রবীন্দ্রভবনের সামনে নাটকের বিজ্ঞাপন। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য
গত বছর নাটক করে ভাল সাড়া মিলেছিল। প্রেক্ষাগৃহ উপচে পড়েছিল দর্শকদের ভিড়ে। অনেক দিন পর ভাল মঞ্চ পেয়ে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলেন অভিনেতারাও। দর্শক-অভিনেতাদের সেই মেলবন্ধনকে ধরে রাখতে এ বছর নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছে কৃষ্ণনগরের ‘অরণি’। ৪-৬ ডিসেম্বর তিন দিন ধরে কৃষ্ণনগরের রবীন্দ্রভবনে চলবে ওই নাট্যোৎসব।
কর্মকর্তা সুজিত সাহা বলেন, ‘‘প্রশাসনের থেকে প্রেক্ষাগৃহের অনুমতি নিয়ে ১২ জুলাই ‘অপঘাত’ নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলাম। সেখানে অভিনেতারা নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছিলেন।’’ তিনি বলেন, ‘‘প্রেক্ষাগৃহও উপচে পড়ে ভিড়ে। দর্শকদের আগ্রহ দেখে আমরা নাট্যোৎসবের সিদ্ধান্ত নিই।’’
ভাল নাটক দেখার প্রতি কৃষ্ণনাগরিকদের টান বরাবরের। কিন্তু উপযুক্ত মঞ্চের অভাবে সেই আশা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছিল। ১৯৬১ সালে তৈরি হওয়া রবীন্দ্রভবনটি সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভবন সংস্কারের কাজ শুরু হয়। গত বছর ৮ অগস্ট নতুন রবীন্দ্রভবনের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু উদ্বোধনের পর বন্ধ হয়ে পড়েছিল রবীন্দ্রভবন। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন ওই প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া দিতে শুরু করে। তাতেই
শহরের একটি পরিচিত নাট্যদল ‘কৃষ্ণনগর রূপকথা’ কলকাতার রবীন্দ্র সদন, শিশিরমঞ্চ বা মধুসূদন মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ করলেও উপযুক্ত প্রেক্ষাগৃহের অভাবে গত দু’বছরে শহরে নাটক মঞ্চস্থ করতে পারেনি। সেই অপূর্ণতা মেটাতে তারাও এ বার নাট্যোৎসবের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ্যের বাইরে থেকে নাটকের দল এনে নাটক করাবে তারা। মুক্ত মঞ্চেও নাটক হবে। তাদের নাট্যোৎসব চলবে ১৭-১৯ ডিসেম্বর। শেষ দিন মঞ্চস্থ হবে দিল্লির ‘ন্যাশানাল স্কুল অফ ড্রামা’-র ডিন শান্তনু বসুর বোস স্টুডিও-র হিন্দি নাটক ‘ম্যাক বাইক টেক রান।’ অনেক বছর পর শহরে বাইরের কোনও রাজ্যে নাট্যদল নাটক করতে আসছে বলে দাবি সংস্থার কর্মকর্তা তৃষিত মৈত্রর। তিনি বলেন, ‘‘টানা দু’বছর ধরে শহরের মানুষ ভাল নাটক দেখতে পাননি। তাই তাঁদের জন্য নাট্যোৎসবের আয়োজন কোনও ফাঁক রাখিনি। এতে হয় তো অনেক টাকা খরচ হবে। সেই টাকা জোগাড় করা বেশ কঠিন হবে। কিন্তু তার জন্য আমরা পিছপা হতে রাজি নই।’’
টানা বারো বছর ধরে শহরবাসীকে সেরা নাটক দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে ‘পরম্পরা’। কিন্তু গত দু’বছর তাঁরা নাটকের মেলার আয়োজন করতে পারেননি। এ বছর তাদের নাটকের মেলা বসবে। ৩১ ডিসেম্বর থেকে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে সেই মেলা। নাটক মঞ্চস্থ করতে আসবেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত, দেবশঙ্কর হালদার, সোহিনী সেনগুপ্ত, সব্যসাচী চক্রবর্তী, অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়, খেয়ালি দস্তিদার, কৌশিক সেনে, ব্রাত্য বসুর মতো অভিনেতারা। অভিনীত হবে ১৩টি নাটক।
সংস্থার কর্মকর্তা শিবনাথ ভদ্র বলেন, ‘‘এই নাট্য উৎসবের আয়োজন করতে ৪৫ থেকে ৫০ জন নাট্যপ্রেমী অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। নিজেরা যেমন নাটক করে আনন্দ পাই, তেমনই ভাল নাটক দেখিয়েও আনন্দ পাই।’’
তিনি বলেন, ‘‘ভাল নাটক দেখার জন্য শুধু কৃষ্ণনগরের বাসিন্দারা নন, করিমপুর, তেহট্ট, বেথুয়াডহরি, শান্তিপুর, নবদ্বীপ, চাপড়া থেকেও মানুষ নাটকের মেলায় ভিড় জমান।’’ এ ছাড়াও থিয়েটার অঙ্গন, খিয়াস, কৃষ্ণনগর সিঞ্চন তারাও প্রস্তুত নাট্যোৎসবের জন্য। দীর্ঘ তেরো বছর পরে আবারও ২৩ ডিসেম্বর এই রবীন্দ্র ভবনে নাটক মঞ্চস্থ্ করতে চলেছেন এক কালের অন্যতম জনপ্রিয় নাট্যগোষ্ঠী ‘কৃষ্টি সংসদ’দের সদস্যরা।
তবে কিছু সমস্যা এখনও রয়েছে। নিজস্ব জেনারেটরের ব্যবস্থা হয়নি। ছোটখাটো কাজ এখনও শেষ হয়নি। তবু জেলা প্রশাসন মাস কয়েক আগে শহরের সাংস্কতিকপ্রেমী মানুষের আবেদনে সাড়া দিয়ে জেলা শাসকের অনুমতির ভিত্তিতে প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া দেন। কিন্তু নানা কারণে উন্নত মানের আলো-শব্দের ব্যবস্থা থাকলেও নানা কারণে তা ব্যবহার করতে পারছে না নাটকের দলগুলি। আলাদা ভাবে ব্যবস্থা করতে গিয়ে তাদের প্রচুর টাকা খরচ হচ্ছে। যেটা মফঃস্বলের দলগুলির পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ।
অতিরিক্ত জেলা শাসক (উন্নয়ন) শেখর সেন বলেন, ‘‘এখন কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে যত দ্রুত পারা যায় সেই সমস্যা কাটিয়ে প্রেক্ষাগৃহটিকে শহরের মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হবে।’’