চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের বেতনে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে এক কর্মীর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় এফআইআর করল কৃষ্ণনগর জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ জেলা হাসপাতালের লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক অমিত দাস বেশ কয়েক মাস ধরে হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক, কিছু কর্মী ও নার্সদের বেতনের টাকা তাঁদের অ্যাকাউন্টে না দিয়ে কারচুপি করে অন্য এক বা একাধিক অ্যাকাউন্টে ফেলে তা নিজে তুলে নিয়েছেন।
এর আগে বিষয়টি কিছুটা জানাজানি হলেও তাঁকে কেউ সন্দেহ করেননি। নেহাতই ভুল করে এটা হয়ে গিয়েছে বলেই মনে করেছিলেন সকলে। সম্প্রতি এক গাইনোকলজিস্ট খেয়াল করেন যে, বেতন বাবদ তার অ্যাকাউন্টে যে পরিমাণ টাকা থাকার কথা, তা থেকে প্রায় পাঁচ মাসের টাকা কম রয়েছে। তিনি ব্যাঙ্কে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর বেতনের টাকা অন্য একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে। তা তুলেও নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরে সকলের ফের অমিত দাসের প্রতি সন্দেহ হয়। কারণ আগেও একাধিক বার এই ঘটনা ঘটার পরে তিনি ভুল করে এমনটা হয়েছে দাবি করে সেই টাকা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন!
এ বার নেহাত ভুল বলে মেনে না নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে জানান। এরপরেই পরে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অতিরিক্ত মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ১-এর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্তের পরে প্রাথমিক ভাবে ঘটনার সত্যতা মিলেছে বলে তাঁদের দাবি। এরপরেই পুলিশের কাছে অমিতের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
জেলা হাসপাতালের সুপার হিমাদ্রী হালদার বলেন, ‘‘সরকারি টাকা, বিশেষ করে বেতনের টাকা প্রাপকের অ্যাকাউন্টে না দিয়ে অন্য একাধিক অ্যাকাউন্টে ফেলে পরে সেখান থেকে তা তুলে নিচ্ছিলেন ওই করণিক। তদন্ত কমিটির কাছে এমনটা প্রমাণিত হওয়ায় আমরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছি।’’ এক স্বাস্থ্য কর্তা অবশ্য মনে করেন, গোটা ঘটনায় অমিত একা জড়িত নয়। দফতরের বাইরেও কেউও এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘একটা চক্র কাজ করছে বলে প্রাথমিক ভাবে জানতে পেরেছি।’’ পুলিশকে সেই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
যাঁর বিরুদ্ধে যাবতীয় অভিযোগ সেই অমিত দাস কোনও অভিযোগই মানতে চাননি। তাঁর দাবি, ‘‘ফেঁসে গিয়েছি। বুঝতে পারছি না এই মুহূর্তে ঠিক কী করা উচিত।’’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, বছর ছ’য়েক আগে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক হিসাবে অমিতকে নিয়োগ করা হয়। হাসপাতালের সব রকম আর্থিক লেনদেন তিনি সামলাতেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে চিকিৎসক, নার্স, কর্মীরা তাঁর উপরে ভরসাও রাখতেন। সেই কারণে আগেও একই ঘটনা ঘটলেও তাঁকে কেউ সন্দেহ করেননি। সকলের বিশ্বাস ছিল, হয়ত ভুল করেই কিছু হয়েছে! কিন্তু তদন্তে অন্য জিনিস উঠে আসায় বিষ্মিত সকলেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্সের কথায়, ‘‘অমিতবাবু এমনটা করতে পারেন ভাবতেই পারছি না। ওনাকে বিশ্বাস করতাম। আমাদের অনেকের অ্যাকাউন্টে যখন বেতনের টাকা পড়ত না তখন একবারও মনে হয়নি যে অমিতবাবু এমনটা করে থাকতে পারেন। গিয়ে সে কথা বলতেই উনি টাকা অ্যাকাউন্টে দিয়ে দিতেন।’’
অমিতের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন কর্মীর অ্যাকাউন্টের জায়গায় অন্য একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর লিখে দিতেন। ফলে অন্য অ্যাকাউন্টে বেতনের টাকা জমা হত। পরে সেই টাকা তুলে নিতেন অমিতবাবু। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের অনেকেই নিয়মিত ব্যালান্স চেক করেন না। অভিযোগ, তারই সুযোগ নিতেন অমিত। সম্প্রতি গাইনোকোলজিস্টের বিষয়টি জানাজানি হতেই অন্য একাধিক চিকিৎসক দেখেন একই পদ্ধতিতে তাঁদের টাকাও তুলে নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টা সহজে ছেড়ে দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জেলার স্বাস্থ্য কর্তারা। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক তাপস রায় বলেন, ‘‘তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। আমরা চাই, পুলিশ আরও গভীরে ঢুকে সত্যটা বের করুক।’’ পুলিশ অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্তু শুরু করেছে। ‘‘তদন্তে সব দিক খতিয়ে দেখা হবে’’, আশ্বাস জেলার এক পুলিশ কর্তার।