উন্নয়নে ব্যর্থতা নিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে কার্যত বিষোদ্গার করলেন মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক ও বর্ষীয়ান কংগ্রেস সাংসদ।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যাকে তুষ্ট করতেই ২০১২ সাল থেকে ‘মুর্শিদাবাদ জেলা ভিজিল্যান্স ও মনিটরিং কমিটি’র বৈঠক ডাকা হয়নি বলে অভিযোগ তুললেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা বহরমপুরের সাংসদ অধীর চৌধুরী।
এ ব্যাপারে সরাসরি জেলাশাসক ইয়েচুরি রত্নাকর রাওয়ের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন অধীর। তাঁর বক্তব্য, ‘‘নিয়ম অনুসারে, বছরে চার বার ওই কমিটির বৈঠক ডাকতে হয়। কিন্তু এই এ জেলায় সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। তা ঢাকতেই মুখ্যমন্ত্রীর অনুগত জেলাশাসক বৈঠক ডাকছেন না।’’
কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের গড়া ওই কমিটির চেয়ারম্যান জেলার বর্ষীয়ান সাংসদ অধীর, পদাধিকার বলে সচিব জেলাশাসক। অধীরের অভিযোগ, ‘বৈঠক ডাকলেও সচিব তথা জেলাশাসক হাজির থাকেন না।’’ তিনি জানান, ‘‘এতে আমার সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হচ্ছে বলে আমি বিষয়টি লোকসভায় তুলেছি। উপযুক্ত স্থানে আরও অভিযোগ জানাব।’’
জেলাশাসক অবশ্য সাংসদের তোলা অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে উল্টে তাঁর বিরুদ্ধেই এক গুচ্ছ অভিযোগ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, জেলায় প্রায় ৫০টি সরকারি দফতর রয়েছে। তার মধ্যে জঙ্গিপুরের সাংসদ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় দু’টি এবং অধীর চৌধুরী একটি, শুধু পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের ‘ভিজিল্যান্স ও মনিটরিং কমিটি’র চেয়ারম্যান। নিয়ম অনুসারে ওই কমিটিতে এক জন তফসিলি জাতি বা জনজাতির প্রতিনিধি, এক জন মহিলা ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার এক প্রতিনিধি মিলিয়ে মোট তিন জনকে নিয়োগ করার কথা। চেয়ারম্যানেরই শুধু সেই ক্ষমতা রয়েছে। জেলাশাসকের অভিযোগ, ‘‘অধীরবাবু তিন প্রতিনিধির নাম পাঠাতে এক বছর পার করেছেন। আর বৈঠক ডাকা হয়নি বলে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছেন।’’
অধীর অভিযোগ, জেলাশাসকেরই ব্যর্থতায় ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে ১০০ দিনের কাজে মুর্শিদাবাদ রাজ্যে ১৪ নম্বরে নেমে এসেছে। বছরে মাত্র ২৩ দিন কাজ হয়েছে। ৩৫ লক্ষ শ্রম দিবস নষ্ট হয়েছে। গত বছর দুয়েকে জেলায় সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে দাবি করে জেলাশাসক পাল্টা বলেন, ‘‘১০০ দিনের কাজ, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের কাজে ওতপ্রোত জড়িত জেলা পরিষদ। অভিযোগের উত্তর দেওয়া উচিত জেলা পরিষদের সভাধিপতির। তাঁকে কেন জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে না?’’ প্রসঙ্গত, মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ রয়েছে কংগ্রেসের হাতেই। সে ক্ষেত্রে অধীর-অনুগামীদের বিরুদ্ধেই প্রশ্ন ওঠে।
বৈঠক ডেকে নিজেই গরহাজির থাকার যে অভিযোগ জেলাশাসকের বিরুদ্ধে উঠেছে, তা-ও কি ভিত্তিহীন? যাতে অবাঞ্ছিত প্রশ্নের সামনে পড়তে না হয় তা নিশ্চিত করতে জেলাশাসক বৈঠক এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং গত ২৮ ডিসেম্বরও একই ঘটনা ঘটেছে বলে অধীরের অভিযোগ।
জেলাশাসকের বক্তব্য, বৈঠকে তিনি তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত জেলাশাসককে পাঠাতে পারেন। অধীর যে হেতু পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের কমিটির চেয়ারম্যান, তাই বৈঠকে অতিরিক্ত জেলাশাসক (জেলা পরিষদ)-কে পাঠানো হয়। কেননা ওই দফতরের কাজের সঙ্গে তিনিই ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত। তবে জেলাশাসকের অভিযোগ, ‘‘ওই সব বৈঠকে থাকা প্রশাসনিক আধিকারিকদের জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করেন সাংসদ। তাঁদের চূড়ান্ত অসম্মান করে বৈঠক ভেস্তে দেন। ভুক্তভোগী ওই আধিকারিকেরা একাধিক বার আমার কাছে অভিযোগ করেছেন।’’ তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘আমিও প্রতিকার চেয়ে সাংসদের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে নালিশ জানাব।’’