জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ

কাজিয়ার গেরোয় জোড়া শহরে নেই প্রেক্ষাগৃহ

নাট্যকার-অভিনেতা বিধায়ক ভট্টাচার্য। কীর্তন সম্রাজ্ঞী রাধারানি দেবী। চিত্রকর ইন্দ্র দুগার। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গুরু রাজেন হাজারি। বলিউড-কাঁপানো গায়ক অরিজিৎ সিংহ। এদের মধ্যে মিল কোথায়? অন্য জেলার মানুষ হয়তো আমতা-আমতা করবেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদের বাসিন্দারা এক কথায় দিয়ে দেবেন উত্তরটা। এঁরা সকলেই জন্মেছেন জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জে। চৈতন্য ভাবাদর্শে উজ্জীবিত বাংলায় বৈষ্ণব সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান ছিল এই জোড়া শহর। ক্রমে সঙ্গীত, নাটক, চলচ্চিত্র, নানা শাখায় ছড়িয়ে পড়েছিল এই শহরের সৃষ্টিশীলতা।

Advertisement

অনল আবেদিন

শেষ আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০১৪ ০০:০৮
Share:

জিয়াগঞ্জে রাধারানিদেবীর অনুষ্ঠান। ছবিটি রাধারানিদেবীর নাতনি শেফালি সরকারের সৌজন্যে প্রাপ্ত।

নাট্যকার-অভিনেতা বিধায়ক ভট্টাচার্য। কীর্তন সম্রাজ্ঞী রাধারানি দেবী। চিত্রকর ইন্দ্র দুগার। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গুরু রাজেন হাজারি। বলিউড-কাঁপানো গায়ক অরিজিৎ সিংহ। এদের মধ্যে মিল কোথায়?

Advertisement

অন্য জেলার মানুষ হয়তো আমতা-আমতা করবেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদের বাসিন্দারা এক কথায় দিয়ে দেবেন উত্তরটা। এঁরা সকলেই জন্মেছেন জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জে। চৈতন্য ভাবাদর্শে উজ্জীবিত বাংলায় বৈষ্ণব সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান ছিল এই জোড়া শহর। ক্রমে সঙ্গীত, নাটক, চলচ্চিত্র, নানা শাখায় ছড়িয়ে পড়েছিল এই শহরের সৃষ্টিশীলতা।

অথচ জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করার কোনও প্রেক্ষাগৃহ নেই। এমনকী সিনেমা হলও নেই। গত ২ অক্টোবর অত্যাধুনিক এক প্রেক্ষাগৃহ উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু আজও তা বন্ধ হয়েই পড়ে রয়েছে। রাজনীতির ফাঁদে-পড়া সংস্কৃতির সেই কাহিনী রীতিমতো রোমাঞ্চকর।

Advertisement

জিয়াগঞ্জেই ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার সব চাইতে অভিজাত প্রেক্ষাগৃহ, লক্ষ্মী টকিজ। জিয়াগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র চুড়িপট্টিতে ২১ শতক জমির উপর ৮৮০ আসনের তিনতলা সিনেমা হলটি ১৯৫২ সালে তৈরি হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে সিনেমা হলটি অব্যবহৃত পড়ে থাকার পর, মালিক জয়কুমার জৈন তিনটি শর্তে পুরসভাকে দান করেন হলটি। শর্ত তিনটি হলরেস্তোরাঁয় আমিষ খাবার থাকবে না, পরিচালন সমিতিতে জয়কুমার জৈনের পরিবারের একজন প্রতিনিধি থাকবে ও লক্ষ্মী টকিজের নাম পরিবর্তন করে হবে ‘মহাবীর জৈন মিউনিসিপ্যাল কালচারাল হল।’ সব শর্তই মেনে নেয় পুরসভা।

গত বছর পয়লা অগস্ট আড়াই কোটি টাকা মূল্যের লক্ষ্মী টকিজ পুরসভাকে দান করেন জয়কুমারবাবু। নামবদলও হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টিপ্লেক্সের আদল দিতে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। সিনেমা ছাড়াও নাটক- সহ বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার উপযোগী করে গড়ে তুলতে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। মেঝেয়, দেওয়ালে মার্বেল বসানো হয়। থ্রি ডি সিনেমার জন্য কেনা হয় অ্যালুমিনিয়মের স্ক্রিন। অত্যাধুনিক চেয়ারের জন্য বেঙ্গালুরুর অভিজাত কোম্পানিকে বরাত দেওয়া হয়। উচ্চক্ষমতা-সম্পন্ন জেনারেটর কেনার জন্যও বরাত দেওয়া হয়। পুরসভা সূত্রে খবর, মোট ব্যয় ধার্য হয় ৮৫ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে ব্যাঙ্ক ৬০ লক্ষ টাকার ঋণ অনুমোদন করে। ২ অক্টোবর উদ্বোধন করার দিন ধার্য হয়।

Advertisement

তার ঠিক ২০ দিন আগে পুরপ্রধান, সিপিএম নেতা শঙ্কর মণ্ডলের মোবাইলে একটি বার্তা পৌঁছয়। শঙ্করবাবু বলেন, “ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জিয়াগঞ্জের চারজন তৃণমূল নেতা লিখিত অভিযোগ জানিয়ে ঋণ দিতে নিষেধ করেছে। ব্যাঙ্কও ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি।” তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের জিয়াগঞ্জ শহর কমিটির সভাপতি তারক সিংহ ও তাঁর তিন সহযোগীর টাকার জন্য অসঙ্গত দাবি না মানাতেই তাঁরা এমন করেছেন। তারকবাবুর দাবি, অভিযোগ মিথ্যা। “শঙ্করবাবু রাজ্য সরকারের অনুমোদন না নিয়ে ঋণ করছিলেন, তার প্রতিবাদ করে আমরা চারজন ব্যাঙ্কে অভিযোগ জানিয়েছি,” বলেন তিনি।

এই কাজিয়ায় আটকে যায় সংস্কারের কাজ। জিয়াগঞ্জের সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্র শুরুর আগেই থমকে গেল। ওদিকে নদীর পশ্চিমপাড়ে আজিমগঞ্জেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার মতো কোনও সদন নেই। আজিমগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মী রঞ্জিতকুমার গুপ্ত বলেন, “ব্রিটিশ আমলের তৈরি ম্যাকেঞ্জি হল ও পার্ক সংস্কার করবে পুরসভা, তা শুনে আসছি বছর পাঁচেক। এক চুলও কাজ এগোয়নি।”

কেন হচ্ছে না কাজ? এরও মূলে রয়েছে সিপিএম-তৃণমূলের কাজিয়া।

আজিমগঞ্জে ভাগীরথী পাড়ে বিঘা তিনেক জমিতে ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছিল ম্যাকেঞ্জি হল ও পাকর্র্। তৈরি করেছিলেন আজিমগঞ্জের বাসিন্দা প্রয়াত উপ-মুখ্যমন্ত্রী বিজয় সিং নাহার। বর্তমানে তার মালিক রতন সিং নাহার ও জেলাশাসককে নিয়ে গড়া দুই-সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ড। ২০০৯ সালে ট্রাস্টি বোর্ড হল ও পার্ক পুরসভাকে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। ম্যাকেঞ্জি হলকে সংস্কার করে সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। সংস্কারের টাকা আসবে কোথা থেকে? পুরপ্রধান শঙ্করবাবু বলেন, পুরসভার তৈরি ‘টাউন সেন্টার’-এর কিছু অংশ জীবন বিমা নিগমকে লিজ দিয়ে, সেই টাকায় (২ কোটি ২৩ লক্ষ) ম্যাকেঞ্জি হল সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়। পুরপ্রধানের দাবি, ওই ভবন ও জমি আইনি জটিলতা মুক্ত নয় বলে তৃণমূলের পক্ষ থেকে জীবন বিমা নিগমের কাছে অভিযোগ করা হয়। ফলে নিগম পিছিয়ে যায়। থমকে যায় সংস্কারের কাজ। তবে আশার কথা, ওই ভবন লিজ নেওয়ার জন্য ফের জীবন বিমা নিগম আগ্রহ দেখিয়েছে। লিজ চুক্তি হলে সেই টাকায় ম্যাকেঞ্জি হল সংস্কার করা হবে, আশ্বাস দিচ্ছেন শঙ্করবাবু।

এই রাজনৈতিক চাপান-উতোরে আগ্রহ নেই সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের। জিয়াগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘বহুমুখী’-র অন্যতম কর্তা অধীর মিস্ত্রি বলেন, “কী জিয়াগঞ্জে, কী আজিমগঞ্জে কোনও সদন না থাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করতে হয়, নয়তো স্কুল কলেজের ঘর চাইতে হয়। তাতে পরিবেশনের মান উন্নত করা প্রায় অসম্ভব।” কবে হবে মঞ্চ, সেই দিকে চেয়ে আছে জোড়া শহর।

কেমন লাগছে আমার শহর?
নিজের শহর নিয়ে আরও কিছু বলার থাকলে আমাদের জানান।
ই-মেল পাঠান district@abp.in-এ।
subject-এ লিখুন ‘আমার শহর-নদিয়া মুর্শিদাবাদ’।
ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানান: www.facebook.com/anandabazar.abp
অথবা চিঠি পাঠান ‘আমার শহর’, নদিয়া মুর্শিদাবাদ বিভাগ, জেলা দফতর
আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০১

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement