মগ্ন মহড়ায়। নিজস্ব চিত্র।
মেঘে মেঘে বয়স হয়েছে অনেক। তবু উৎসাহের কমতি নেই। নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত আউড়ে চলেছেন নাটকের সংলাপ। জিজ্ঞাসা করলে একগাল হেসে সত্তরোর্ধ্ব বলাই পাল উত্তর দেন, ‘‘নাটক করছি গো। সংলাপ মুখস্ত করতে হবে না।’’
১৯৮৪ সালে গোসাবায় ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নাটক করে এসেছিলেন। সেই শেষ। তারপর আর মঞ্চে ওঠা হয়নি। সংসার-চাকরি সামলাতে সময় চলে গিয়েছে। মনের মধ্যে ইচ্ছেটা সযত্নে লুকনো ছিল। আবার মঞ্চে ফিরবেন। নিজেকে উজাড় করে দেবেন দর্শকদের সামনে। তাই সুযোগ আসতে না করেননি। আজ, ১৩ ডিসেম্বর রবীন্দ্রভবনে ‘কৃষ্টি সংসদ’ দলের নাটক ‘রাজা অয়দিপাউস’ মঞ্চস্থ হবে। তাতে অভিনয় করবেন তিনি। শরীর মাঝে মাঝে সায় দেয় না। তবু নাটকের সংলাপ যখন বলে চলেন আলো খেলে যায় তাঁর চোখমুখে।
শুধু বলাইবাবু নন, গোবিন্দ হালদার, অশোক বিশ্বাস, অনিল দাস, মানিকলাল ঘোষ, সুশান্ত বোস, দেবকুমার মুখোপাধ্যায়, রবি বিশ্বাস, গৌতম হালদার সকলেই ওই নাটকে অভিনয় করবেন। তবে গৌতমবাবু বাদে সকলেরই বয়স ষাট ছাড়িয়েছে।
তাঁরা জানান, বছর ১৩ আগেও অনেকেই মঞ্চ দাপিয়েছেন। আবার অনেকে জীবিকার কারণে মঞ্চ থেকে দূরে সরে গিয়েছেন। কিন্তু অভিনয় করার ইচ্ছেটা থেকে গিয়েছিল। সেই টানই তাঁদেরকে আবার এক ছাদের তলায় নিয়ে এসেছে। কৃষ্টি সংসদের সদস্যেরা জানান, ১৩ বছর আগে ‘রানি রাসমণি’ মঞ্চস্থ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় তাঁদের নাটক। বর্তমান সভাপতি ৬৫ বছরের নিহাররঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘‘ নিয়মিত মহড়া হচ্ছিল না। সেই সময় এক সদস্য সমরেন্দ্র লরেন বিশ্বাস মারা যাওয়ার পরে দল পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।’’
কিন্তু নাটকের প্রতি তীব্র টান তাঁদেরকে ফের নাটক করতে উৎসাহিত করে। গত বছর মারা যান ক্লাবের প্রাণপুরুষ সুনির্মল সমাদ্দার। তাঁরই স্মরণসভায় একত্রিত হন তাঁরা। তখনই নতুন করে নাটক করার প্রস্তাবটি উঠে আসে। সকলেই রাজি হন। ঠিক হয় ‘রাজা অয়দিপাউস’ মঞ্চস্থ করা হবে। ক্লাবের নিজস্ব ঘরেই শুরু হল মহড়া।
কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা। কেউ বা টানা সংলাপ বলতে পারেন না। একটুতেই হাঁপিয়ে ওঠেন। আবার কেউ সংলাপ বলতে বলতে কাশতে থাকেন। কিন্তু হতাশায় কেউ মহড়া বন্ধ করে দেননি। মহড়া ঘরের এক দিকে, তখন দাঁড়িয়ে ‘অয়দিপাউস’ সুব্রত চট্টোপাধ্যায়, ‘ইয়োকাস্তে’ সমিতা ঘোষেরা। নাটকের জন্য নিবেদিত প্রাণ, বয়সের কাছে হার না মানা কুশীলবের ভেঙে পড়তে গিয়েও ফের উঠে দাঁড়ানোর নীরব সাক্ষী
যে তাঁরাই।