(বাঁদিকে) মহুয়া মৈত্র এবং তারান্নুম সুলতানা মির (ডানদিকে)। —ফাইল চিত্র।
তৃণমূলেরই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আনা অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটিতে নদিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি অপসারিত হলেন তারান্নুম সুলতানা মির। নদিয়া জেলা তৃণমূলের অন্দরে কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত তারান্নুমের এই অপসারণে জেলায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা হল বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রশাসন সূত্রের খবর, আপাতত জেলা পরিষদ পরিচালনার জন্য বসানো হবে প্রশাসক। পরে ফের নির্বাচন করে সভাধিপতি এবং সহ-সভাধিপতি নির্বাচিত করা হবে কি না, তা ঠিক করবে রাজ্য সরকার।
সভাধিপতি বদলের এই উদ্যোগের সূত্রপাত গত ১৫ জুন। মোট ৫২ আসন বিশিষ্ট নদিয়ায় জেলা পরিষদের তৃণমূলের ২৭ জন সদস্য একজোট হয়ে সভাধিপতি তারান্নুমের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কমিশনারের কাছে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন সে দিন। এর পরে বৃহস্পতিবার জেলা পরিষদের তারকদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সভাকক্ষে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এই অনাস্থা প্রস্তাবের শুনানি ও ভোটাভুটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ভোটাভুটির সময় দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সভাধিপতির প্রতি অসন্তোষ আরও বেড়েছে। অনাস্থার পক্ষে সমর্থনকারীর সংখ্যা ২৭ থেকে বেড়ে ৩১ জনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সভায় উপস্থিত মোট ৩৭ জন সদস্যের মধ্যে ৩১ জনই সভাধিপতিকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন। অন্য দিকে, বিজেপির ৬ জন জেলা পরিষদ সদস্য সভায় উপস্থিত থাকলেও তাঁরা ভোটদানে বিরত ছিলেন। প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কমিশনারের প্রতিনিধি হিসেবে পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি করেন অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন)।
ভোটাভুটির শেষে জেলা পরিষদের তৃণমূলের বিদ্রোহী সদস্যরা তারান্নুমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁদের অভিযোগ, সভাধিপতি দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে জেলা পরিষদ চালাচ্ছিলেন এবং সাধারণ সদস্যদের কোনও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বিষয়ে সদস্যদের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করে নিজের ইচ্ছেমতো জেলা পরিষদ চালাতেন তিনি। বিক্ষুব্ধ নেতাদের দাবি, এই লড়াই কোনও ভাবেই তৃণমূল দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং স্বৈরাচারী ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই। জেলা পরিষদের বিদায়ী সহ-সভাধিপতি সজলকুমার বিশ্বাসও তারান্নুমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে জানিয়ে দেন যে তাঁরা সকলেই তৃণমূলের অনুগত সৈনিক, দলকে ভালবাসেন এবং দলের সঙ্গেই রয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমান সভাধিপতি অপসারিত হওয়ার পরে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কাজ সচল রাখতে সাময়িক ভাবে এক জন প্রশাসক নিয়োগ করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, এডিএম (উন্নয়ন) আগামী তিন দিনের মধ্যে বৃহস্পতিবারের সভার সম্পূর্ণ কার্যবিবরণী নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবেন। এর পর আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে ডিভিশনাল কমিশনার এই রিপোর্টের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করে জেলা স্তরে পাঠাবেন। জেলাশাসকের কাছে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট পৌঁছানোর পর তিনি তাঁর সুবিধাজনক সময়ে নতুন সভাধিপতি নির্বাচনের দিন ক্ষণ ঘোষণা করবেন। আইন মোতাবেক আগামী ২১ দিনের মধ্যে নদিয়া জেলা পরিষদে নতুন সভাধিপতি নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। ৫২ আসনের এই জেলা পরিষদে ৪৬টি আসনই তৃণমূলের দখলে থাকায়, দল এখন কাকে পরবর্তী সভাধিপতি হিসেবে বেছে নেয় এবং গোষ্ঠীদন্দ্ব কী ভাবে সামাল দেয়, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।