটা সোনার হার ছিল। জুয়া খেলার জন্য সেই হারটাই চেয়েছিল সোহেল। মেয়ে তা চায়নি বলেই সোহেল তাকে খুন করেছে।’’
মঙ্গলবার বিকেল থেকেই সোহেলের সাড়ে চার ও নয় বছরের দুই ছেলে রয়েছে সাদেকের বাড়িতে। সাদেকের স্ত্রী রহিমা বিবি বলেন, ‘‘ছেলে দু’টোর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। কিছু মুখে তুলছে না। ছোটটা সর্বক্ষণ মায়ের খোঁজ করছে। ওকে কী উত্তর দেব বলুন তো?’’