গোরাবাজারের ঘুমন্ত ফাঁড়ি।
নদীর বুক ছুঁয়ে ডাকটা উড়ে আসে— আ হুইইই...।
অন্ধকার ফুঁড়ে এ পার থেকে পাল্টা একটা সাড়াও উড়ে যায় নদীর অন্য পারে।
বহরমপুরের ঘাটে তরী ভেড়ানোর হাঁকডাক চলেছে। পথের শেষ যেখানে, নদীর তার কালো জল নিয়ে সেখানেই বুঝি জলজ পথ তৈরি করেছে। পথ-হারা তিন চাকার ভুটভুটি খোলে ঢুকে সেই জলজ পথ বেয়ে হারিয়ে যায় দূরে যানবাহন। তার পর, আবার সব চুপ, নির্বাক।
অস্পষ্ট এমনই এক-আধটা ডাক, আর কখনও কেমনে ভেজা রাস্তায় ফাটা টায়ারের প্যাচ প্যাচ আওয়াজ নিয়ে শহরটা বুঝি ঘুমিয়েই পড়েছে।
সব্বাই?
কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালের সামনে ঘন ঘন সিগারেটে টান দিয়ে ভদ্রলোক বলছেন, ‘‘ঘুম কি আর আসে দাদা, ডাক্তার বলে দিয়েছেন বাহাত্তর ঘণ্টা না গেলে কিচ্ছু বলা যাবে না।’’ রাতের পথ বুঝি এমনই উৎকণ্ঠাকে আরও ঘন করে তোলে।
৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে হোটেলটাও জেহে রয়েছে, অবিকল দিনের মতোই। এক-একটা দূর পাল্লার বাস এসে থামছে। আর তা থেকে সদলে নেমে সরপুরিয়ার লম্বা অর্ডার। যাত্রীরা ভিড় করে চেখে নিচ্ছেন, দোকানির ভাষায়, ‘রাতের মিষ্টিমুখ’!
নবদ্বীপ ফেরত শ্মশান যাত্রীদের ভিড়টাও স্বজন হারা শোক আর মিষ্টির পড়ে যাওয়া স্বাদ নিয়ে নিভৃতে কথপোকথনে ব্যস্ত। রাতের পথেই বোধহয় এমন সম্ভব— সন্তাপ আর রস যেখানে পাশাপাশি থাকে!
কৃষ্ণনগর শহরে ঢোকার মুখে পুলিশের চেকপোষ্ট। রিকশায় জুবুথুবু দুই যাত্রী হোটেল খুজছেন। রাতের পথ থেকে পুলিশই তাঁদের হোটেলের সন্ধান দিয়ে দেয়— তারপর তেলচিটে রুমালে মুখ মুছে পুলিশ কর্মী বলেন, ‘‘রাতের পথ থেকে কেমন আশ্রয় খুঁজে দিলাম বলুন!’’
জেলা সদর কৃষ্ণনগরের ঘুমটা ধরে একটি তাড়াতাড়িই। পোষ্ট অফিস মোড় থেকে রাজবাড়ির দিকে এগিয়ে গেলে সুনসান রাস্তা। চৌরাস্তার মোড়ে বন্ধ দোকানের চাতালে জনা কয়েক কর্ণচারির দিনান্তের আড্ডা। আর দিঘির ধারে রাস্তা বিনীদ্র সারমেয়কুল।
আর জানলার ফাঁক গলে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় আছড়ে পড়ে রেডিওর গান।
অতন্দ্র রাত-প্রহরা।
গৌতম প্রামাণিকের তোলা ছবি।
রাতভর এ শহরের এ মুড়ো-ও মুড়ো ঘুরেও অবশ্য চোখে পড়ে না কোনও উর্দির টহলদারি। শুধু ঘরে ফেরা সিভিক ভলান্টিয়ার যুবক সাইকেল থেকে নেমে জানান, ‘‘পাকা চাকরি তো নয় দাদা, দায়টা তাই পেটের দায়ে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়েও রাত জাগতে হয়!’’
রাত পৌনে একটা। ফাঁকা বেলেডাঙার মোড়। বছর তিনেক আগে ভরাবাজারে দুষ্কৃতীদের গ্যাংওয়ারের ভিতরে পড়ে গুলি খেয়ে মৃত্যু হয়েছিল এক ইঞ্জিনিয়ারিংযের ছাত্রের। এলাকাবাসীদের দাবি, রাত বাড়লে দেখা মেলে ‘তাদের’। যদিও এদিন তাদের কেন কোন মানুষের দেখা মেলে না। শুধু একটা দোকানের ছাউনির নিচে গল্প করতে দেখা যায় দুই সিভিক ভলেন্টিয়ারকে। রাস্তার দখল নেয় গোটা পাঁচেক কুকুর।
অবিকল এক ছবি নিয়ে পড়ে রয়েছে পড়শি বহরমপুরও। কৃষ্ণনাথ কলেজ ঘাটের রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে গোরাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির দরজা সপাটে বন্ধ। নিভে গিয়েছে আলো। শুধু রাস্তার আলো ঠিকরে পড়ে জানান দিচ্ছে জীর্ণপ্রায় পুলিশ ফাঁড়ি ভবনের। বহু ডাকাডাকিতেও ঘুম ভাঙে না। আইনের শাসক বলে কি বিশ্রাম নেই!
রাতের পথ চলতি মানুষ তাই বুঝি ঈশ্বরেই ভরসা রাখেন। ঘাটবন্দরের যাওয়ার পথে পাশাপাশি তিনটে ছোট মন্দিরের সামনে তাই এক মনে প্রণাম সেরে নেন রাতের এক পথচারী। কোথায় চললেন? সাড়া না দিয়ে হাসি ঝুলিয়ে সাইকেলে হারিয়ে যায় যুবক, কোথায় কে জানে।
একা একাই পড়ে ভিজতে থাকে প্রহরাহীন রাতের নিঃসঙ্গ রাস্তা।