পাতে পড়বে কি? ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য।
তিন রকমের মাছ। মাংস—রেওয়াজি খাসি, দিশি মুরগি দুই-ই আছে। তিন রকমের সব্জি। নেই নেই করে মিষ্টিও ছ’রকমের। নতুন পোশাকও আনা হয়েছে।
এত কিছুর পরেও মন ভাল নেই জলঙ্গির লতিকা মণ্ডলের। বলছেন, ‘‘পদ্মা পাড়ে বাড়ি। আর বচ্ছরকার দিনে জামাইয়ের পাতে পদ্মার ইলিশ দিতে পারছি না! এত আয়োজনে এই খামতি পূরণ হয় নাকি গো!’’
কথাটা মিথ্যে নয়। নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ সীমান্তে খাওয়াদাওয়ার কথা উঠলে প্রথমেই আসে পদ্মার ইলিশের কথা। যেমনি তার স্বাদ, তেমনি তার গন্ধ। জামাই আদর থেকে পুজো-পরব, বিয়ে-শাদি থেকে বাজির আসর সব কিছুর প্রস্তুতিতেই এক নম্বরে জায়গা করে নিত—পদ্মার ইলিশ।
হোগলবেড়িয়ার কাছারিপাড়ার সনাতন মণ্ডল এখন অবশ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, ‘‘সে সব মনে পড়লেই মনখারাপ হয়ে যায়। সকাল বিকেল ইলিশ খেতে খেতে জামাই বাবাজির জিভে চড়া পড়ে যেত। অথচ এখন তো ইলিশ মেলেই না। কালেভদ্রে যা-ও বা মেলে তা কেনা অসম্ভব।’’
সীমান্তঘেঁষা সাগরপাড়ার সাধন মণ্ডল জানাচ্ছেন, আজ থেকে বছর কুড়ি-বাইশ আগেও পাতে পদ্মার ইলিশ দেখলে মুখ বেজার হয়ে যেত। নিত্যদিন ইলিশ খেতে ভাল লাগে নাকি! মুখের স্বাদ বদলাতে একটা কচি লাউয়ের পরিবর্তেও দিয়ে দেওয়া হতো আস্ত একটা ইলিশ! শুধু লাউ কেন একটা কুমড়ো, একজোড়া নারকেলের বিনিময়েও মিলে যেত দেড় সের ওজনের পদ্মার টাটকা ইলিশ। আর এখন?
বহরমপুরে গৌতম প্রামাণিকের তোলা ছবি।
প্রৌঢ় সাধনবাবুর আক্ষেপ, ‘‘সে পদ্মাও নেই, নেই সেই ইলিশও। জালে ইলিশ পড়া তো দূরের কথা, ইলিশের স্বাদ কেমন তাই ভুলে গিয়েছি। বাজারে মাঝেমধ্যে এক দেড় সের ওজনের পদ্মার ইলিশ উঠছে বটে। তবে এক থেকে দেড় হাজার টাকা দামের সেই মাছ কিনে খাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।’’
পদ্মাপাড়ের এলাকাগুলোতে একটা সময় ইলিশ ছাড়া জামাইষষ্ঠীর কথা ভাবাই যেত না। অথচ গত বেশ কয়েক বছর ধরে ষষ্ঠীর দুপুরে জামাইদের জন্য হাজার রকমের পদ রান্না করেও যেন মন ভরছে না শাশুড়িদের। রামনগরের যুথিকা প্রামাণিক, শিকারপুরের রিনা বিশ্বাস কিংবা সাগরপাড়ার চম্পা মণ্ডলেরা বলছেন, ‘‘ইলিশ ছাড়া আবার জামাই আদর হয় নাকি? অথচ সেটাই করতে হচ্ছে। পদ্মায় ইলিশ না উঠলে আর কী করব বলুন? বাইরে থেকে যে ইলিশ এখানে আসে তার স্বাদ আর পদ্মার ইলিশের স্বাদের কোনও তুলনা হয় নাকি? তবুও বাধ্য হয়ে সেই চালানি ইলিশই কিনতে হচ্ছে।’’
কিন্তু সদয় পদ্মা এমন কৃপণ হয়ে গেল কেন? পদ্মাপাড়ের মৎস্যজীবীরা বলছেন, ‘‘নদীতে জল যেমন কমেছে, তেমনি নদীর উপরে মানুষের অত্যাচারও লাগামছাড়া হয়ে গিয়েছে।’’ তাঁদের অভিযোগ, ইলিশ বড় হওয়ার আগেই অনেকেই বেআইনি ভাবে মাছ ধরছেন। মৎসজীবী নয় এমন বহু সম্পন্ন মানুষ ‘কাপড়া’ জাল ব্যবহার করে আরও সর্বনাশ করছে। বিএসএফ ও প্রশাসন বিষয়টি জেনেও কোনও পদক্ষেপ করছে না। প্রশাসনের কর্তারা অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছেন, ‘‘আমরা অবিলম্বে এই বিষয়ে মৎস দফতরের সঙ্গে কথা বলব। সেই সঙ্গে মৎস দফতর ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যৌথ ভাবে বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা শিবিরও করা হবে। সতর্ক করা হবে বিএসএফকেও।’’
( তথ্য সহায়তা: গৌরব বিশ্বাস, সুজাউদ্দিন, কল্লোল প্রামাণিক)